সমকালীন প্রসঙ্গ

আমেরিকা ও আমান্ডা গোরম্যানের কবিতা 

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২১

হারুন হাবীব 

কবি আমান্ডা গোরম্যানকে আমি চিনি না, এত দূর জনপদ থেকে চিনবারও বিশেষ কারণ নেই। তবে ২২ বছরের এই কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী আমেরিকার প্রায় আড়াইশ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো প্রেসিডেন্টের অভিষেকে নিজের কবিতা পাঠ করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। যে কবিতাটি আবৃত্তি করে গোরম্যান যুক্তরাষ্ট্রের নয়া প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের জমকালো অভিষেক অনুষ্ঠানের হাজারো অভ্যাগতের দৃষ্টি কাড়েন, সে কবিতাটি তার সদ্য রচিত।

দ্য হিল উই ক্লাইম্ব 'যে পাহাড়ে উঠবো আমরা' কবিতাটি রচনার সময় গোরম্যানকে বাস্তবিকই সংকটে পড়তে হয়েছিল। আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্টের অভিষেক মঞ্চে কবিতা পড়ার আমন্ত্রণ পাওয়ার পর থেকে তিনি ভাবতে থাকেন তার শব্দমালা কীভাবে সাজাবেন। তার ইচ্ছা, তার কবিতায় একদিকে আমেরিকান সমাজের বিদ্যমান বিভক্তির চেহারা ফুটে উঠুক, অন্যদিকে সেই সংকট এড়িয়ে সম্মিলিতভাবে সামনে চলার প্রত্যয় ভাসুক। যদ্দূর জেনেছি, আমান্ডা গোরম্যান তার কবিতাটি লেখা শেষ করেন ৬ জানুয়ারি, যেদিন ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে নির্বাচনে পরাজিত এবং বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকরা বর্বরোচিত আক্রমণ চালিয়ে দেশটির ২০০ বছরের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে পদদলিত করে।

এই তরুণ কবিকে মার্কিন ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ অভিষেক কবির সম্মান দেওয়াটাও এক ব্যতিক্রম। জেনেছি, গোরম্যানের ব্যাপারে প্রথম উদ্যোগী হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন। কারণ লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসকারী এই তরুণীকে তিনি এর আগে লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে কবিতা পড়তে দেখে অবাক হয়েছিলেন। অতএব, ডাক পড়ে তার। গোরম্যানের কথা বলার কিছু সমস্যা আছে, বলতে গিয়ে হোঁচট খান। কিন্তু জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিসের অভিষেক অনুষ্ঠানটি টেলিভিশনে দেখতে গিয়ে আশ্চর্য হলাম, এই কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী তার শারীরিক সংকট কাটিয়ে দীর্ঘ কবিতাটি আবৃত্তি করে গেলেন অবলীলায় এবং পরিপূর্ণ আবেগে, যা স্পষ্টভাবে শ্রুতিগোচর হলো সবার।

২০২০ সালের করোনা মহামারিতে আমেরিকার মৃত্যু সংখ্যা ব্যাপক। লকডাউন চলছে নতুন বছরের শুরুতেও। এর পরও বহুকাল পর রাজধানী ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে নাকি সুন্দর রোদ নেমেছিল ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারির সকালে। জেনেছি, সে রোদ ক্রমেই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। এই হঠাৎ রোদের সঙ্গে কি অশুভ বিদায়ের কোনো বার্তা আছে? হতেও পারে। তবে সে রোদ ক্রমশই বেড়েছিল যখন দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে পরপর দু'বারের অভিশংসিত হওয়ার 'গৌরব' অর্জনকারী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শেষবারের মতো হোয়াইট হাউস ছেড়ে যান ফ্লোরিডার পথে। ওয়াশিংটনের এমন রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকাল নাকি খুব কম প্রেসিডেন্টের অভিষেক দিনে ঘটেছে আগে।

