সমাজ

নারীর নিরাপত্তাহীনতা এবং নোয়াখালীর বার্তা

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২১

খুশী কবির

বাংলাদেশের সব এলাকায় নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, উস্কানি ও উত্ত্যক্তকরণের ঘটনা অতীতেও ছিল, বর্তমানে আছে। তবে, আমরা দেখছি সাম্প্রতিককালে শুধু ধর্ষণের মাত্রা বা সংখ্যাই বাড়েনি; এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ধর্ষণের নানান ধরন ও দিক। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, পাশবিক নির্যাতনে রক্তক্ষরণে মৃত্যুর মতো অমানুষিক কর্মকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন সব বয়সের নারী। শিশু, কিশোরী, যুবতী, বৃদ্ধা, বিবাহিত, অবিবাহিত, শিক্ষিত, অশিক্ষিত সব ধরনের নারীই ধর্ষণ-সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে ধর্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ সব শ্রেণির সব বয়সের পুরুষ। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভুক্তভোগী নারীর তুলনায় ধর্ষকের বয়সের বিস্তর ফারাক। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত থাকে যুবক বা উঠতি বয়সের তরুণ। সুরক্ষিত বাসা থেকে শুরু করে গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক হোটেল, পরিত্যক্ত বাড়ি, স্থান- সর্বত্রই ঘটছে এ জঘন্য ঘটনা।

এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত বিশ্নেষণ করলে ফুটে ওঠে সমাজের ভঙ্গুর দশা। আমাদের সমাজে নেমে এসেছে চরম অবক্ষয়। সেখানে নৈতিকতার বালাই নেই; নেই সামাজিক কোনো ভয়-ভীতি-অনুশাসন। সমাজকে যেন অনেকে তোয়াক্কাই করছে না। অপরাধীরা ভাবার অবকাশ পায়- তারা যাই করুক; তাদের কোনো শাস্তি হবে না। কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যাবে। এতে বোঝা যায়, সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা বিপর্যয় ঘটেছে। সরকার, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সুশীল সমাজকে এদিকে গুরুত্বের সঙ্গে দৃষ্টি দিতে হবে। সামাজিক অবক্ষয় রোধে সমন্বিত উদ্যোগে বিলম্ব শুভকর নয়।

সম্প্রতি নোয়াখালীর হাতিয়ায় এক নারীকে যে পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে, তা বিবেকবান যে কোনো মানুষকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। নোয়াখালীতে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা কিন্তু এটিই প্রথম নয়। এর আগেও এ জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলায় এক নারীকে একই কায়দায় নির্যাতন করে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। নোয়াখালীতে আমার সরেজমিন কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। কাজ করার সুবাদে জানতে পেরেছি এ ধরনের আরও বেশ কিছু পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা। যে ঘটনাগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না করতে সংবাদকর্মীদের নানাভাবে চাপে রেখেছে প্রভাবশালী মহল। শুধু যে এক নোয়াখালীতেই এমন ঘটনা ঘটছে, তা কিন্তু নয়। সারাদেশেই ঘটছে কম-বেশি এমন ঘটনা। দেশের কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়।

বেগমগঞ্জের সেই ঘটনার সরেজমিন তদন্ত করে জানা গিয়েছিল, নির্যাতনে জড়িতরা ওই নারীকে দিয়ে মাদকের কারবারসহ অন্যান্য অসামাজিক কার্যক্রম চালাতে চেয়েছিল। তারা ওই নারীকে নানাভাবে চাপ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রলোভনও দেখায়। কিন্তু ওই নারী তাদের প্রত্যাখ্যান করে ওই এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। এতে তারা নির্যাতনের সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেয়। হাতিয়ার এই ঘটনার সঙ্গেও সে রকম কোনো প্রেক্ষাপট আছে কিনা, খতিয়ে দেখা দরকার। অবশ্য এখন পর্যন্ত নির্যাতিত নারীর সঙ্গে অভিযুক্তদের সম্পত্তির বিরোধ থাকার তথ্য সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। নোয়াখালীতে ফের যে বর্বরতার চিত্র দেখা গেল তা সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না।

