সাক্ষাৎকার: ড. মো. আখতারুজ্জামান

গবেষণাকর্মেও জাতিকে নেতৃত্ব দেবে শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২১

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: শেখ রোকন ও সুদীপ্ত সাইফুল

অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮তম উপাচার্য হিসেবে ২০১৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ নানা দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সহসভাপতি হিসেব দায়িত্ব পালনকারী আখতারুজ্জামান ভারতের আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বরগুনা জেলার পাথরঘাটায় তার জন্ম

সমকাল: আমরা জানি, এই সাক্ষাৎকার যেদিন প্রকাশ হচ্ছে, সেদিন এ দেশের প্রাচীনতম ও নানা বিবেচনায় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটবে। ৫০ বছর বয়সী একটি রাষ্ট্রের জন্য এটা নিশ্চয়ই গৌরবের।

মো. আখতারুজ্জামান: নিশ্চয়ই বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও বাঙালি জাতির জন্য এটা গৌরবের উপলক্ষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার নয়; বাঙালি জাতির জীবনে যা কিছু বড় বড় অর্জন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে ভাষা আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন- সবকিছুতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়। করোনা পরিস্থিতি না থাকলে শতবর্ষের অনুষ্ঠানের সূচনার দিনই আরও আড়ম্বরপূর্ণভাবে পালিত হতো। তারপরও আমরা যথাসম্ভব ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখছি। শতবর্ষের অনুষ্ঠানমালার প্রথম দিনের ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি থাকছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বছর ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য এবং রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ আমাদের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন বলে আশা করছি।

সমকাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ এবং বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আপনারা একটি রূপকল্প প্রণয়ন করেছেন। এর তাৎপর্য কী?

আখতারুজ্জামান: ধন্যবাদ যে, সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বিষয়টি জানতে চেয়েছেন। আমাদের রূপকল্পের মূল বক্তব্য হচ্ছে- টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণ ও দক্ষ মানবশক্তি তৈরি। এখানে তিনটি বিষয় রয়েছে। প্রথমটি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন; দ্বিতীয়টি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণ; তৃতীয়টি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। এই রূপকল্প বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু ক্ষেত্র চিহ্নিত হয়েছে। সেই ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে একটি হলো শিক্ষার সামগ্রিক; সার্বিক যে পরিবেশ, সেই পরিবেশের উন্নয়ন। একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। মৌলিক, প্রায়োগিক গবেষণা জোরদারকরণ ও প্রকাশনা। অর্থাৎ গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্র সম্প্র্রসারণ করা।

সমকাল: কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের অনেকের আক্ষেপের একটি হচ্ছে মৌলিক গবেষণা কম।

আখতারুজ্জামান: আপনাদের আক্ষেপকে আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতে চাই। কারণ, এ আক্ষেপ ব্যক্তিগত প্রাপ্তির কোনো বিষয় নয়। আমি মনে করি, গবেষণার ক্ষেত্রটি যত জোরদার হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম-যশ-খ্যাতি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার অবস্থান ততই মজবুত ও শক্তিশালী হবে। কিন্তু একটি আনন্দদায়ক তথ্যও আপনাদের দিতে চাই। সপ্তাহখানেক আগে একটি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গবেষণার শীর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালের একটি পরিসংখ্যান সেখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ৫০০ থেকে এক হাজার গবেষণা হচ্ছে; গবেষণা প্রকল্প ও গবেষণাধর্মী প্রকাশনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২০ সালে এসে লক্ষণীয় মাত্রায় ছয় হাজার থেকে আট হাজারে উপনীত হয়েছে গবেষণার সংখ্যা। ফলে এটা বলতে আমার দ্বিধা নেই যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সম্প্রসারণ ঘটছে।

সমকাল: তাহলে সেসব গবেষণা আমরা দেখতে পাই না কেন?

আখতারুজ্জামান: দেখুন, আমাদের অনেক গবেষণার যথাযথ ডকুমেন্টেশন হয় না। প্রচার কম হয়। এ জায়গায় আমাদের ঘাটতি রয়েছে। এটি আমি অকপটে স্বীকার করছি। এর দায়ভার আমাদের নিতেই হবে। কেন ডকুমেন্টেশন হবে না? গবেষণা ও গবেষণার ডকুমেন্টেশন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত। এখন আমরা সেদিকেই মনোনিবেশ করেছি। ডকুমেন্টেশনের অভাবেই প্রকৃত তথ্য সবার কাছে পৌঁছায় না।

সমকাল: যথাযথ ডকুমেন্টেশনের অভাবেই কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়ে?

