নির্বাচনী প্রচার অভিযানে জো বাইডেন সিমাস হিনির একটি বিখ্যাত কবিতার উদ্ৃব্দতি দিয়েছিলেন- 'বিশাল সমুদ্রসম পরিবর্তনের প্রত্যাশা/যদিও ওপারে রয়েছে প্রতিশোধের হতাশা'। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অবশেষে ওয়াশিংটন ডিসির তার অফিসে শপথ নিলেন। বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে তার দিকে তাকিয়ে আছে, কারণ পরিবর্তনের জন্য তাকে বিশ্বের প্রয়োজন। বিভক্ত আমেরিকাকে একত্র করা যদি বাইডেনের প্রথম কাজ হয়, তবে দ্বিতীয় কাজ হওয়া উচিত আমেরিকাকে একঘরে থাকা থেকে উদ্ধার করা; এবং আমেরিকাকে এটা দেখাতে যে, বিশ্বকে তাদের প্রয়োজন। আর বিশ্বকে দেখাতে যে, আমাদের এখনও আমেরিকাকে প্রয়োজন।

মহামারির ঝুঁকি প্রাধান্য দিয়ে অর্থনৈতিক ধস ও জলবায়ু বিপর্যয় তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে একশ দিনের মধ্যে নয় বরং প্রথম দশ বা বিশ দিনের মধ্যেই সামাল দিতে হবে। ট্রাম্পের অভিশংসনের বিচারের বিষয়টি চলমান থাকলেও প্রথম দিনে জো বাইডেনকে হয়তো ভ্যাকসিনের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে দেখা যাবে। একই সঙ্গে কংগ্রেসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি উদ্ধারে বড় উদ্দীপনা প্যাকেজ ঘোষণা করবেন। বাইডেনের নিজস্ব প্রবণতা ও সেখানকার রাজনীতির নতুন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক হাজার কোটি ডলারের পরিকল্পনা আমরা দেখব।

তবে এরপর বাইডেনকে বিশ্বের দিকে নজর দিতে হবে। বিদ্যমান কিছু সংকট প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে বিপদে ফেলতে পারে। এমনকি একজন বৈশ্বিক মানুষ হিসেবেও তিনি জানেন যে, ভাইরাসমুক্তি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দূষণমুক্ত যুক্তরাষ্ট্র গঠন- এ তিনটি দেশীয় সমস্যার যে কোনো একটি সমাধান করতে হলেও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা প্রয়োজন। এখনও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলে কেবল পরিত্যাজ্যই নয়, অবজ্ঞারও পাত্র।

আমরা দেখেছি স্নায়ুযুদ্ধের পর পরই এক মেরুর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র বহুমাত্রিক ভূমিকা পালন করেছে। (৩০ বছর আগে ইরাক-কুয়েত যুদ্ধে বৈশ্বিক জোটবদ্ধতার কথা চিন্তা করতে পারি)। সাম্প্রতিক বহুমাত্রিক বিশ্বে সবাই নিজ নিজ স্বার্থে আচরণ করছে। ট্রাম্প যে আগ্রাসী 'পপুলিস্ট ন্যাশনালিজম' চালু করে গেছে তা ভাঙা সহজ হবে না। সুতরাং অতীতে যে আন্তর্জাতিকতাবাদ আমরা দেখেছি, 'যেখানে ইচ্ছে যাও, যে দামে পাও' এখন সেরকমটা প্রত্যাশা করা উচিত হবে না। ১৯৬১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি তার অভিষেক ভাষণে এ বিষয়টি প্রাধান্য দিয়েছিলেন, যেটি দেশীয় কোনো বিষয়ে খুব কমই উল্লেখ করা হয়। এখন বাইডেন থেকে যেমন বিল ক্লিনটনের নব্বইয়ের দশকের বৈশ্বিক তৃতীয় পন্থা প্রত্যাশা করা উচিত হবে না। যে প্রচেষ্টা আমেরিকার কর্তৃত্বকে অবিসংবাদিত করেছে এবং প্রায় সব দেশকে 'ওয়াশিংটন কনসেনসাসে' একমত করেছে। এখন বিশ্বে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক কেন্দ্র রয়েছে। স্বাধীনতা ঘোষণার আড়াই শতকেরও পর এসে যুক্তরাষ্ট্রের আরও পরিমিত একটি নতুন 'ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স' বা স্বাধীনতার ঘোষণা প্রয়োজন।

বাইডেনের কথায় তাকে প্রথম সংরক্ষণবাদী মনে হলেও তিনি তার প্রচারের সময়কার কথাই আবার বলবেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এখন এর দেশীয় অগ্রাধিকারের ওপর নির্ধারিত হবে। তবে ভাইরাস নির্মূল করা, ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন গতি এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলা- এ সবকিছুই নির্ভর করবে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। সুতরাং আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, ট্রাম্পের 'অ্যালায়েন্স ফাস্র্দ্ব' তথা মিত্র প্রথমের বদলে 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির ফলে শুল্ক্ক ও বিদেশিদের নিয়ে অহেতুক ভয়ের যেসব দেয়াল গড়ে উঠেছে, নতুন প্রেসিডেন্ট সেসব ভেঙে ফেলবেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে একসঙ্গে কাজের সূত্রে বাইডেনকে আমি চিনি। বাইডেনের উচিত হবে এখনই ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে ফোন দেওয়া। কারণ, তিনি জি টোয়েন্টিভুক্ত সদস্য দেশগুলোর বর্তমান চেয়ারম্যান। তাকে অতিসত্বর বিশ্বনেতাদের নিয়ে একটি সম্মেলন করার প্রস্তাব দিক, যার মাধ্যমে বর্তমানে বিশ্বের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের যে সংকট রয়েছে তা মোকাবিলায় একটি বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি হোক।

বুধবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছেচলিল্গশতম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন জো বাইডেন

জো বাইডেন নিশ্চয়ই জানেন, তার নাগরিকদের নিরাপত্তায় টিকাই একমাত্র রক্ষাকবচ নয়, যতক্ষণ না দরিদ্র দেশগুলো টিকা কেনার সক্ষমতা অর্জন না করে। সবাই টিকা না দিলে ভাইরাস রূপ পরিবর্তন করে টিকাদানকারীকেও পুনরায় আক্রান্ত করতে পারে।

এমনকি করোনাভাইরাসের আগে সকল উন্নত দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রও উচ্চ-বেকারত্ব, নিচু-প্রবৃদ্ধির একটি দশক মোকাবিলা করেছে। এমনকি কোনো প্রধান অর্থনীতির দেশ কিংবা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশও ২০২০ সালের বেকারত্বের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আজকের যে কম মূল্যস্ম্ফীতি ও কম সুদহার দেখছি আমরা, তাতে একটি বড় বিনিয়োগের অপেক্ষা করছি। সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়বে এবং গ্রাহকের চাহিদা, প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব বাড়বে।

আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে যদি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়া সম্মত হয়ে একসঙ্গে কাজ করে, তবে বাণিজ্য যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি সংকটও নিরসন হবে। যদি প্রেসিডেন্ট বাইডেন আফ্রিকা ও উন্নয়নশীল দেশে ট্রাম্পের জরুরি সহায়তার ধারায় পরিবর্তন আনতে পারেন, পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যে বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। একুশ শতকের মার্শাল পরিকল্পনায় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ফান্ড করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ হতে পারে।

বাইডেন এই সপ্তাহে 'প্যারিস ক্লাইমেট রেকর্ডে' যোগদান করবেন। এর মাধ্যমে তার এ ঘোষণা দেওয়া উচিত যে, তিনি ডিসেম্বরে গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিতব্য কপ-২৬ জলবায়ু সম্মেলনেও যোগ দেবেন। তিনি ইতোমধ্যে বলেছেন, একুশ শতক আমাদের বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত বিপর্যয় এড়ানোর শেষ সুযোগ। তার দেশজ বিদ্যুৎ পরিকল্পনা অবশ্যই স্বাগত হবে, তবে তা যথেষ্ট নয়। আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা হলো কার্বন নিঃসরণ শূন্য করা। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে নেতৃত্ব দিয়ে সকল ধনী ও দরিদ্র দেশকে বৈশ্বিক সবুজায়ন চুক্তি বাস্তবায়ন ও ২০৩০ সালে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে সম্মত করাতেই হবে।

ট্রাম্পের ব্যর্থতায় একটি অনিরাপদ বিশ্ব থেকে মুক্তি পেয়ে বাইডেনের বিজয় একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। বাইডেন যেহেতু আশির দশকে গর্বাচেভের সঙ্গে রোনাল্ড রিগ্যানের পরমাণু অস্ত্র হ্রাসকরণ চুক্তি সম্পন্ন করতে মস্কো গিয়েছিলেন। তিনি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ দাবির পুরোভাগে ছিলেন। আমি বিশ্বাস করি, বাইডেন পরমাণু সময়কার প্রথম প্রেসিডেন্ট হবেন যিনি পরমাণু অস্ত্রের 'প্রথম ব্যবহাকারী নয়' চুক্তি ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করতে পারবেন। পরমাণু পরীক্ষা ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিতে নিষেধাজ্ঞায় বৈশ্বিক আলোচনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে নিরস্ত্রীকরণে দশকে পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় বিবেচনা করবে। এসব ঐতিহাসিক পদক্ষেপ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, তুরস্ক ও যে কোনো পরমাণুপ্রত্যাশী দেশকে পথ দেখাবে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়াকে আরও একঘরে করে দেবে।

নব্বই বছর আগে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট অনেক চাপ ও সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে যথেষ্ট পরিবর্তনে সক্ষম হন। রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বাগত ভাষণে আহ্বান জানিয়েছিলেন 'অ্যাকশন অ্যান্ড অ্যাকশন নাউ'। ওই বিপজ্জনক সময়ের জন্য তা ছিল যথোপযুক্ত। প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিশ্চয়ই তা জানেন। সিমাস হিনি যেমনটা বলেছেন, 'ভালো যখন ঘটছে নিশ্চয়ই তা ইতিহাস তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।' বাইডেনের দায়িত্ব সত্যিই কম নয়।

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী; গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

মন্তব্য করুন