সিলেট নগরী

দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নির্মাণে চাই দূরদর্শিতা

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২১

আব্দুল করিম কিম

সিলেট সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সড়কদ্বীপ দৃষ্টিনন্দন করার উদ্যোগ নিয়েছে। নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে এ উদ্যোগে কারও কোনো আপত্তি নেই। আধুনিক নগর পরিকল্পনার একটি স্বাভাবিক কাজ হচ্ছে নগরীর প্রধান সড়কগুলোর পরিসর বাড়ানো, সৌন্দর্যবর্ধন, ফুটপাত ব্যবহারোপযোগী রাখা, সড়ক বিভাজক দিয়ে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানো, গাড়ির পার্কিং নিশ্চিত করা, পয়েন্ট বা মোড়ক দৃষ্টিনন্দন করা। নগরীর বিভিন্ন সড়কদ্বীপকে দৃষ্টিনন্দন করে স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা একটি আকর্ষণীয় কার্যক্রম। সড়কদ্বীপে স্থাপন করা শিল্পকর্মের মাধ্যমে গোটা নগরবাসীর রুচি ও শিল্পবোধ ফুটে ওঠে। সুন্দর নগর গড়তে হলে সৌন্দর্যবর্ধনের এই কাজগুলো সুচিন্তিতভাবে করা উচিত। হুটহাট 'ধর তক্তা মার পেরেক' জাতীয় কাজে সৌন্দর্যবর্ধনের চেয়ে সৌন্দর্যহানি হয়। সড়কদ্বীপ পাওয়া গেলেই একটা কিছু বানানোর চেয়ে, যা বানানো হচ্ছে তা ওই মোড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা; আগেভাগেই বিবেচনায় রাখা উচিত। দৃষ্টিকে নন্দিত করে নিবদ্ধ হতে যা বানানো হবে, তা আশপাশের অন্য স্থাপনা বা বসতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা, তাও বিবেচনা করা উচিত।

সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়রের আগের মেয়াদে নগরে এমন কিছু শিল্পকর্ম সড়কদ্বীপে বসানো হয়েছিল, যা সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে শুধু সম্পর্কহীনই নয়; কোনো বিবেচনায় কাজগুলো শিল্পসম্মত ছিল না। খুবই নিম্নমানের বিদঘুটে কিছু নির্মাণ

স্থাপত্য বর্তমানে ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাই আগামীতে যা হবে, তা যেন সর্বজনগ্রাহ্য, মানসম্মত ও অর্থবহ হয়। অযৌক্তিক ও অসুন্দর কোনো স্থাপনা যেন নির্মাণ করা না হয়।

সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, নগরীর চৌহাট্টা পয়েন্টের মূল অংশে টিনের বেড়া। ট্রাফিক আইল্যান্ড হিসেবে যে অংশটুকু ব্যবহূত হতো, সেখানে কিছু একটা হচ্ছে। কোনো একটি বেসরকারি ব্যাংকের অর্থায়নে কিছু একটা বানানো হবে। চৌহাট্টা চৌরাস্তার মোড় সিলেট শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এক পাশে ১০০ গজের মধ্যেই রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের গণকবর, শহীদ বুদ্ধিজীবী সমাধিস্থল, আমাদের সকল মুক্তি, প্রগতি ও অস্তিত্বের প্রতীক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার; অপর পাশে এ অঞ্চলের নারী শিক্ষাকে অগ্রগামী করার প্রথম উচ্চ বিদ্যাপীঠ সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ। অন্য পাশে মহান ভাষা আন্দোলনসহ নানা সংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাস ও মাঠ। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে নৃশংসতা ও বর্বরতার সাক্ষী শহীদ ডা. শামসুদ্দিন হাসপাতাল। চৌহাট্টা পয়েন্টের দুই পাশে রয়েছে সনাতন ধর্মীয় নাগরিকদের দুটি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি। একটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য সিংহবাড়ি, অন্যটি বিজেন্দ্র কুমার দে সাহেবদের বাড়ি। চৌহাট্টার পয়েন্ট ঘিরে কিছু হলে কী হবে, তা ঘোষিত নয়। সর্বজনীন কিছু একটা হবে, তা আশা করা যায়।

