সমাজ

অমার্জনীয় অপরাধ ও আচরণ তত্ত্ব

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২১

ড. মাহবুব উল্লাহ

বাংলাদেশের সমাজে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পরপর ছিনতাই খুব বেড়ে গিয়েছিল। একটু রাত হলে সামান্য পরিমাণ অর্থ নিয়েও রাজপথে চলাচল করা ছিনতাইয়ের ভয়ে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সেসময় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের মাঝখানে সামান্য অংশ পিচঢালা ছিল। আর বাকি অংশ ইটের খোয়া দিয়ে মোড়ানো ছিল। তবে এই বিশাল প্রশস্ত পথটি ছিল বেশ নিরিবিলি। এখন এই রাস্তা পুরোটাই পিচঢালা করা হয়েছে। রাস্তার একপাশে রয়েছে ন্যাম ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনা। অন্য পাশে সংসদ চত্বরের নিরাপত্তা বেড়ি ইস্পাতের গ্রিল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। রয়েছে পুলিশি নিরাপত্তা। পুরো সড়কটি সন্ধ্যার পর থেকে এলইডি বাল্ক্বের আলোতে উজ্জ্বল থাকে। তাই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এখন আর তেমন কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে না। ১৯৭২, ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালে শুধু পথিকের টাকা ছিনতাই করা হতো না, পথিকের কাছে যদি খুব কম পরিমাণ অর্থ থাকত, তাহলে ছিনতাইকারীরা তার বস্ত্রহরণ করে রেখে দিত। এ অবস্থায় পড়লে একজন মানুষকে কতটা অপমানবোধ করতে হতো তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একই সময়ে দিনদুপুরে মতিঝিলের মতো এলাকায় কাউকে কেউ যদি রাজাকার বলে চিহ্নিত করত, তাহলে গণপিটুনিতে তার মৃত্যু ছিল অবধারিত। তাকে রক্ষার জন্য কেউ এগিয়ে আসত না। ধারণা করা হয়, রাজাকারের অপবাদ দিয়ে অনেকেই ব্যক্তিগত শত্রুতা উদ্ধার করেছে।

এরশাদ আমলে অ্যাসিড নিক্ষেপ করে মেয়েদের মুখমণ্ডল কিংবা শরীরের অন্য কোনো অংশ ঝলসে দেওয়া নিত্যকার ঘটনা হয়ে উঠেছিল। এর ফলে অনেক তরুণী প্রাণ হারাত। পুলিশের পক্ষে এই অপরাধ দমন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীর ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়। দ্রুত বিচার করে কিছু অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ফলে দেখা গেল কোনো অপরাধী এই অপরাধ করতে সাহস পাচ্ছে না।

সাম্প্রতিককালে একটি ঘৃণ্য অপরাধ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কি গ্রাম, কি শহর- সব ধরনের এলাকা থেকে এই ঘৃণ্য অপরাধের খবর আসছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো নারীরা এ অপরাধের ভিকটিম। সংবাদমাধ্যমে এই অপরাধের ওপর যেসব সংবাদ পরিবেশিত হয়, তা এতই নিষ্ঠুর যে, কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে এসব সংবাদ পড়ে মানসিকভাবে স্বাভাবিক থাকা সম্ভব নয়। সমাজে আরও অনেক ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। বাংলাদেশের প্রথম কয়েক বছরে কুষ্টিয়ার একটি গ্রামে দু'জন ডাচ নৃবিজ্ঞানী গবেষণা করেছিলেন। তাদের গবেষণার সারকথা হলো- বাংলাদেশে অপরাধ মূলত দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়। বিষয় দুটি হলো- জমি ও নারী। আবার অনেক সময় দেখা যায় এ বিষয় দুটি পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত। এখন অপরাধের অন্যতম একটি উৎস হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা। রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ করায়ত্ত করা যায়। সম্ভব হয় নদী দখল, খালবিল দখল, খাসজমি দখল, ব্যাংকের অর্থ লুট এবং শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি। সবচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে চাকরি দেওয়ার নাম করে অথবা বিদেশে কাজ পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া। এ ধরনের অপরাধের পরিণতি হচ্ছে অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে যারা চাকরি পায়, তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে ঘুষের টাকা তুলে নেওয়া। ফলে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষতাহীন ও অকার্যকর হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানিক দিক থেকে দুর্বল ও অকার্যকর, সেসব রাষ্ট্র উন্নতি করতে পারে না; এবং চূড়ান্ত পরিণামের দিক থেকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

বাংলাদেশে যেসব অপরাধ ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে বক্ষ্যমাণ লেখাটি লিখিত হয়েছে। সবধরনের অপরাধ চিত্র তুলে ধরতে গেলে কয়েক হাজার পাতা লিখেও শেষ করা যাবে না। একদল অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশের উন্নয়নকে একটি 'প্যারাডক্স' হিসেবে বর্ণনা করতে চান। একদিকে দুর্নীতি ও অপরাধের ভয়াল থাবা এবং অন্যদিকে মোটামুটি সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি একটি প্যারাডক্সের জন্ম দিয়েছে। পাশ্চাত্যের অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশে 'রেন্ট সিকিং' একটি সর্বব্যাপক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাই কথা উঠেছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হয়তো 'রেন্ট সিকিং' উন্নয়নের সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তবে এই বিপজ্জনক ধারণাটি বস্তুনিষ্ঠভাবে বুঝতে হলে একটি বড় ধরনের গবেষণার প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশের কিছু অপরাধের বর্ণনা দিয়ে এই লেখাটি শুরু করেছিলাম। মজার ব্যাপার হলো- নতুন নতুন অপরাধের ঘটনা কালক্রমে ঘটে চলেছে। গত কয়েক বছরে ধর্ষণের মতো কুৎসিত অপরাধ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত এই অপরাধ দমনের জন্য রাষ্ট্রপতি মৃত্যুদণ্ড সংবলিত একটি অধ্যাদেশ জারি করেছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজন অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয় হলো এর ফলে কি ধর্ষণ অপরাধ হ্রাস পেয়েছে? চূড়ান্ত ফলাফল দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমে কিছু নেতিবাচক প্রতিবেদন লক্ষ্য করা গেছে।