আখতারুজ্জামান: দেখুন, বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিং হয় ডাটাবেসে সংরক্ষিত তথ্যের নিরিখে। ফলে সেই মানদণ্ডে যে পয়েন্ট পাওয়ার কথা, সেটি আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পাই না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বুঝতে হলে এর সামগ্রিক অবদান আপনাকে বুঝতে হবে। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অবদান, বিশ্বে এমন আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যাবে কি? সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়, যা গণহত্যার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বে এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যাবে কি, যা জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে এককভাবে ধারণ করে? একটি জাতির বিভিন্ন অর্জনে এককভাবে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে থেকে অবদান রেখেছে? আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনের গোড়ার দিকে কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও বাঙালি জাতি বিনির্মাণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ধারাবাহিক ঘটনার মধ্য দিয়ে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। এগুলোকে আপনি কোন মানদণ্ড দিয়ে পরিমাপ করবেন?

সমকাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবদান কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ গবেষণা। শতবর্ষে দাঁড়িয়ে সেখানে কতটা জোর দিচ্ছেন?

আখতারুজ্জামান: বিনয়ের সঙ্গে বলতে পারি, গবেষণার ক্ষেত্র ও পরিধি ক্রমান্বয়ে সম্প্র্রসারিত হচ্ছে। শতবর্ষে এসে এটি আমাদের মৌলিক দর্শন হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সে কারণে শতবর্ষ উদযাপনের একটি বড় উপাদান হলো মৌলিক গবেষণা ও গ্রন্থ প্রকাশনা। সরকারের পক্ষ থেকেও আমরা বিশেষ বরাদ্দ পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা-পরামর্শে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগী হয়েছে। শতবর্ষে এসে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে গবেষণার ক্ষেত্রে যে মোমেনটাম তৈরি হয়েছে, সেটা টেকসই রাখাই হবে আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের গবেষক, আমাদের বিভাগ, ইনস্টিটিউট, গবেষণা কেন্দ্রগুলো তারা যে গবেষণা প্রকল্প জমা দিয়েছেন, আমাদের যে জার্নালগুলো আছে সেগুলোর হালনাগাদ ও মান উন্নয়ন করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে; এই গতিকে ধরে রাখতে হবে। একে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি আমরা।

সমকাল: এখন এবং ভবিষ্যতের দিনগুলোতে বায়ো-রিসার্চ খুব জরুরি হয়ে উঠছে। সে ক্ষেত্রে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে পড়েছে? করোনাবিষয়ক গবেষণায় আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে আসতে দেখলাম না।

আখতারুজ্জামান: বায়ো-রিসার্চ যে আমরা করিনি, সেটা ঢালাওভাবে বলা যাবে না। আপনি দেখবেন, কয়েক বছর আগেও আমাদের সোনালি আঁশ পাটের জিনোম সিকোয়েন্স আবিস্কার হয়েছে। করোনার ক্ষেত্রেও এটিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান বা কোনো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যেখানে কভিড-১৯ রেসপন্স টেকনিক্যাল কমিটি গঠিত হয়েছে। আপনাকে মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাস গোটা বিশ্বের জন্যই একটি নতুন বিষয়। তারপরও কমিটি গঠন করার পর একেবারেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ল্যাব তৈরি করা হয়। মহামারি মোকাবিলা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্তটিও আমরাই প্রথম গ্রহণ করি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে, মহামারি মোকাবিলা করতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। মহামারি মোকাবিলা করতে যেসব অনুষঙ্গ-উপাদান দরকার, যেমন- হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রস্তুত, মাস্ক ও ফেস শিল্ড তৈরি এবং সেগুলো সরবরাহ ও ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েছে।

সমকাল: করোনার প্রতিষেধক বা টিকা আবিস্কারবিষয়ক গবেষণায় কি এ বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে আসতে পারত না?

