রাজনীতি

আওয়ামী লীগের মূল চ্যালেঞ্জ 'আমিলীগ'

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২১

ড. মো. আবদুর রহিম

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো টানা এক যুগ শাসনক্ষমতায়। এই সময়ে শাসনতন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃস্থাপনসহ দেশে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতাসহ এবং 'আমিলীগার'দের কর্মকাণ্ডে ত্যাগী নেতাকর্মীদের অসম্মান, ক্ষোভ-বঞ্চনা আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলো ছাপিয়ে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনা সরকারকে বিব্রত করছে।

কাকতালীয়ভাবে এই নিবন্ধ যেদিন লিখছি, সেদিনও আওয়ামী লীগের 'সাংগঠনিক জট' নিয়ে দৈনিক সমকালে প্রকাশ হয়েছে শীর্ষ প্রতিবেদন। প্রতিবেদনের শুরুতে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা যে কোনো বিবেচনাতেই হতাশাজনক- 'আওয়ামী লীগের প্রায় ৫০০ তৃণমূল কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। এসব কমিটির সম্মেলন জোরেশোরে শুরু করেও করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন তৃণমূল কমিটিগুলোর সম্মেলন না হওয়ায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। এর ফলে নেতৃত্বপ্রত্যাশীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। তৃণমূল নেতারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে দলের প্রায় সর্বত্র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল বাড়ছে।' (সমকাল, ১৬ জানুয়ারি, ২০২১)।

১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের জন্মই তৎকালীন পূর্ববাংলার অধিবাসীদের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করে। কেননা 'আওয়ামী লীগ' পদবাচ্যেই জনগণের 'ওনারশিপের' ধারণা নিহিত রয়েছে। ভারতবর্ষে রাজতান্ত্রিক শাসন-সংস্কৃতির ভিত্তির ওপর ব্রিটিশদের ১৯০ বছরের ইজারা (জমিদারি) পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা জনগণের মনস্তত্ত্বে রাজা-প্রজার নিঃশর্ত আনুগত্যের ধারণা তৈরি করেছিল। ততদিন অবধি রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়টি মানুষের ভাবনার বাইরে ছিল। নবগঠিত আওয়ামী (মুসলিম) লীগই সর্বপ্রথম পূর্ববাংলার জনগণকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে সক্ষম হয়।

পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন তরুণ নেতা শেখ মুজিব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন ধারার সূচনা করেন। মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে সংগঠনের কাজ বেছে নিয়েছিলেন। ষাটের দশকে একদিকে তিনি ছয় দফায় নিজের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন ঘটান, অন্যদিকে 'শেখ মুজিবের ছয় দফা'কে ১৯৬৬-এর কাউন্সিলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে অনুমোদন করিয়ে নেন। অতঃপর এই কর্মসূচি নিয়ে ছুটে বেড়ান দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এভাবে তিনি আওয়ামী লীগকে পৌঁছে দেন সাধারণ মানুষের অন্দরমহলে। এর ফলাফল তো আমরা সবাই জানি। '৬৬-এর পরবর্তী আওয়ামী লীগ ছিল যে কোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।

সংগঠনকে শক্তিশালী করতে গিয়ে ব্যক্তি শেখ মুজিবকে ব্যাপক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল। তিনি পরিবার-পরিজনকে বঞ্চিত করে দিনের পর দিন হয় রাজনীতির মাঠে, নয়তো জেলে কাটিয়েছেন। তিনি তার বক্তব্যে গভীর মমতায় 'আমার মানুষ', 'আমার বাঙালি', 'ভাইয়েরা আমার', 'আমার বাংলা' ইত্যাদি পদবাচ্য ব্যবহার করতেন। এগুলো নিছক রাজনৈতিক কথামালা ছিল না, হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার গহিন গহ্বর থেকে উৎসারিত।

১৯৭৫ সাল-পরবর্তী আওয়ামী লীগকে অনেক চড়াই-উৎরাই পাড়ি দিতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ দ্বিধা-বিভক্তও হয়েছে। অথচ পার্টির ত্যাগী নেতাকর্মীদের সম্পৃক্তিই আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রেখেছে। এ ক্ষেত্রে সব হারানো বঙ্গবন্ধু-তনয়া শেখ হাসিনা বাবার প্রদর্শিত পথেই হেঁটেছেন। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে দুঃখ আর বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি তার বাবার মানুষের কাছে ফিরে যান। আভিজাত্যের বড়াই দেখিয়ে অনেক বড় বড় নেতা আওয়ামী লীগ ছেড়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ টিকে আছে পা-ফাটা শীর্ণদেহী ভুখানাঙ্গা কর্মীদের জীবন বাজি রাখা শ্রম আর জনগণের ভালোবাসায়। দলের জন্য কর্মীদের অকাতরে জীবনদান, ত্যাগ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে শেখ মুজিব ও তার কন্যা বহুবার নিজে কেঁদেছেন, অন্যদেরও চোখের জলে ভাসিয়েছেন।

