সমকালীন প্রসঙ্গ

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও আগামীর অর্থনীতি

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২১

ড. আতিউর রহমান

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক মহাসংকট কাল মোকাবিলা করছিল। রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। কোটিখানেক শরণার্থী দেশে ফিরেছেন। খাদ্য সংকট তীব্র। বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত করছিল। নোংরা খাদ্য কূটনীতি ও উচ্চ মূল্যস্টম্ফীতি নতুন দেশের নতুন সরকারকে দারুণ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও অস্থির। এমন সংকটকালেও বঙ্গবন্ধু প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা উদ্বোধন করতে দ্বিধা করেননি। তারও আগে প্রজাতন্ত্রের সংবিধান প্রণয়ন করে তিনি দেশবাসীর মৌলিক অধিকারের ভিত্তি নিশ্চিত করেছেন। দুর্যোগ-দুর্বিপাকেও যে আগামীর চিন্তা করা যায়, এ দুটি দলিল তৈরির মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধু এর স্পষ্ট বার্তা দেন। প্রায় পাঁচ দশক পরে বঙ্গবন্ধুকন্যাও অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা দলিলটি উদ্বোধন করে একই ধরনের বার্তা দিলেন। বঙ্গবন্ধুর মতো তিনিও যে অনেক দূরে দেখতে পান। এমন স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় এবং মহামারিজনিত অর্থনৈতিক অচলাবস্থা থেকে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে একটি সুনির্দিষ্ট সুদূরপ্রসারী নীতিকাঠামোর আওতায় আনার এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে সাহসী নেতৃত্বের প্রতিফলন।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় খুব স্বাভাবিক কারণেই আমাদের প্রত্যাশার তুলনায় প্রধান প্রধান লক্ষ্যে খানিকটা কাটছাঁট করতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিলাম তা থেকে কিছুটা কমিয়ে ৭.৭ শতাংশ করা হয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে রপ্তানিতে বাড়তি চাপের যে আশঙ্কা রয়েছে সে বিবেচনায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও চ্যালেঞ্জিং। তবে সারা পৃথিবীর অর্থনীতি যখন পাঁচ শতাংশেরও বেশি হারে সংকুচিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তখন আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ছয় শতাংশের ওপরে থাকলেই তা অত্যন্ত সন্তোষজনক। ইতোমধ্যে ডিজিটাল অর্থনীতির ব্যাপক প্রসার দেখতে পাচ্ছি, কৃষি এখনও ভালো করছে (তবে কৃষিপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা জরুরি), খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে এবং সার্বিকভাবে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতকে পর্যাপ্ত প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৬৫ লাখ কোটি টাকার এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে প্রবৃদ্ধি সহায়ক উন্নয়ন ঘটিয়ে এক কোটি তেরো লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। মহামারি মোকাবিলায় আমরা যে দক্ষতা দেখিয়েছি এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তার প্রতিফলন ঘটেছে এই পরিকল্পনায়। বরাবরের মতো ব্যক্তি খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পাঁচ বছরে মোট যে বিনিয়োগ হবে তার ৮১ শতাংশই আসবে ব্যক্তি খাত থেকে। বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে হলে আমাদের ব্যবসায় পরিবেশ আরও উন্নত করতে হবে। নিয়ম-নীতি আরও সহজ ও উদ্যোক্তাবান্ধব করতে হবে। তাদের পর্যাপ্ত অর্থায়ন করতে হবে।

তবে আমি আশাবাদী এই কারণে যে, বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে ব্যাপক অগ্রগতি ঘটেছে। করোনার এই সংকটকালে অনেক ছোটখাটো উদ্যোক্তা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কিত সেবার চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়ছে। তাই অনেকেই ঘরে বসে ই-কমার্স এবং আউটসোর্সিংয়ের প্রসারমান সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন। তাদের জন্য অর্থ লেনদেন আরেকটু সহজ করতে পারলে এবং কর প্রণোদনা দিতে পারলে নিশ্চয়ই অর্থনীতির এই রূপান্তরের প্রক্রিয়া আরও জোরদার হবে। আশার কথা বিডা, বেজা, বেপজাসহ অন্যান্য সংশ্নিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিককালে 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস'সহ ব্যবসা সম্পর্কিত নিয়মকানুন বেশ সহজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও উদ্যোক্তা-সহায়ক অনেক রেগুলেশন সহজ করছে। এনবিআরও বসে নেই। ব্যাংকগুলোকে আরেকটু মোটিভেট করতে পারলে এবং তাদের কাজকর্ম ডিজিটালি মনিটর করা গেলে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে গতি আসবেই। বড় বিনিয়োগ ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য যেমন নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা চাই, তেমনি অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি কাম্য। এক্ষেত্রেও আশাবাদী হতে চাইছি কেননা মাতারবাড়ী, পায়রাবন্দর, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোসহ রূপপুর পারমাণবিক শক্তি প্রকল্পের বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রকৃত অর্থেই বিনিয়োগ পরিবেশের আশাব্যঞ্জক উন্নতির বার্তা দেয়। সম্প্রতি জাপানের রাষ্ট্রদূত এ কারণেই বাংলাদেশকে 'বিনিয়োগের আদর্শ গন্তব্য' বলেছেন।