এই আশাবাদে বলা যায়, এই স্থানটি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে এমন কিছু নির্মাণ করা, যা কোনোভাবেই দৃষ্টিকে জোর করে নিবদ্ধ করতে না হয়। এসব বিবেচনায় চৌহাট্টা মোড়কে 'ভাষা চত্বর' করা যেতে পারে। এখানে বিভিন্ন ভাষার বর্ণমালা দিয়ে স্মারক নির্মাণ করা যেতে পারে, যা এই মোড়ের অবস্থান ও পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এই পথ দিয়ে যেতে বা আসতে বাংলাদেশের প্রথম চা বাগান মালনীছড়া দর্শন হয়। চায়ের দেশের প্রসারে পাতাকুঁড়ির কোনো স্থাপত্য হতে পরে। সোজাসুজি দুটি পাতা একটি কুঁড়ি দিয়েও চৌহাট্টা পয়েন্ট দৃষ্টিনন্দন করা যেতে পারে।

চৌহাট্টা থেকে আম্বরখানার দিকে এগোলে এক পাশে পড়ে দরগাহ-ই-হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর প্রবেশমুখ। আল্লাহতায়ালার ৯৯ নাম খচিত স্থাপত্য নির্মাণের একটি ইচ্ছা রয়েছে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর। এমন নির্মাণের জন্য বেছে নেওয়া যেতে পারে দরগার প্রবেশমুখটি। বিকল্প হিসেবে বলা যায়, বড় পরিসরে এই নির্মাণ সম্পন্ন করতে হলে আম্বরখানা জামে মসজিদকে মাথায় রেখে আম্বরখানা, মিরের ময়দান মোড় বা শেখঘাট মোড়ে (মসজিদের পাশে) এটি করা যেতে পারে। তবে ধর্মীয়ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ টাওয়ার নির্মাণে বেসরকারি ব্যাংকের সুদের অর্থ যেন কোনোভাবে ব্যাবহার করা না হয়। এমন ব্যবহার কোনোভাবেই ইসলামী ভাবাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।

বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে সিলেট নগরে প্রবেশ করার প্রাক্কালে চৌকিদেখি-লাক্কাতুরা এলাকায় একটি নান্দনিক তোরণ নির্মাণ করা যেতে পারে। সিলেট মহানগরীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে কোনো স্থাপনা নেই। ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের স্থানান্তরিত জায়গায় উদ্যান-উদ্যোগ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-সিলেট শাখার পক্ষ থেকে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। বাপার পক্ষ থেকে পরিত্যক্ত কারাগারকে বঙ্গবন্ধু উদ্যান করার প্রস্তাব দেওয়া হলে সে বৈঠকে উপস্থিত সিলেটের সাবেক মেয়র বদর উদ্দীন আহমদ কামরানসহ উপস্থিত সব প্রতিনিধিত্বশীল নাগরিক ঐকমত্য প্রকাশ করেন। কারাগার স্থানান্তর করা হলেও উদ্যান আর বাস্তবায়ন করা হয়নি।

এখন সিলেট মহানগরীর অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে ভবিষ্যতে হবে এই বিবেচনায় খাদিমনগর বাইপাস মোড়, দক্ষিণ সুরমা-কুমারগাঁও বাইপাস মোড়, পারাইরচকে জননেতা পীর হাবিবুর রহমান চত্বর, চণ্ডিপুলের জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ চত্বরকে সংস্কার করে এসব স্থানে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরে শিল্পকর্ম স্থাপন করা যেতে পারে। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও দেওয়ান ফরিদ গাজীর নামে নগরে দুটি চত্বর নির্মাণ সময়ের দাবি। গণমানুষের কবি দিলওয়ার, সিলেট সিটি করপোরেশনের উপদেষ্টা, জাতীয় অধ্যাপক সদ্যপ্রয়াত প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরী, সিলেট পৌরসভার নির্বাচিত প্রথম চেয়ারম্যান শ্রী রায়বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেবসহ নগর সংস্কৃতি ও নগর উন্নয়নে অবদান রাখা গুণীদের নামেও স্মৃতিফলক নির্মাণ করা যেতে পারে।

মনে রাখা দরকার, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা পথচলতি মানুষের জন্য। নির্মাণে সুচিন্তার ছাপ থাকলেই পড়ে সুদৃষ্টি। নজর কাড়লে আরেকবার দেখার আশা জাগায়। এই শিক্ষা- দেখা থেকে শেখার।
  পরিবেশকর্মী