ইদানীং আওয়ামী লীগের সংগঠনে সৃষ্টি হয়েছে 'আমিলীগ'। দুঃখের বিষয়, নব্য 'আমিলীগার'রা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে গিয়ে মূর্ছা যাওয়ার জোগাড় হন। কিন্তু তাতে আবেগ আর ভালোবাসার লেশমাত্র থাকে না। বর্তমানে রাজনৈতিক অভিধানে 'হাইব্রিড', 'কাউয়া', 'আগাছা', 'কল্লাপার্টি', 'ফেসবুক লীগ' ইত্যাদি নতুন শব্দের সংযোজন হয়েছে। আগাছা আওয়ামী লীগকে এমনভাবে ঘিরে ধরেছে, মূল দলই চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে গেছে। এরা গায়ে-গতরে মোটাতাজা। এদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রকৃত ত্যাগী কিন্তু জীর্ণশীর্ণ কর্মীরা পেরে ওঠেন না।

অনুপ্রবেশকারীরা নিজেদের পাল্লা ভারী করতে, 'মাইম্যান' তৈরি করতে আওয়ামী লীগের চরম প্রতিপক্ষের শক্তিকেও দলে ভেড়ান। এদের আছে টাকার জোর। টাকার জোরে ওপরওয়ালাদের যার যেটা প্রয়োজন তা সরবরাহ করে নিজের আখের গোছায়। এরা সংগঠনকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায়। অনৈতিক নেতাদের পেছনে লগ্নি করাকে তারা ব্যবসায় বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন। সারাটা জীবন যারা সংগঠনের জন্য উৎসর্গ করেছেন, তারা এই অনৈতিক প্রতিযোগিতার দৌড়ে পেরে ওঠেন না। অস্টম্ফুটভাবে নিজের মনের অজান্তেই হয়তো বলে বসেন, 'আবার দলের দুঃসময়ে হয়তো আমাদের মূল্যায়ন হবে।' সংবিৎ ফিরে পেয়ে আবার ভাবেন, 'দুঃখিনী কন্যা শেখ হাসিনা ভালো থাকুক'। কারণ দল ক্ষমতায় না থাকলে শেখ হাসিনার জীবন বিপন্ন হবে। এ রকম আরও কত অব্যক্ত বেদনার গল্প রয়েছে। শোনার কেউ নেই।

অতীতে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ ছিল অনেক শক্তিশালী কিন্তু দৃশ্যমান। দৃশ্যমান শক্তির মোকাবিলা করার কৌশল নির্ধারণ করা যায়। বর্তমানে আওয়ামী লীগের দুর্বল কিছু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকলেও ভয়ংকর অদৃশ্যমান শত্রু নিজের ঘরেই রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের মতে, সাংগঠনিকভাবে বর্তমান আওয়ামী লীগ যে কোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল। সবাই 'নিজের প্রয়োজনে' ব্যস্ত। দলকে সংগঠিত করার সময় নেই। নেতারা কর্মীদের চেনে না। সাংগঠনিক সফর হয় না। বায়োডাটা সংগ্রহ করে কমিটি গঠন করতে হয়। এ অবস্থায় বিরোধী দলবিহীন রাজপথে আওয়ামী লীগেরই কিছু নেতা নিজেদের মধ্যে বিরোধিতায় নেমেছেন।

শেখ হাসিনা তার পিতার সোনার বাংলা পুনর্গঠনের অসমাপ্ত কাজ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। তাকে অনেক ধরনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। প্রথমে তাকে বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেলহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। ধর্মীয় জঙ্গিবাদকে নিষ্ফ্ক্রিয় করতে হয়েছে। কাটাছেঁড়া সংবিধানকেও জোড়া দিতে হয়েছে। শাসনতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অগ্রগতি হলেও নৈতিক উন্নয়নে পিছিয়ে গেছি আমরা। এর ফলাফল বৈভবের পেছনে অনৈতিক প্রতিযোগিতা। সুযোগ সন্ধানীরা সবসময় সুবিধাজনক প্ল্যাটফর্ম খোঁজে। দীর্ঘ ক্ষমতায় থাকার সুবাদে এখন তারা আওয়ামী লীগে ভর করে 'আমিলীগ' ক্যাসিনো, নৃত্যগীত আর সংগীতের মূর্ছনায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে প্রভু-দেবতাদের। কারণ তারা ভালো করেই জানেন 'কোন ফুলে কোন দেবতা তুষ্ট হয়'।

সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
mrahim77@du.ac.bd