আখতারুজ্জামান: আপনি যদি অক্সফোর্ড কিংবা জনস হপকিন্সের সঙ্গে তুলনা করেন, তাহলে বলব সে ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জন্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় নয়। এটা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল গ্র্যাজুয়েট তৈরি করার জন্য। আর ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডেডিকেশনই হলো গবেষণা। তাদের ডেডিকেটেড রিসার্চ আছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডেডিকেটেড রিসার্চ ল্যাবের অভাব রয়েছে। এ জন্য যে বিপুল বরাদ্দ প্রয়োজন, তার ঘাটতি রয়েছে। তারপরও এখন আমরা এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে যেসব কর্মপ্রয়াস, তার অগ্রাধিকারে থাকবে গবেষণার ক্ষেত্রকে এগিয়ে নেওয়া।

সমকাল: আমরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন বোসের মতো শিক্ষক দেখেছি। এ ধরনের শিক্ষক কি কমে যাচ্ছেন?

আখতারুজ্জামান: দেখুন, সত্যেন বোস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পড়াতে আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছে চিঠি লিখলেন। বললেন- আমি ভারতের অমুক প্রান্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অমুক বলছি; আমি আপনার একজন ছাত্র। কারণ, আমি আপনার লেখা থেকে পড়াই। তার এমন অ্যাপ্রোচে মুগ্ধ হয়ে সাড়া দেন আলবার্ট আইনস্টাইন। সত্যেন বোস লেখাটি ইংরেজি ভাষায় দেন। আলবার্ট আইনস্টাইন তা জার্মান ভাষায় রূপান্তর করেন। একজন ব্যক্তির সাহচর্য এবং একজন ব্যক্তির উদ্ভাবনী ও প্রখর ধীশক্তি- এ দুটোর সম্মিলন ঘটে। ফলে আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে সত্যেন বোসের নাম জড়িত হলো। এ ধরনের ঘটনা কালেভদ্রে ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পদার্থবিজ্ঞানে অনেক আলোচিত বিজ্ঞানী ছিলেন, আছেন। মৌলিক গবেষণা তারাও সম্পাদনা করেছেন। কিন্তু যখন আলোচনা করা হয়, তখন কেবল সত্যেন বোসের নামই উঠে আসে। এর অর্থ এই নয়, অন্যরা পিছিয়ে আছেন। এটার মানে এই নয়, অন্যরা মৌলিক গবেষণা করেননি। একটি সময়ে বা যুগে কোনো ঘটনাবহ কাজ সমাজকে অনেক এগিয়ে নেয়। সেই ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ঘটেছে সত্যেন বোসের প্রাপ্তির মাধ্যমে। তবে একটি কথা বলতে দ্বিধা নেই, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পৃথিবীর অনেক বিশ্ববিদ্যালয় যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, সে গতিতে আমরা এগোতে পারিনি।

সমকাল: এগোতে না পারার প্রধান কারণগুলো কী কী?

আখতারুজ্জামান: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবিকসহ বিভিন্ন মূল্যবোধের লালনকেন্দ্র। অনেক সময় স্থিতিশীলতার বড় ঘাটতি ছিল। অনেক সময় যখন বিদেশি প্রফেসররা এ ক্যাম্পাসে আসেন, তখন অবাক দৃষ্টিতে বিভিন্ন দিকে তাকান; অনেক কথা বলেন। কারণ, এই ক্যাম্পাস এতটাই ঘটনাবহুল যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে বাইরে নিয়ে যায়। আরেকটি বিষয় সম্ভবত ভাষার সীমাবদ্ধতা। গবেষণার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ভাষা ব্যবহারের বিষয়টি খুব বেশি ফোকাসে ছিল না।

সমকাল: চীন-জাপান-রাশিয়া তো তাদের মাতৃভাষায় পাঠ্যক্রম দিয়ে গবেষণায় উন্নতি করেছে।

আখতারুজ্জামান: স্বীকার করছি, চীন, জাপান, রাশিয়া মাতৃভাষায় পড়াশোনা করে উন্নতি করেছে। এর সঙ্গে ইরানের নামও বলতে হবে আপনাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তারাও এ ধারণা থেকে সরে আসছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মেধাস্বত্ব অধিকার প্রভৃতি কারণেও তাদের আন্তর্জাতিক ভাষা অধ্যয়নের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হয়েছে।

