অন্যদৃষ্টি

টাঙ্গাইলে অস্ত্র সমর্পণ

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২১

মো. হুমায়ুন খালিদ

২৪ জানুয়ারি, ১৯৭২। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফেরেন ১০ জানুয়ারি। তিনি তখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। রাজধানী ঢাকায় তখন তার গুরুত্বপূর্ণ কাজের কোনো শেষ ছিল না। অন্যদিকে দেশের সর্বত্র যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র ছিল, তেমনি রাজাকার ও দুর্বৃত্তদের হাতেও প্রচুর অস্ত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। সামরিক-বেসামরিক সব সেক্টরেই তখন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য সবার নিরাপত্তাই ছিল হুমকির মুখে। মুক্তিযুদ্ধকালে অন্য কোনো দেশ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোনো অস্ত্র সরবরাহ করেনি। সাধারণ বাঙালিদের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন উৎস থেকে আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম উৎস ছিল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অস্ত্র ভান্ডারের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে তাদের আধুনিক অস্ত্র নিজেদের দখলে নিয়ে আসা। এমন বীরত্বের জন্য কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধা অলিখিত খেতাবও পেয়েছিলেন। যেমন কাদেরিয়া বাহিনীর জাহাজমারার কমান্ডার মেজর হাবিব বীরবিক্রম।

বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের গণহারে আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বহন, গেরিলাসহ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ সবই ছিল সাধারণ বাঙালি সংস্কৃতিতে নতুন সংযোজন। আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে অপরিচিত বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারাই শুধু নন, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ অনেকেই অসাধারণ হয়ে ওঠেন। এ জন্যই ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবসসহ অন্যান্য জাতীয় দিবসে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি ফুটিয়ে এবং বিস্টেম্ফারক ফাটিয়ে আনন্দ-উল্লাস করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে থাকা অস্ত্র তারা নিজেরা সমর্পণ না করলে তা ফেরত আনার বিষয়টি ছিল খুব কঠিন। তখন অন্যভাবে ফিরিয়ে আনার কাঠামোগত কোনো সক্ষমতাও ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশে থাকা অস্ত্রগুলোকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধুর কাছে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তার মধ্যে একটি ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যাবর্তন, অন্যটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের হাতের অস্ত্র ফেরত নেওয়া। প্রথম চ্যালেঞ্জটি বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তনকালে পথিমধ্যে ভারতে পৌঁছেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা করে নিষ্পন্ন করে এসেছিলেন। দ্বিতীয়টি তখন ছিল বেশ জটিল ও স্পর্শকাতর। এ পরিপ্রেক্ষিতে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর পক্ষ থেকে ডাক আসে, কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে তারা বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করবেন। কাদেরিয়া বাহিনীর ডাকে হাজার হাজার যোদ্ধার কাছ থেকে অস্ত্র গ্রহণের জন্য ওই সময় বঙ্গবন্ধুর সশরীরে টাঙ্গাইলে যাওয়া কঠিন ছিল। তবুও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব বাধা পেরিয়ে নিজের দু'জন পুত্রসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি কাদেরিয়া বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য দ্বারা সৃষ্ট নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে লাখো জনতার সঙ্গে মিশে সেদিন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কাছ থেকে অস্ত্র গ্রহণ করেন।

টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী বয়েজ স্কুল মাঠে বঙ্গবীর নিজের ব্যবহূত একটি অস্ত্র বঙ্গবন্ধুর পায়ে সঁপে দিয়ে অস্ত্র জমাদানের সূচনা করেন। সেদিন কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্যরা বঙ্গবন্ধুকে অভূতপূর্ব গার্ড অব অনার প্রদান করেন এবং বঙ্গবন্ধু টাঙ্গাইলে আসার পথে বিভিন্ন পথসভায় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সব বাধা ডিঙিয়ে টাঙ্গাইলে আসার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কারণ উল্লেখ করেন। বঙ্গবন্ধু ওইদিন যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে তাদের সমর্পিত অস্ত্র গ্রহণ করেন, তেমনি বিশাল জনসভায় বক্তৃতা প্রদানসহ একটি শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বিন্দুবাসিনী স্কুলের যে মাঠে অস্ত্র সমর্পণের অনুষ্ঠান হয়, সেই মাঠেই ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই বাংলাদেশের প্রথম অর্থ সচিব সদ্য প্রয়াত খন্দকার আসাদুজ্জামান (মঞ্জু) অস্ত্র সংগ্রহ, বিতরণ এবং বিভিন্ন দায়িত্ব প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। তাই এই মাঠটি মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্র বিতরণ ও সমর্পণের স্মৃতিতে ঐতিহাসিকভাবে ভাস্বর। সবদিক বিবেচনায় ২৪ জানুয়ারি কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র সমর্পণের ঘটনা বঙ্গবন্ধুকে সম্পৃক্ত করে ঐতিহাসিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্মারক। এই প্রেক্ষাপটে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকালে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য ২৪ জানুয়ারি জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হলে শুধু মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদেরই সম্মান জানানো হবে না; একই সঙ্গে জাতির পিতাকেও অশেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে।

সাবেক সচিব ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচর্চা কেন্দ্রের উপদেষ্টা