আমি গদ্যের মানুষ, কবিতা লেখা হয় না তেমন। তবে কবিতাকে ভালো না বেসে উপায় কই! তাই তো সেদিন রাত জেগে যখন বাইডেন-হ্যারিসের অভিষেকটি দেখছিলাম বিবিসির কল্যাণে, তখন এই কৃষ্ণাঙ্গ তরুণীর আবেগমাখা কণ্ঠ, তার কবিতার অন্তরাত্মা প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে আমাকে। ক্যাপিটল হিলের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে গোরম্যান যখন কবিতাটি পড়া শুরু করলেন, মনে হলো আরও মনোযোগ দিয়ে শুনি, শুনি একদা সাদা আমেরিকানদের ভূমিতে কালো চামড়া ও কটা চুলের এক কবির কণ্ঠ থেকে উৎসারিত ঐক্য, শান্তি ও সুবিচারের বাণী। আরও যখন শুনি, কবি বলে গেলেন কোনো এক কালো মেয়ের কাহিনি, যার জন্ম কোনো কৃষ্ণাঙ্গ দাস পরিবারে এবং বেড়ে ওঠা এক অভাগী একক মায়ের ভালোবাসায়, সে স্বপ্ন দেখে একদিন হবে সে এই জনপদের প্রেসিডেন্ট।

তার কবিতায় গোরম্যান তার স্বদেশ আমেরিকাকে সুন্দর, সুস্থ ও একত্রিত দেখতে চেয়েছেন। আলো দেখতে চেয়েছেন সব জায়গায়, সরাতে চেয়েছেন অন্ধকার। সব ক্ষতিপূরণ প্রত্যাশা করেছেন কবি, ভয়ের সমুদ্র পেরিয়ে ভালোবাসার দরজায় পা রাখতে চেয়েছেন তিনি, যা এক মঙ্গলবার্তা।

এই কবির স্বপ্নের সঙ্গে বিভেদবিরোধী শান্তিকামী সব মানুষের লালিত স্বপ্নের মিল আছে। যে আমেরিকা অর্থ-বৈভব ও মারণাস্ত্রের তাণ্ডবি পরাশক্তি হিসেবে নিজেকে জাহির করে আত্মতুষ্টি খুঁজেছিল, সেই আমেরিকা তার প্রায় আড়াইশ বছরের অভিজ্ঞতায় বিস্ময়কর সব পরিবর্তন দেখতে পেয়েছে আজ। যে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গরা দাস ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আফ্রিকার কালো মানুষদের ক্রয় করে ক্রীতদাসের খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিল, যে আমেরিকা সাদা বর্ণবাদীদের অন্যতম মূল আস্তানায় পরিণত হয়েছিল, সেই আমেরিকা নিঃসন্দেহে পাল্টেছে আজ। সময় অনেক কিছুই পাল্টে দেয়, পাল্টে দিয়েছে আমেরিকাকেও, সবটা না হলেও অনেকটা। বাকি আছে আরও।

ফলে এই আমেরিকার বুকেই সাম্য ও শান্তির বাণী নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন রেভারেন্ড মার্টিন লুথার কিং, বলতে পেরেছেন তার আজন্ম লালিত স্বপ্নের কথা, যে স্বপ্ন বহুলাংশে বাস্তব রূপ লাভ করছে, যদিও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বধারী বা বর্ণবাদীরা রণে ভঙ্গ দিয়েছে ভাববার কারণ দেখি না। এই আমেরিকাতেই এসেছেন অ্যালেন গিন্সবার্গ, জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলন, জেসি জ্যাকসন। এই আমেরিকাতেই এসেছেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, এই আমেরিকাতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিস। অতএব, মঙ্গল হবে এই যে, প্রার্থনা করি- দম্ভ ও আতঙ্কের আমেরিকা নয়, মানবিক পরাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক আমেরিকা।


২০ জানুয়ারি ক্যাপিটলের অভিষেক সে কারণেই আমেরিকার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রম। সেখানে মিশ্রণ ঘটেছিল সাদা ও কালোর, বেগুনি, কটা, ধূসর ও লালের। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এখানেই আমেরিকার সৌন্দর্য গচ্ছিত, যা এখনও পরিপূর্ণভাবে আবিস্কৃত হয়নি। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের দাপট নয়, দাপট নয় কৃষ্ণাঙ্গ বা আর কারও, দাপট থাকুক কেবল মনুষ্যত্বের। বলতেই হবে আমান্ডা গোরম্যানের কবিতাটি সে কারণেই দৃষ্টি কেড়েছে আমার।

মোটকথা, কবি একটি বিপদসংকুল পর্বতে ওঠার স্বপ্ন দেখেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবিমৃশ্যকারিতার বিপরীতে আমেরিকাবাসীকে সৌহার্দ্যের বাণী শোনাতে চেয়েছেন, যে শব্দ ও ছন্দাবলি উচ্চারণের মাঝে সাহস আছে, সুখ আছে, বাস্তবতা আছে, আছে কৃতিত্ব। এই কৃষ্ণাঙ্গ কবি গণতন্ত্রকে ভালোবেসেছেন, ধ্বংসের বিপরীতে সৃষ্টিকে ভালোবেসেছেন, পরাজয়ের বিপরীতে জয়ের বাণী শুনিয়েছেন।

