দুর্ঘটনা

সড়ক মৃত্যুফাঁদ হয়েই থাকবে?

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২১

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল করিম ও দিয়া খানম মিমের নিহত হওয়ার ঘটনা অনেকেরই বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। ওই মর্মন্তুদ ঘটনার পর ঢাকাসহ প্রায় সারাদেশে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল ন্যায়বিচার চেয়ে সড়ক-মহাসড়কে নৈরাজ্য বন্ধের দাবি জানিয়ে। সে আন্দোলনের পথ ধরেই দিয়া-করিম হত্যা মামলার রায় এসেছিল। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলন নতুন মাত্রারও সংযোজন ঘটিয়েছিল। সাধারণ নাগরিকরাও আন্দোলনকারীদের সমর্থনে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। আন্দোলনকারীদের ন্যায়সঙ্গত দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকার নতুন সড়ক পরিবহন আইন করেছিল। সেই আইনের কার্যকর প্রয়োগও শুরু হয়েছিল এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা-শৃঙ্খলার বিষয়টি নতুন প্রেক্ষাপটে দায়িত্বশীল সংশ্নিষ্ট মহলের সামনে এনেছিল। তারপরও ইতিবাচক ফল কী- ফের এ প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ঢাকার বিমানবন্দর সড়কের কাওলা এলাকায় দ্রুতগতির বাসের পাল্লাপাল্লিতে মোটরসাইকেল আরোহী আকাশ ইকবাল ও তার স্ত্রী মায়া হাজারিকা মিতু বেপরোয়া প্রতিযোগিতার বলি হন। ১৯ জানুয়ারি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই মর্মন্তুদ ঘটনার যে বিশদ বিবরণ উঠে এসেছে, তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান, সড়কের নৈরাজ্য যেভাবে দিয়া-করিমের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল; একইভাবে আকাশ-মিতু দম্পতির প্রাণও কেড়ে নেয়। একই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও আটটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে এবং এসব ঘটনায় হতাহতের সংখ্যাও অনেক। আমাদের মনে আছে বাসযাত্রী শিক্ষার্থী সেই রাজীবের কথা, যার একটি হাত ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল দ্রুতগতির বাসের এই পাল্লাপাল্লির কারণেই। একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন সাংবাদিক জগ্‌লুল আহ্‌মেদ চৌধূরী। তালিকাটা অনেক দীর্ঘ এবং প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই স্পষ্ট প্রতীয়মান সড়কের নৈরাজ্যের ভয়াবহ চিত্র। কোনো কোনো কোম্পানির ব্যানারে যে বাসগুলো সড়কে চলে, এগুলোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এক একটি ঘটনা কত সাজানো সংসার-স্বপ্ন তছনছ করে দিয়েছে, দিচ্ছে- এর হিসাব মেলানো ভার। একটি ঘটনা ঘটলে কিছুদিন তোলপাড় হয় সামাজিক-সংবাদমাধ্যমে। সরকারের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা নড়েচড়ে বসেন। কিন্তু ক'দিন পর আবার পরিস্থিতি যেই-সেই। সড়ক দুর্ঘটনা উন্নত দেশেও ঘটে। কিন্তু এর হার যেমন এমন উদ্বেগজনক নয়, তেমনি নয় প্রতিকারহীনও। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার যে চিত্র প্রায় নিত্য দেখা যাচ্ছে, তাতে বলা যায়, এ হচ্ছে বিশৃঙ্খলা কিংবা নিয়মনীতি না মানার চূড়ান্ত ভয়াবহ পরিণতি।

শিশুসন্তান আফরা আনজুমকে ঘুমিয়ে রেখে যে মা-বাবা রওনা হয়েছিলেন কর্মস্থলের উদ্দেশে, সড়ক নৈরাজ্য তাদেরই চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। এ রকম এক একটি ঘটনা কত পরিবারের সারাজীবনের কান্নার কারণ হয়ে আছে, এরও হিসাব মেলানো ভার। এমন মর্মন্তুদ ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার কারণগুলো অচিহ্নিত নয়। কিন্তু বিস্ময়ের হলো- এর পরও প্রতিকার নিশ্চিত ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না এবং আইন-নিয়ম-নীতির তোয়াক্কাই করছে না যানবাহনের চালকরা। বিষয়টি যেন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সড়ক-মহাসড়কে নৈরাজ্যের বলি মানুষ প্রতিনিয়তই হবে; কারও কিছু করার নেই! না- অবশ্যই অনেক কিছু করার আছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে কাজ করবে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো- এই অঙ্গীকারনামায় বাংলাদেশও স্বাক্ষরকারী ছিল। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে জাতিসংঘের অনেক সদস্য দেশ তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অনেকটা সফল হলেও নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্তে আমাদের দেশের পরিস্থিতির উন্নতি নয়, যেন অবনতিই ঘটেছে।

সময় অতিক্রান্তের পর এ প্রশ্ন তোলাই যেতে পারে- সেই অঙ্গীকার পূরণে নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন ছাড়া সরকারি কর্তৃপক্ষগুলো আর কী পদক্ষেপ নিয়েছে? আমাদের দেশে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনাজনিত কারণে হতাহতের হার কেন এত বেশি; কী কী পদক্ষেপ নিয়ে এ হার কমিয়ে আনা সম্ভব- এসব বিষয় বহুল আলোচিত। এ নিয়ে গবেষণাও হয়েছে বিস্তর। বিশেষজ্ঞ পরামর্শও ইতোমধ্যে কম উপস্থাপিত হয়নি। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে নিয়ম-নির্দেশনা না মেনে গাড়ি চালানোর কারণে। শুধু চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। তা ছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ চালক, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ইত্যাদি তো আছেই। এর পরও এ ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেই! ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিও কম নয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো- জরুরি ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। অদক্ষ চালকদের গাড়ি চালানো বন্ধ, ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স না দেওয়া, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ; যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রচলিত আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয় যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত করা না যাবে ততক্ষণ বিভীষিকার মুখোমুখি হতেই হবে। চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চলছে দীর্ঘদিন থেকে। এর পর দিয়া-করিমের মৃত্যুর পর দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন দিকনির্দেশনার পাশাপাশি কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি আরও জোরালোভাবে উঠে এলেও তা ক'দিন পরই নিষ্প্রভ হয়ে যায় এবং মর্মান্তিকতার ক্ষেত্র ক্রমবিস্তৃত হয়েই চলেছে।

বিআরটিএ নামক সংস্থাটির এ ক্ষেত্রে ভূমিকা সর্বাধিক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ সংস্থার দায়িত্বশীল অনেকের বিরুদ্ধেই অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাহাড়সম। এই সংস্থাটির অসাধুদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হচ্ছে না। সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও নতুন করে বলার নয়। সড়ক দুর্ঘটনা কমানো ও দুর্ঘটনার কারণে যাতে এক একটি পরিবারে কান্নার রোল এভাবে আর উৎকট না হয়, এ জন্য সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ পঙ্গু হচ্ছে এবং এর একটা বড় অংশই হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে। পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষটি যদি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হন, তাহলে তো কথাই নেই। তিনি উল্টো পরিবারের বোঝা হয়ে যান। তার পরিবার হয়ে পড়ে নিঃস্ব।

এভাবে সড়ক নৈরাজ্য চলতেই থাকবে; এর বিপরীতে আমরা শুধু সরকার ও সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি শুনতেই থাকব- তা তো হতে পারে না। পরিবহন খাতে নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলার আরও একটি কারণ হলো, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ খাতটির অবয়বও পাল্টে যায়। ক্ষমতাসীন মহলের বলবানদের ছায়া পড়ে এ খাতে এবং একে ঘিরে রমরমা বাণিজ্যের নতুন নতুন দরজাও খুলে যায়। মানুষের জীবন নিয়ে তো এভাবে জুয়া চলতে পারে না। নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের সময় দেখা গেছে, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের সর্বোচ্চ দণ্ড নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে জোর আপত্তি এসেছে সরকারের ভেতরেরই কারও কারও কাছ থেকে। এ রকম পরিস্থিতি যেখানে বিদ্যমান, সেখানে আমরা নিস্কণ্টক, দুর্ভাবনামুক্ত নিরাপদ সড়কের প্রত্যাশা করি কী করে? ফের একই কারণে, একই প্রেক্ষাপটে আকাশ-মিতু দম্পতির যে মর্মন্তুদ চিত্র প্রত্যক্ষ করতে হলো, এ রকম কি চলতেই থাকবে? কোনো সভ্য-মানবিক সমাজে দায়-দায়িত্বহীন ও উচ্ছৃঙ্খলদের কারণে এভাবে একের পর এক জীবনপ্রদীপ নিভে যেতে পারে না। সরকার এর দায় এড়াতে পারে না। সড়ক নৈরাজ্যের যবনিকাপাত ঘটাতেই হবে।
  সাংবাদিক ও লেখক

deba_bishnu@yahoo.com