নারীকে নির্যাতন ও তার ভিডিও ধারণ করে রাখা, ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে না। বরং এ ধরনের অপরাধের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে গেছে। কারণ অধিকাংশ ঘটনাই চাপা পড়ে থাকছে। ধর্ষণ বা নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও ধারণ করার উদ্দেশ্য বহুমুখী। প্রথমত, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা। দ্বিতীয়ত, একই ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে দীর্ঘদিন অনৈতিক কাজে বাধ্য করা। তৃতীয়ত, ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা। আর কোনোভাবে অবস্থা বেগতিক দেখলে অপরাধীরা সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এর উদ্দেশ্য থাকে ভুক্তভোগী যেন কোথাও মুখ দেখাতে না পারে; সে ও তার পরিবার যেন সমাজচ্যুত হয়। আমাদের সমাজে এখনও রক্ষণশীলতা বিরাজমান। অপরাধীরা এ পরিস্থিতিকেই সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে এবং ভুক্তভোগীকে সমাজে হেয় করে। এতে কোথাও তার কোনো অবস্থান থাকে না। সর্বত্র অপমান ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয় তাদের, যা একটি মানুষকে হত্যা করার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

পরিবার, সমাজ, ধর্ষক ও প্রভাবশালীদের ভয়ে অনেক নির্যাতিতা কোথাও অভিযোগ করতে পারছেন না। নোয়াখালীতে এক নারী তার স্বামীর অমতে ধর্ষকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করায় তাকে তালাক দেয় স্বামী। এমনকি আরও লক্ষ্য করি, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের কোনো কোনো সদস্য বিশেষ করে স্বামীর ইন্ধনে কিংবা সহায়তার কারণে ধর্ষণ কিংবা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারীরা। সম্প্রতি রাজধানীর খিলগাঁওয়ে স্বামীর সহায়তা ও উপস্থিতিতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক নারী। নারী যখন তার স্বামীর ইন্ধনে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তখন অবশ্যই প্রশ্ন তুলতে হবে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার দিকে। কারণ আমাদের সামাজিক অবক্ষয় ও নারীবিদ্বেষ ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে।

আমাদের প্রশাসন ও আইনি ব্যবস্থাও কি নারীদের সুরক্ষিত রাখতে, নিরাপত্তা দিতে এবং ন্যায়বিচার পেতে যথাযথ ভূমিকা রাখছে? সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী হাতিয়ার নির্যাতিত ওই নারী থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা গ্রহণ করেনি। পরে তাকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। মূলত সেখানে প্রশাসনের যে ধরনের ভূমিকা রাখার কথা, গত কয়েক দিনে তা প্রত্যক্ষ করা যায়নি। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় থানা মামলা নিতে চায় না, এমন অভিযোগ নতুন নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে- পুলিশ মামলা না নিয়ে বরং ভুক্তভোগীকে হয়রানি করেছে। আবার কোনোভাবে মামলা হলেও আসামিরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর পর বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা তো আছেই। আসামিরা জামিনে মুক্ত হলে ভুক্তভোগীর ওপর নেমে আসে নতুন মাত্রায় হুমকি-নির্যাতনের খÿ। নিম্ন আদালতে দণ্ড হলেও উচ্চ আদালত থেকে অপরাধীরা জামিন পায়। ফলে শাস্তির বিধান সীমাবদ্ধ থাকে শুধু আইনের বইয়ে। বিচার না পাওয়া, সামাজিক অসম্মান ও হতাশা থেকে অনেকেই বেছে নেয় আত্মহননের পথ।

আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছি। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। তিনি অত্যন্ত সাফল্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এছাড়া, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা অধিষ্ঠিত। আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি মানসিকতার বিকাশ না ঘটে; নারী যদি নিরাপত্তাহীনতায় থাকে এবং অপরাধীরা যদি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে দিবালোকে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পায়, তাহলে কিন্তু উন্নয়ন অর্থবহ হয় না। খুবই গুরুত্ব সহকারে বিষয়টিতে নজর দেওয়া দরকার। সরকারকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশাসনকে বলতে হবে- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ সব ধরনের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে আইনের প্রয়োগ করা হোক।
 

সমন্বয়ক, নিজেরা করি