আলোচ্য নিবন্ধটি শেষ করতে চাই একটি তত্ত্বের সিরিয়াস আলোচনা দিয়ে। বি. এফ. স্কিনার (১৯০৪-১৯৯০) ছিলেন একজন নামকরা মনস্তত্ত্ববিদ। ১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালে তিনি ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব বিভাগ পরিচালনা করেন। এরপর হার্ভার্ডে প্রত্যাবর্তন করেন। জীবনের অবশিষ্ট সময় সেখানেই ব্যয় করেন। ১৯৮০ দশকে তার লিউকোমিয়া ধরা পড়ে। কিন্তু তিনি তার গবেষণা কাজ অব্যাহত রাখেন। মৃত্যুর দিন তিনি যে শেষ লেকচারটি দিয়েছেন, সেটিও লিখিত প্রবন্ধ হিসেবে রেখে যান। এখানেই হলো আমাদের মতো দেশের পণ্ডিতদের সঙ্গে স্কিনারের মতো পণ্ডিতের ব্যবধান।

প্রফেসর স্কিনার মনস্তত্ত্বে আলোচিত আচরণবাদের তত্ত্বের কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালান। এর ফলে মনস্তত্ত্বে 'রেডিক্যাল বিহ্যাবিরিজম' তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কিনার আচরণের রূপায়ণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, যে কোনো ক্রিয়ার পরিণতি প্রদত্ত উদ্দীপনার সঙ্গে জড়িত থাকতে হবে, অথবা এর আগে ঘটবে- এমনটি নাও হতে পারে। তিনি পরীক্ষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে আসেন যে, আচরণ প্রাথমিকভাবে কিছু কর্মকাণ্ড দেখে শেখা হয়। স্কিনারের এই ধারণা প্রমাণসিদ্ধ মনে হলেও আচরণ সংক্রান্ত মনস্তত্ত্বের ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন বাঁকে স্রোতোধারার প্রবাহ।

স্কিনার ইঁদুর দিয়ে অনেক পরীক্ষা চালান। এই পরীক্ষাগুলোর নাম হয়ে গেল 'স্কিনার বক্স বা স্কিনারের বাক্স'। একটি ইঁদুরকে এরকম একটি বাক্সে রাখা হলো- বাক্সটির ভেতরে একটি বিশেষ ধরনের প্রতিবন্ধক ছিল। ইঁদুরটি যখন এই প্রতিবন্ধক অতিক্রম করতে চাইত, তখন ইঁদুরের সামনে একটি খাবারের টুকরো পড়ত। তখন যেইমাত্র ইঁদুরটি প্রতিবন্ধকের ওপর চাপ দিত, তখন তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হয়ে যেত। শুরুর দিকে ইঁদুরটি হয়তো এটিকে একটি দুর্ঘটনা মনে করত। অথবা তার কৌতূহলের কারণে সে খাবারের টুকরো পেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইঁদুরটি বুঝতে পারল প্রতিবন্ধকটিকে খোঁচা দিলেই খাবারের টুকরো পাওয়া যায়। এর ফলে ইঁদুরটি খাবারের প্রয়োজনবোধ করলেই প্রতিবন্ধকটিকে খোঁচা দিত। ইঁদুরটি খাবারের অভাবে পড়ত না। কারণ খাবার শেষ হওয়া মাত্র খাবার পুনর্ভরণ করা হতো। দেখা যাচ্ছে, এই ইঁদুরটির আচরণের মধ্যে একটি উদ্দেশ্য কাজ করছে। আর তা হলো ক্ষুধার্ত বোধ করলে প্রতিবন্ধকটির ওপর খোঁচা দেওয়া। এটাকে মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'ইতিবাচক পুনর্ভরণ'। এর পাশাপাশি দেখা হলো খাবার দেওয়া হয়নি এমন ইঁদুর কী করে। অথবা অনিয়মিতভাবে খাবার প্রদান করা হচ্ছে। এ থেকে বোঝা গেল ইঁদুরের আচরণ নির্ভর করে খাবার আসছে কিনা, অথবা আসছে না অথবা অনিয়মিতভাবে আসছে তার ওপর। স্কিনার সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন, প্রাণীরা তাদের কর্মকাণ্ড ও পরিবেশ দ্বারা অভ্যস্ত হয়।

বাংলাদেশের ধর্ষণকারী ইঁদুরগুলো তাদের কর্মকাণ্ড ও পরিবেশ দ্বারা প্রণোদিত হচ্ছে কিনা? প্রণোদনা ও পরিবেশ কোথায় কী অবস্থায় আছে সেটি বুঝতে পারলে ধর্ষণের মতো বর্বরতা উচ্ছেদ করা সম্ভব হবে। স্কিনারের পরীক্ষণের আরও অনেক দিক আছে সেগুলো আলোচনা করতে গেলে এই লেখার কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে। পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না।

অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