না, এত অল্প বয়সে কোনো কবি, কৃষ্ণাঙ্গ তো নয়ই, আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্টের অভিষেক কবি হয়ে ওঠার সুযোগ লাভ করেননি আগে। সুখ্যাত যারা ছিলেন, তারা সবাই ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ; যেমন রবার্ট ফ্রস্ট, মায়া অ্যাঞ্জেলো, মিলার উইলিয়ামস, এলিজাবেথ আলেকজান্ডার ও রিচার্ড ব্ল্যাংকো। এরা সবাই ছিলেন নামিদামি। কিন্তু যে চ্যালেঞ্জ বুকে নিয়ে আমান্ডা গোরম্যান মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন, সে চ্যালেঞ্জ ছিল অনেক বড়। কারণ তিনি বিভক্ত আমেরিকাকে একত্রিত করার পণ করেছিলেন।

কবিতার প্রেমে ডুবেছিলেন আমান্ডা গোরম্যান খুব অল্প বয়সে, মা ছিলেন লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক। ১৬ বছর বয়সেই তার কবিখ্যাতি ছড়াতে থাকে। পরে হার্ভার্ডে সমাজবিজ্ঞান পড়ার সময় সে খ্যাতি আরও বিস্তৃত হয়। এবারের সাফল্যে তার কবিতার বই প্রকাশে আগ্রহী হয়েছে খ্যাতিমান পুস্তক প্রকাশক ভিকিংস বুকস। আরও বিস্ময়ের খবর এই যে, কবিতাটি লেখার আগে গোরম্যান বিস্তর গবেষণা করেছেন আমেরিকার সমাজের সংকট নিয়ে। বারবার পড়েছেন আব্রাহাম লিংকন ও মার্টিন লুথার কিংয়ের ভাষণ, যে ভাষণগুলো বিভক্ত-বর্ণবাদী মার্কিনিদের একত্রিত করার মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছিল, যার আবেদন এত বছর পরও কমেনি।

অভিষেকে পঠিত কৃষ্ণাঙ্গ কবির কবিতাটি ভালোবাসুক আমেরিকাবাসী, এই প্রার্থনাই করি। কারণ এই কবিতায় তার স্বদেশ আমেরিকার জন্য যেমন অকৃত্রিম ভালোবাসা আছে, তেমনি আছে মানুষের জন্য প্রেম, গণতন্ত্রের জন্য প্রেম, সেইসঙ্গে আছে উগ্রবাদের প্রতি ধিক্কার এবং পাহাড়ে ওঠার মন্ত্র। কারণ আমেরিকাকে রক্ষা করবে তার সমর সরঞ্জাম, অর্থবিত্ত বা সাদাকালোর বিভেদ নয়, আমেরিকাকে রক্ষা করবে তার মানবতাবাদী আচরণ।

সেদিন সব অর্থেই ভয়ংকর এক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে মুড়িয়ে বাইডেন-হ্যারিসের অভিষেকটি সম্পন্ন হয়েছে। যারা বিশ্ববাসীর দুয়ারে গণতন্ত্রের বাণী ছড়ায়, তাদের নিজেদের গণতন্ত্র রক্ষার জন্য এমন ঘটনা রীতিমতো লজ্জাজনক। সবকিছু দেখে মনে হয়েছে, অভিষেকটি উত্তরণ করা ছিল এক চ্যালেঞ্জ; যা ৯/১১-এর বিপদ উত্তরণের চাইতেও হয়তো বিপজ্জনক, এমনকি করোনাভাইরাসের লকডাউনের চাইতেও বেশি অবরুদ্ধ। বেদনার এই পাহাড় ডিঙিয়ে শান্তির বারতা দিতেই কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে সাম্যের গান, অধিকারের গান, যার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে আমেরিকার ৪৬তম  প্রেসিডেন্টের অভিষেক।

এই কৃষ্ণাঙ্গ কবির কবিতার শেষ ছত্রগুলো দিয়েই লেখাটা শেষ করি। বঙ্গানুবাদটি এ রকম : 'নতুন ভোর আসবে যদি আমরা তাকে মুক্ত করি, কারণ সেখানে আলো আছে অনন্ত, আমরা যদি তেমন সাহসী হই সে আলো দেখবো নিশ্চয়, এবং যদি সাহসী হই সে আলোর মধ্যে থাকার।' আমেরিকা সাহসী হোক আলো খুঁজতে।

মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক