কালের আয়নায়

ট্রাম্প বিদায় নেবেন, থেকে যাবে ট্রাম্পইজম

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২১

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

সাপের বিষ লেজে, ট্রাম্পের রাজনীতির বিষও তার লেজে। হুংকার দিয়ে রেখেছেন, অভিশংসন হলে দেশে আরও রক্তপাত হবে। মার্কিন সেনাবাহিনী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ২০ জানুয়ারি জো বাইডেনের অভিষেকের সময় ট্রাম্প সমর্থকরা যাতে বড় ধরনের গোলযোগ সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য সেনাবাহিনী কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মার্কিন গণতন্ত্র এখন সেনাবাহিনীর পাহারায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনীকে উস্কে দিয়ে গণতন্ত্র ধ্বংস করে সেনাশাসন প্রবর্তনের ইতিহাস যে আমেরিকার, সেই আমেরিকার গণতন্ত্র এখন সেনা পাহারায় প্রাণভয়ে কাঁপছে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস।

এখন নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা গ্রহণ নির্ভর করছে সেনাবাহিনী দেশের সংবিধানের প্রতি কতটা আনুগত্য পোষণ করে তার ওপর। এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল বাংলাদেশে পঞ্চাশের দশকে। তখন বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের পূর্বাংশ। প্রাদেশিক পরিষদে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী দলের প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের সময় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী এবং বহু পরিষদ সদস্য আত্মরক্ষার জন্য টেবিল ও চেয়ারের নিচে আশ্রয় নেন। ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী সেদিন স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ভাঙা চেয়ারের আঘাতে গুরুতর আহত হন এবং তাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান।

এই ঘটনাটিকেই কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানরা হুংকার দেন রাজনীতিকরা দেশে চালাতে অক্ষম। তারা অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজ। এই অজুহাত তুলেই ১৯৫৮ সালে সেনাপ্রধান আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। তারপর ১০ বছর পাকিস্তানে ডান্ডার শাসন চালিয়েছেন। আমেরিকাতেও এই ডান্ডার শাসন প্রবর্তিত হবে কিনা তা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য ও সংবিধান রক্ষার শক্তির ওপর। আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায়, আমেরিকার সেনাবাহিনী গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু রাজনৈতিক বড় দল দুটির মধ্যে ঐক্য নেই।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্ররোচনায় দাঙ্গাকারীরা পঞ্চাশের দশকের পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের হাঙ্গামার মতো আমেরিকার ক্যাপিটলে হাঙ্গামা সৃষ্টি করেছে, স্পিকার ও কংগ্রেস সদস্যরা টেবিলের তলায় ঢুকে আত্মরক্ষা করেছেন- এটা চরম লজ্জার ব্যাপার। এখন জো বাইডেনের অভিষেক অনুষ্ঠানও যদি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হতে না পারে এবং ট্রাম্পের হোয়াইট সুপ্রিমেসির থিওরির ভক্ত অনুসারীরা বড় ধরনের দাঙ্গা বাধিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে আমেরিকায় বড় ধরনের সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হবে।

আর ট্রাম্প এটাই চেয়েছিলেন। নির্বিঘ্নে ক্ষমতা হস্তান্তর হতে না পারলে তিনি ক্ষমতায় থেকে যাবেন এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে অনির্দিষ্টকাল হোয়াইট হাউসে থাকবেন- এটাই তার আসল মতলব ছিল। কিন্তু সামরিক বাহিনীর প্রধানরা তার আশা পূর্ণ করেননি। বরং সংবিধানের প্রতি অনুগত রয়েছেন। ট্রাম্প তবু আশা ছাড়েননি। তিনি আশা করছেন, শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীর দল যদি এখনও বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টি করে বাইডেনের ক্ষমতা গ্রহণ পণ্ড করতে পারে, তাহলে বৈধভাবে না হোক, অবৈধভাবে ক্ষমতা চলে যেতে পারে সেনাবাহিনীর হাতে। সাময়িকভাবেও এই ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর হাতে গেলে তার সুবিধা হয়। মুসোলিনি যেমন মুষ্টিমেয় অনুচর নিয়ে রোমে শোভাযাত্রাসহ প্রবেশ করে দুর্বল গণতান্ত্রিক শাসক ভিক্টর ইমানুয়েলের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ইতালিতে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করতে পেরেছিলেন, তিনিও তেমনি আবার সমর্থকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে হোয়াইট হাউসে থাকতে পারবেন এবং আমেরিকায় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।

দুটি বড় কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আশা পূর্ণ হবে না। একটি সংবিধানের প্রতি উভয় দলের রাজনীতিকদের এবং সামরিক বাহিনীর আনুগত্য। দ্বিতীয় কারণ, আমেরিকার শাসনক্ষমতা এমনিতেই পরোক্ষভাবে সেনাবাহিনী বা পেন্টাগনের হাতে। হোয়াইট হাউসের হাতে ক্ষমতা নামে মাত্র। খুব বড় ক্রাইসিস নানা হলে সামরিক বাহিনী দেশ শাসনে প্রত্যক্ষভাবে সামনের কাতারে আসবে না। জেনারেল আইসেনহাওয়ার সর্বপ্রথম আমেরিকার শাসনক্ষমতা আসলে কাদের হাতে, সেই গোমর ফাঁস করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার শাসনক্ষমতা একটি 'ইনভিজিবল গভর্নমেন্টের' হাতে। এই গভর্মেন্ট কারা চালায় আইসেনহাওয়ার তারও আভাস দিয়েছিলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় ব্যর্থতা এই যে, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি এই ইনভিজিবল গভর্নমেন্ট বা অদৃশ্য সরকারে ঢুকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। বিগ-মাউথ ট্রাম্পকে এই ইনভিজিবল গভর্নমেন্ট তাদের কার্যসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেছে, কিন্তু বিশ্বাস করেনি। ট্রাম্পের চরিত্র হচ্ছে, তিনি বড় বেশি ক্ষমতা ধারণ করতে পারেন না; কিন্তু বহ্বাড়ম্বর করতে পারেন বেশি। তিনি যুদ্ধের হুমকি দেন, কিন্তু যুদ্ধ করেন না। ইরান এবং উত্তর কোরিয়া উভয় দেশের ক্ষেত্রেই তিনি যুদ্ধের হুমকি দিয়ে বাজার গরম করেছেন, কিন্তু যুদ্ধে নামেননি। বরং উত্তর কোরিয়াকে দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছেন। আমেরিকার ওয়ার ইন্ডাস্ট্রির মালিকরা আশা করেছিলেন, ট্রাম্প ইরান বা উত্তর কোরিয়াকে কেন্দ্র করে একটা ছোটখাটো আঞ্চলিক যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে অস্ত্রের বাজার আবার গরম করবেন এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীদের মুনাফা লোটার ব্যবস্থা করবেন। ট্রাম্প তার নিজের এবং জামাইয়ের ব্যবসার স্বার্থে তা করেননি। ফলে গ্লোবাল ওয়ার ইন্ডাস্ট্রির মালিকদের পূর্ণ সমর্থন তার দিকে নেই।

তবে ট্রাম্প একটা ব্যাপারে সাফল্য অর্জন করেছেন। হিটলার যেমন জার্মান সুপ্রিমেসির ধুয়া তুলে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলে ভাঙন ধরাতে পেরেছিলেন এবং ক্রিশ্চান ডেমোক্র্যাট ও ফার-রাইটদের দলে এনে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টিতে তার পক্ষের লোকের সংখ্যা বাড়িয়ে নাৎসি দলের নেতৃত্ব দখল করতে পেরেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পও তেমনি রিপাবলিকান দলে ভাঙন ধরিয়ে চরম দক্ষিণপন্থি (আসলে ফ্যাসিস্ট) দল গঠনের একটা ব্যবস্থা করে ফেলতে পেরেছেন। ডোনাল্ডের রিপাবলিকান পার্টির একটা অংশ তার সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপে সমর্থন করছে এবং অন্য অংশ বিরোধিতা করছে। দলের যে অংশ তাকে সমর্থন করছে তাদের নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে 'আমেরিকা ফার্স্ট' নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হবে। আমেরিকার রাজনীতি তাহলে আর দ্বিদলীয় থাকবে না। হবে ত্রিদলীয়। এই তিন দলের মধ্যে আমেরিকা ফার্স্ট এই দল হবে চরম ফ্যাসিবাদী এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প হবেন দলের একচ্ছত্র নেতা- ফুয়েরার।

