শতবর্ষ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: দায়মোচনের এখনই সময়

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২১

রঞ্জন কর্মকার

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। গত ১ জুলাই ২০২০ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। অর্থাৎ ওই দিনে শততম বর্ষে পা রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯২১ সালে। ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চল তথা পূর্ব বাংলার মানুষের শিক্ষা ও উন্নয়ন এবং স্বাধীন জাতিসত্তা বিকাশের লক্ষ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রাথমিকভাবে তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগের সমন্বয়ে মোট ৮৪৭ শিক্ষার্থী এবং মাত্র ৬০ শিক্ষক নিয়ে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এটিই ছিল একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ধীরে ধীরে এর পরিধি বিস্তৃত এবং অসংখ্য কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। পাশাপাশি নতুন নতুন অনুষদ, বিভাগ ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। আবাসিক হল নির্মাণ করা হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশের উৎসভূমির নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সুদীর্ঘ ৯৯ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা, প্রগতি ও উন্নয়নে যে গৌরবময় অবদান রেখেছে, তা এককথায় অনন্য। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি এ দেশের মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার সূতিকাগার হিসেবে কাজ করেছে। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং সত্তরের নির্বাচন- প্রতিটি পর্বেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান একেবারে কেন্দ্রে। আমরা এ বছরেই উদযাপন করব স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। বাংলাদেশের ইতিহাস আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস তাই জড়াজড়ি করে বেড়ে উঠেছে একসঙ্গে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; যার নেতৃত্ব এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে সূতিকাগার হয়ে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মচারীরা প্রতিটি মুক্তি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বুকের রক্ত দিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন; সফলতা এনেছেন। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী-ছাত্রছাত্রীসহ অনেকেই শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশের জন্মের পরও গণমানুষের যে কোনো অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অগ্রগামী ও নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র-শিক্ষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সারাদেশের সর্বোচ্চ মেধাবী শিক্ষার্থীরাই ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। জনগণের অর্থে পরিচালিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও মেধার বিষয়কেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হতে হয়। এখানে নামমাত্র বেতন, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাসহ শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সুযোগ পান। ফলে উচ্চ বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পাশাপাশি নিম্নবিত্ত, খেটে খাওয়া মানুষ কিংবা গ্রামের একজন কৃষক ও দিনমজুরের সন্তানের পক্ষেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে তার ও পরিবারের আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বর্তমানে যেসব শিক্ষার্থী এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন, তার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্নআয়ের পরিবার থেকে আসা। আর এটা সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকারের নেওয়া শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ পর্যায়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে।

এটা প্রমাণিত যে, তৃণমূল পর্যায়ের ছেলেমেয়েরা মেধা বিকাশের সুযোগ পেলে যে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সফলতা পায় এবং দেশের সম্পদে পরিণত হয়। ঢাবি এই দীর্ঘ পথচলার মধ্য দিয়ে গ্রামীণ তৃণমূলের নিম্নআয়ের পরিবারের বাবা-মায়ের সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন পূরণে ভূমিকা পালন করে আসছে। গত ৯৯ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছে বিজ্ঞানী, শিক্ষক, গবেষক, রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, আইনবিদ, বিচারপতি, সমাজকর্মী, সাংবাদিকসহ দক্ষ মানবসম্পদ। তারা দেশ-বিদেশে যার যার অবস্থানে থেকে অবদান রেখে যাচ্ছেন।

অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একটি জাতি গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আত্মনির্ভরশীল, মর্যাদাপূর্ণ একটি জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা স্ব স্ব অবস্থানে থেকে অবদান রেখে যাচ্ছেন। যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আজ মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর কাছে পরিচিতি পাচ্ছে। আর এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী মানবতার জননী শেখ হাসিনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৪৬ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন এবং শিক্ষক দুই সহস্রাধিক। এই ব্যাপকসংখ্যক শিক্ষার্থীর স্থান সংকুলান এবং যথাযথ পাঠদান দিনে দিনে জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সমস্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আবাসন সমস্যা। বেশকিছু নতুন হল নির্মাণ করেও এ সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে গেস্টরুম ও গণরুম সংস্কৃতি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের জন্য একটি অশনি সংকেত। পর্যাপ্ত রুম না থাকায় গণরুম বা একই রুমে অনেক শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। হলের পরিবেশ, পানি ও খাবারের মান নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন, যা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্তরায়। ক্রমবর্ধমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জন্য ক্লাসরুম ও ভবনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলেও তা প্রয়োজনের সবটুকু মিটাতে পারছে না। বর্তমান সময়ে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ নিম্নআয়ের পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন পরিচালনা। বিশেষ করে অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থী যাতে ঝরে না পড়ে তা নিশ্চিত করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের স্বপ্ন জাগানোর উৎসভূমি। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা অনেকেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে গিয়েছি। অনেকে সফল উদ্যোক্তার সাফল্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীরাও গর্বিত। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। এখনও সে সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার জন্য গড়ে উঠেছে বিভিন্ন হল ও বিভাগীয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সম্পর্ক আরও কার্যকর করতে ১৯৪৯ সালে গঠিত হয়। আমাদের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সব সময় চেষ্টা করা হয়েছে বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার। আমাদের বর্তমান সভাপতি এ. কে. আজাদের নেতৃত্বে আমরা যখন অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্ব নিয়েছি, তার পর থেকেই নিম্নআয়ের পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের তুলনায় এ সহায়তা খুবই কম। আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই, তাদের এই মাতৃসম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দায় রয়েছে। তাই আজ শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের দায়মোচনের জন্য ব্যক্তিগত ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যারা পড়েছি তারা আজ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অত্যন্ত সাধারণ ঘরের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তুলে এনে পরম মমতায় ঠাঁই দিয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের মেধা ও মনন, মনোজগতের বিকাশ, মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার উন্মেষ ঘটিয়েছে। আমাদের জ্ঞানের দ্বার উন্মোচন করেছে, উদারনৈতিক চিন্তাধারার সূচনা করেছে, দেশপ্রেমের শিক্ষা দিয়েছে, শিক্ষা-জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার সুযোগ ও পরিবেশ দিয়েছে। তাই আমাদের দায়িত্ব রয়েছে যার যার অবস্থান থেকে, যেভাবে সম্ভব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। কেউ তার মেধা, বুদ্ধি বা জ্ঞান দিয়ে, কেউ অভিজ্ঞতা দিয়ে, কেউ আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে শিক্ষা, গবেষণা বা বৃত্তির জন্য অনুদান দিয়ে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করে এ দায়িত্ব পালন করতে পারি।

আজ এই শতবর্ষে দাঁড়িয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অ্যালামনাইকে শ্রদ্ধা জানাই। বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রতি শুভেচ্ছা এবং শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রতি অভিনন্দন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা। যেসব অ্যালাইমনাইকে ইতোমধ্যে হারিয়েছি, তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আসুন, সবাই সম্মিলিতভাবে মাতৃসম আমাদের এ বিশ্ববিদ্যালয় ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াই। 

মহাসচিব, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন