করোনার কল্যাণ, কন্যার নাম করোনা

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২১

দাউদ হায়দার

বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো এক ইসলামী মৌলবাদী দল, গত বছর জুনে পাবলিক সমাবেশে ঘোষণা করেছে 'করোনা'র আসল অর্থ। 'করোনা' মানে 'কোরআন'-'রোজা-নামাজ'। খবরটি একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত। 'দুনিয়া গুনাহয় (পাপ) ভরে গেছে, আল্লাহ তাই করোনা পাঠিয়েছেন। তার উম্মতরা (বান্দা) কোরআন-রোজা-নামাজে একনিষ্ঠ হও।' গোঁড়া খ্রিষ্টানকুলও পিছিয়ে নেই, গত সালের আগস্টে পোল্যান্ডের একজন ধর্মীয় যাজকের কথা :'ক্রিষ্টিয়ান রিচুয়াল নোশন' (পালন করা)। অর্থাৎ 'করোনা' (সংক্ষিপ্ত) করোনাকালে মানতে হবে। যথাযথ পালন করতে হবে। করোনা নিয়ে নানা দেশে নানা কথন, রঙ্গরসিকতা। ভারতের উত্তরপ্রদেশে নাকি এক কন্যার (জন্ম অক্টোবরে) নামকরণ 'করোনা দেবী'। করুণা কিংবা কারিনা নয়। করোনায় নাজেহাল রাষ্ট্রকর্তা, শাসক দল। রাজনীতিকরাও। ট্রাম্প তাচ্ছিল্য করে কতটা বিপর্যস্ত, খেসারত দিয়েছেন- ভোটে প্রমাণিত। বেচারার বহু দোষের একটি করোনার সঙ্গে ইতরামো। 'সে তোমায় বধিবে কদম্বমূলে।'

করোনার সব কি মন্দ? আনন্দজনক নয় কিছু? ঠিক যে, দেশে দেশে অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব, ছোট ছোট ব্যবসা গোল্লায় গেছে। বিস্তর মানুষের মৃত্যু, ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা; বার-রেস্তোরাঁয় আড্ডা নেই; ক্লাব-ডিস্কো, জলসা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ। বন্ধুবান্ধবের দেখা-সাক্ষাৎ স্মৃতি। ভয়ে-আতঙ্কে ঘরবন্দি। প্রেমে ঘাটতি। স্বামী-স্ত্রী বা পার্টনারের সঙ্গে বেলা-অবেলায় খিটিমিটি, ঝামেলা। মানসিক বিপর্যয়। এসব অবশ্য ইউরোপীয় কালচারে ঘটমান। উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকাও বাদ নেই। এশিয়া বাদ? আফ্রিকা? 'ভার্চুয়াল' সমাবেশ এখন রসিকতা, 'প্রেম নেই প্রেমের গীত', 'রাধা আছে কৃষ্ণ আছে লীলা নেই', 'কিবা দিন কিবা রাত, লো সজনী!' হা-হুতাশ চোখে-মুখে-কণ্ঠে।

আজকের দিনে বৈষ্ণব কবিরা নেই। থাকলে বলতেন, 'হায় করোনা, একি যাতনা! মর্মে-মর্মে পশি ব্যথা-বেদনা।'

-না, এতটা হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বার্লিনভিত্তিক 'আভাজ' সামাজিক গবেষণায় বলছে, করোনায় প্রমাণিত হচ্ছে আজকের সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্রের এবং মানবিক সম্পর্কে কার কী অবস্থান, কে কোন চৌহদ্দিতে, স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

রাষ্ট্র রাজনীতি-সামাজিকতায় মানুষের নিকটদূরত্বের খতিয়ান বিভাজিত। দেশের রাষ্ট্রিক ব্যবস্থাপনায়। দেশের আর্থিক কাঠামোয়।

বললেও, করোনার মাহাত্ম্যে মুখরিত বহু দেশ। বিশেষত ইউরোপ।

আমরা জানি, ইউরোপে জনসংখ্যা ক্রমশ কমতির দিকে। এশিয়ার জাপানে, দক্ষিণ কোরিয়ায়। বছর কুড়ি আগে নরওয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য অভিনব কার্যক্রম শুরু করে। স্বামী-স্ত্রী বা পার্টনারদের ঢালাও সুযোগ-সুবিধা, দুই বছর চাকরি-বাকরি করতে হবে না। সব রকম সাহায্য, ভাতা, আর্থিক সহায়তা পাবে। চাই শুধু সন্তান, জনসংখ্যা বৃদ্ধি। নরডিক দেশের মধ্যে নরওয়ে সবচেয়ে ধনী। আখেরে কাজ হয়নি। করোনা মহামারির দাপটে নরওয়েসহ নরডিক দেশগুলো (নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড) মহাখুশি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি (গত বছরে ১.০৪)। জানুয়ারির ১০ তারিখের সমীক্ষায় প্রকাশিত। ইউরোপও আনন্দিত। ইতালি, অস্ট্রিয়া, বেনেলুক্স (বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, লুক্সেমবুর্গ), জার্মানি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি। ৩.০১। গত কুড়ি বছরে যা হয়নি। জার্মান মিডিয়ায় ফলাও প্রচারিত। জার্মানির ফ্যামিলি মন্ত্রণালয় বলেছে, 'করোনার কল্যাণ। দুঃখ দিনেও।'

করোনায় বাংলাদেশ, ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কোনো উল্লেখ নেই মিডিয়ায়। আর কবিতায় পড়েছিলাম (কবির নাম মনে নেই), 'প্রতিমুহূর্তে জন্ম।'

করোনার ভালোমন্দ নিয়ে গবেষণা চলছে খুব। জার্মান সামাজিক সংগঠনগুলো উঠেপড়ে লেগেছে। প্রতিবেশী বললেন, 'তা চলুক, করোনার কল্যাণে কন্যার জনক হয়েছি। কন্যার নাম করোনা।'

আমরা সেলিব্রেট করলাম। করোনা যুগ যুগ জিও। করোনার মৃত্যু হলে সন্তান সংখ্যার লোপ? এও কি ভবিষ্যতের মহামারি?

কবি