ট্রাম্প হোয়াইট হাউস ছেড়ে যাবেন, কিন্তু ট্রাম্পইজম আমেরিকা ছেড়ে যাবে না। ট্রাম্প এবার নির্বাচনে হেরেছেন বটে, কিন্তু যে বিশাল ভোট তার পক্ষে পড়েছে, তাতেই বোঝা যায় কতটা জন-সমর্থন তার পক্ষে রয়েছে। ইমপিচমেন্টের দরুন ট্রাম্প যদি আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে তার সুন্দরী কন্যা বা তার দলের অন্য কেউ দাঁড়াবেন। আমেরিকার জনমত বর্তমান অবস্থায় থাকলে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পকন্যার প্রবেশ খুব দুরূহ হবে মনে হয় না। আমেরিকায় যদি ফ্যাসিবাদ নতুনভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তাহলে তা শুধু ইউরোপ নয়, সারাবিশ্বে পশ্চিমা গণতন্ত্রের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।

আমেরিকায় বর্তমানে ট্রাম্প তথা নয়া ফ্যাসিবাদের পরাজয় সত্ত্বেও অদূর ভবিষ্যতে তা আবার মাথা তুলবে কিনা এটা নির্ভর করে বিশ্ব ধনতন্ত্রের বর্তমান অবস্থার ওপর। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব এখন যেমন নেই, তেমনি সমাজতন্ত্র থেকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের জন্য কোনো চ্যালেঞ্জও এখন নেই। তথাপি দেখা যাচ্ছে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তাকে বারবার বিপন্ন করে তুলছে। চীন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এখন আর শত্রু না হলেও সে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের একচ্ছত্র নেতৃত্বে আমেরিকার হাত থেকে কেড়ে নিতে চাচ্ছে। ধনবাদের নেতৃত্ব ইউরোপ বা আমেরিকার হাত থেকে এশিয়ার হাতে চলে যাক তা তারা চায় না। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি দিয়ে তা তারা ঠেকাবে। এবং সামরিক শক্তি দ্বারা চীনকে ঠেকাতে ট্রাম্পইজম তাদের দরকার হবে। অতীতে জাপান যখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাওয়ার হতে চলেছিল, তখন চীনের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে জাপানের বিরোধ বাধিয়ে আমেরিকা সেটি ঠেকিয়েছিল।

গত শতকে জার্মানির দুর্বল গণতন্ত্র (হিল্ডেনবার্গের সরকার) যেমন হিটলারকে ক্ষমতা দখলে পথ ছেড়ে দিয়েছিল। জো বাইডেনের বর্তমান সরকার অথবা ডেমোক্র্যাট দল কি ভবিষ্যতে ট্রাম্পইজমের হিংস্র মূর্তি দেখলে তাকে সহজে হোয়াইট হাউস ছেড়ে দেবে? জো বাইডেনের ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। ট্রাম্প ও ট্রাম্প অনুসারীদের বর্তমান সংবিধানবিরোধী কার্যকলাপ দমনে আমেরিকার গণতান্ত্রিক প্রশাসনকে খুব সাহসী ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে না। জো বাইডেন খুবই ভদ্রলোক। হোয়াইট হাউসে ঢোকার পর তিনি কতটা কঠোর গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হন, কতটা কঠোর হাতে ট্রাম্পইজমের অনুসারীদের দমন করেন, তার ওপর আমেরিকার তথা গোটা পশ্চিমা গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও দুর্বলতা যদি বাড়ে, তাহলেও মার্কিন গণতন্ত্র ও পশ্চিমা গণতন্ত্র বিপন্ন হবে। কারণ, এই গণতন্ত্র, ধনবাদনির্ভর গণতন্ত্র।

[লন্ডন, ১৫ জানুয়ারি, শুক্রবার, ২০২১]