সমকাল: গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতাও নিশ্চয় রয়েছে।

আখতারুজ্জামান: আমাদের শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ বিভিন্ন কারণে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পরিকল্পিতভাবে সম্প্র্রসারণ ঘটেনি। অবকাঠামো বা একাডেমিক ঘরানার মতো বিষয় বিজ্ঞানসম্মত ও পরিকল্পনামাফিক গড়ে ওঠেনি নানাবিধ কারণে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো মাস্টারপ্ল্যান ছিল না। আমরা প্রথমবারের মতো সরকারি অর্থায়নে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছি। সে অনুযায়ী যখন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠবে। তখন এটি হবে একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্যাম্পাস। এখানে শিক্ষার সার্বিক অনুকূল পরিবেশ গড়ে উঠবে। পরিকল্পিত উপায়ে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠবে। শিক্ষার গুণগত মানেও এর প্রভাব পড়বে। গবেষণার সুযোগ, মানও বাড়বে।

সমকাল: শিক্ষার্থীদের আবাসন, খাদ্যমানও নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যারা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাদের এ ব্যাপারে কমবেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আখতারুজ্জামান: উপযুক্ত শিক্ষা বা গবেষণার জন্য শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ উন্নত হতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষণীয় মাত্রায় ঘাটতি আছে। একজন শিক্ষার্থী যদি থাকার বেড না পায়, পড়ার টেবিল না পায়, তাহলে সে গড়ে উঠবে কীভাবে? আরেকটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে। আমরা বিভাগ বাড়িয়েছি, কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভাগগুলোর উন্নয়ন করিনি। ফলে বিভাগ বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু বিভাগের জন্য আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো বাড়েনি।

সমকাল: শতবর্ষে দাঁড়িয়ে এসব সংকট কীভাবে দূর করার কথা ভাবছেন?

আখতারুজ্জামান: আমরা এসব সংকট দূর করতেই মাস্টারপ্ল্যান করেছি। তবে অনেকেই রূঢ়ভাবে বলে থাকেন, বর্তমান প্রশাসন শুধু বিল্ডিং নির্মাণ করছে। তাদের জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, এ মুহূর্তে আমাদের ১৩ লাখ বর্গফুট একাডেমিক স্পেসের ঘাটতি আছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিভাগের সংখ্যার সঙ্গে একাডেমিক স্পেসের ভারসাম্য আনার কাজটি আমাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করতে হবে।

সমকাল: শিক্ষকদের মান বাড়াতে হবে না? গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সমকালে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি বলেছিলেন, শিক্ষার মান অবনতির একটি কারণ হলো শিক্ষক রাজনীতি।

আখতারুজ্জামান: আমি আনিসুজ্জামান স্যারের পর্যবেক্ষেণের প্রতি সম্মান রেখে বলছি, রাজনীতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি থেকেই ছিল। এ বিশ্ববিদ্যালয় কখনও রাজনীতিবিমুখ ছিল না। যখন ক্রমসম্প্র্রসারণ ঘটে, তখন যদি তা অপরিকল্পিত হয়, তাহলে বিভিন্ন জায়গায় ঘাটতি থাকে। এর প্রভাবেই এখন আমরা ভুগছি। আনিসুজ্জামান স্যার যথাযথই বলেছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ ও সমন্বিত বিকাশ না ঘটার কারণেই এমনটি হয়েছে।

সমকাল: আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান প্রশ্নে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদী চরিত্রের ওপর জোর দিয়ে আসছেন। সাম্প্রতিককালে সেই প্রতিবাদী চরিত্রও কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে?

আখতারুজ্জামান: আমি মনে করি না; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী হওয়ার জায়গাগুলো আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশ, জাতি, গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্র্রদায়িকতা ও মানবতার পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় ছিল। সব সময়ই অন্যায়-অবিচার দেখলে সবার আগে প্রতিবাদমুখর হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই চেতনাকে অতীতে ধারণ করেছে, এখনও করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।

সমকাল: আপনি শতবর্ষ উদযাপনের মুহূর্তে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। দেড়শ বছরে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় দেখতে চান?

আখতারুজ্জামান: আমাদের জাতীয় জীবনে দুটি রূপকল্প আছে। একটি হলো ২০৪১ ঘিরে; আরেকটি ২১০০ সাল ঘিরে; ডেল্টা প্ল্যান। এ দুই পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও নেতৃত্ব দেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পথে এগিয়ে নেবে বাংলাদেশকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অতীতের মতো ভবিষ্যতেও দেশ ও জাতি গঠনে নেতৃত্ব দিয়ে যাবে।

সমকাল: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

আখতারুজ্জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।