এই মহামারি দেশে এবং বিদেশে আমাদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমিয়েছে। মানুষের আয়-রোজগার কমে গেছে। তাই তাদের ভোগও কমে গেছে। ঘরে বসে কাজ করেন বলে নতুন জামা-কাপড় ও জুতা কিনতে হচ্ছে না। তাই এমনটি হচ্ছে। আবার চাহিদা কম হলে উৎপাদনে যুক্ত মানুষের হাতে টাকা যায় না। এই দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়াটাই এখন সময়ের দাবি। আর এই জায়গাটিতেই অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্যসমূহ আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এক কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যটি খুবই সময়োপযোগী বলা চলে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই পরিকল্পনা নজর রেখেছে। বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অপরিহার্য। কেবল শিল্প খাতই নয়, সেবা খাত ও আধুনিক কৃষির বিকাশও বহুলাংশে নির্ভর করে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। গত এক দশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সুবিবেচনাপ্রসূত নীতিগ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের একটি ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করেছি। কাজেই এবারের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শেষে যে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জনে আমরা সমর্থ হবো বলে আমার বিশ্বাস। তবে উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ যাতে দক্ষতার সাথে গ্রাহকের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়, তেমন বিতরণ ব্যবস্থার ওপর পর্যাপ্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উপাদন করছি তার পুরোটা বিতরণ করতে পারছি না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সবুজ প্রবৃদ্ধির পক্ষে বৈশ্বিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কাজেই আশা করছি এই বিদ্যুতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। প্রধানমন্ত্রী ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে বিশ্ববিখ্যাত 'দি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস'-এ লিখেছেন 'জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের সবার জন্যই হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসবই আমাদের একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ এবং নিরাপদ পৃথিবী গড়ার সাধারণ সমাধান খুঁজে পেতে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।'

নিঃসন্দেহে আমরা করোনাজনিত অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা মোকাবিলায় অনেক দেশের চেয়ে ভালো করেছি। ব্লুমবার্গের কভিড রেজিলিয়েন্স র‌্যাংকিং-এ বাংলাদেশ শীর্ষ ২০টি দেশের একটি। তবে এ নিয়ে খুব বেশি আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে, এই দুর্যোগে আগে আমরা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির ধারায় প্রবেশ করব বলে প্রত্যাশা করছিলাম। বাদ সেধেছে এই কভিড-১৯। তাই অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা মেয়াদান্তে আমরা ৮.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছি। সত্যি সত্যি এই হার অর্জন করা সম্ভব হলে তাই বা কম কি?

তবে কষ্টের কথা এই যে, দারিদ্র্য নিরসনে আমরা যে গত বারো বছরে চোখ ধাঁধানো সাফল্য দেখিয়েছিলাম তা থেকে এই মহামারি বাংলাদেশকে বিচ্যুত করেছে। এক বছর আগেও আমাদের দারিদ্র্য হার ২০ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্য ১০ শতাংশের আশপাশে ছিল। কিন্তু করোনায় দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে প্রায় দশ শতাংশ। তাই এই পরিকল্পনা পাঁচ বছর শেষে এই দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে এনে ১৫.৬ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এই হারে পৌঁছতেও আমাদের এগোতে হবে সতর্কভাবে। আর দারিদ্র্য তো শুধু অর্থের অভাব নয়। সে জন্যই আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, কাউকে গৃহহীন ও বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রাখবেন না- তখন মনে হয় দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে আমরা ফের সফল হবো। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বছরে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি খরচ করার পরিকল্পনা করছে বঙ্গবন্ধুকন্যার সরকার। নিঃসন্দেহে এই পরিকল্পনা আশাজাগানিয়া। সামাজিক সুরক্ষায় ধারাবাহিকতার কারণে এই মহাসংকটে একজন মানুষও অনাহারে মারা যাননি।

আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জও কিন্তু অনেক। বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ তো আছেই। আর আছে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ। এতসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে সাহসের সঙ্গে। হয়তো পরিকল্পনার নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহের কোনো কোনোটি পুরোপুরি অর্জন করা যাবে না। আবার কোথাও হয়তো যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তার চেয়ে ভালো করার দরকার। যেমন কর-জিডিপি অনুপাত ১২.৩ শতাংশের যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে তা যথার্থ হয়নি। আমি মনে করি তা অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। পারলে আরও বেশি। কর আহরণ না বাড়াতে পারলে সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে আশানুরূপ গতি দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। আমার ধারণা ডিজিটাল সেবার জন্য যে অবকাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছে তার সুফল নিয়ে খুব সহজেই কর আহরণে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। নিশ্চয়ই আমরা অভ্যন্তরীণ সম্পদ সমাবেশে সাফল্য অর্জন করতে পারব। তবে আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও সহজ শর্তে কম খরচের দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ আহরণের সুযোগ বাড়বে। এ জন্য স্মার্ট অর্থনৈতিক কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিশেষ করে বিদেশি দায় খুব বেশি না থাকা, মূল্যস্টম্ফীতি নিয়ন্ত্রণাধীন, বিদেশি মুদ্রার সাথে টাকার স্থিতিশীল লেনদেন, বাড়ন্ত রিজার্ভ, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক উন্নয়নে অংশীদারিত্বের সুফলসহ সাফল্যের গল্পগুলো যদি আমরা আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে সঠিকভাবে বলতে পারি, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্পদ সমাবেশ এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ কষ্টকর হবে না।

আমাদের অর্থনীতিতে যেসব পরিবর্তনের চারা চোখে পড়ছে, সেগুলোকে লালন করে বড় করতে হবে। এই পরিকল্পনাতেও এসবের সন্ধান মেলে। যেসব খাতে আরও জোরালোভাবে নীতি-সমর্থন ও বাড়তি অর্থায়নের প্রয়োজন, সেসবের কয়েকটি উল্লেখ করছি- মানুষের ওপর বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে। মহামারির কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের ঝুঁকি ও গুরুত্ব নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে। জীবন-জীবিকার স্বার্থেই এসব খাতে এবারের বাজেট এবং পরিকল্পনার সময় জুড়েই উল্লেখযোগ্য হারে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এসব খাতের কাঙ্ক্ষিত বিকাশের জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তি-সম্পর্কিত অবকাঠামোর ওপর বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য। কৃষিই যে আমাদের রক্ষাকবচ তা এখন প্রমাণিত। তাই এ খাতের আধুনিকায়ন, বহুমুখীকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, নিরাপদকরণ, বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ, রপ্তানীকরণ ও সবুজায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি-সমর্থন ও বাড়তি বিনিয়োগ অপরিহার্য।

আরএমজি খাতের ওপর গুরুত্ব না কমিয়েও আইসিটিকে আমাদের প্রবৃদ্ধির নয়া চালকের আসন করে দিতে হবে। এই সংকটকালে এ খাত তার শক্তিমত্তা দেখিয়েছে। তাই সারাবিশ্বে আমরা আমাদের কম খরচের আইসিটি জ্ঞানভিত্তিক সলিউশন ছড়িয়ে দেওয়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। আইটি পার্কগুলোতে বাড়তি বিনিয়োগ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার উপযোগী জনশক্তি ও উদ্যোক্তা তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে স্টার্টআপ সমর্থক বাংলাদেশকে উদ্ভাবনের আকর্ষণীয় কেন্দ্রে পরিণত করতে চাই। স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি ও ফিনটেকের ওপর জোর দিয়ে আমরা বিশ্বকে আমাদের এই নয়া শক্তিমত্তার জানান দিতে আগ্রহী। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে সঙ্গী করেই আমরা আমাদের সরবরাহ চেইনকে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও দক্ষ করতে চাই। সে জন্য বাড়তি বিনিয়োগ ও প্রণোদনা দরকার। সে জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নয়া অংশীদারিত্ব ও কৌশলের সন্ধান অপরিহার্য।

অবকাঠামো বরাবরই প্রবৃদ্ধি-সহায়ক। রেল, শিপিং, বন্দর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দক্ষতা উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন এবং এসবের জন্য উপযুক্ত অর্থায়নের কাঠামো গড়ে তোলার জন্য সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি-অগ্রাধিকার প্রদান ও সেসবের দ্রুত বাস্তবায়ন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এই পরিকল্পনার মেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়নে নিশ্চয়ই নীতি-মনোযোগ অব্যাহত থাকবে। আশা করি এই পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হবার আগেই পরিবর্তনের এই ধারা আরও জোরদার হবে এবং আমাদের জাতির পিতার স্বপ্নের 'সোনার বাংলা' অর্জনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।
dratiur@gmail.com