এ সপ্তাহে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে। মিয়ানমারের নেত্রী ও স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি, সু চির বিশ্বস্ত ও মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট এবং তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি তথা এনএলডির সদস্যদের গ্রেপ্তার করে সেনা শাসক এক বছরের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রায় সব ক্যু-ই নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে 'দুর্নীতি' কিংবা 'অনিয়মের' নামে হয়ে থাকে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, যাদের দাপ্তরিক নাম তাৎমাদো-ও একই অভিযোগ এনেছে। মিয়ানমারে নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এনএলএডির ভূমিধস বিজয়, যেখানে ক্ষমতাসীন দলটি ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। তারা ২০১৫ সালের চেয়েও বেশি ভোট পেয়েছে। নির্বাচনে সু চির দল ভুয়া ভোটারের অভিযোগ এনেছে। মিয়ানমারের নির্বাচনে সংসদের ৪৭৬টির মধ্যে এনএলডি ৩৯৬ আসনে জিতেছে। আর সেনাসমর্থিত দি ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) মাত্র ৩৩টি আসন পেয়েছে। সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর আগমুহূর্তেই সেখানে সামরিক অভ্যুত্থান হলো। দেশটির শক্তিশালী কমান্ডার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাবাহিনীর সিনিয়র জেনারেল মিং অং হ্লাইং এখন দেশটির প্রেসিডেন্ট।

১৯৬২ সালের পর প্রায় অর্ধশতক সামরিক জান্তার শাসন দেখেছে দেশটি। যেখানে বার্মিজ জাতীয়তাবাদী ও থেরাভাডা বৌদ্ধদের মিলমিশের শাসনে দেশটির সংখ্যালঘুরা মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হয়। সেখানে অন্তত একশ জাতিগোষ্ঠী বাস করছে। মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী সেখানে ১৬টি সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াই করে আসছে, যাদের অনেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর অন্যরা স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন কিংবা দেশটিতে ফেডারেল সরকার চায়।

মিয়ানমারে তাৎমাদোর অভ্যুত্থানের আসল কারণ এখনও জানা না গেলেও এটা স্পষ্ট যে, দেশটির রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী প্রধান ভূমিকা পালন করতে চায়। সেখানে সেনা শাসনের সবাই যখন প্রতিবাদ করছে, তখন চীনের অবস্থান আমরা দেখছি। তবে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপে ওই অঞ্চলে চীনের স্বার্থ বাস্তবায়ন হবে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে, এ বছরের জুলাইয়ে জেনারেল মিং অং হ্লাইংয়ের অবসরে যাওয়ার কথা, কিন্তু এর পর এর চেয়ে অধিক সংস্কারমনা কেউ এলে তা তাৎমাদোর এজেন্ডা বাস্তবায়নে সমস্যা হতে পারে। অধিকন্তু মিং অং হ্লাইংয়ের জন্য বড় ঝুঁকি হলো অবসরের পর তিনি আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতাবাদী অপরাধের জন্য তার বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হতে পারে। সামরিক জান্তা শান্তির জন্য সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বসতে পারে। তবে সেখানে রোহিঙ্গারা থাকবে না, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

বস্তুত সেখানকার জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনায় তথাকথিত গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চির তালিকায়ও কখনও রোহিঙ্গারা ছিল না। অধিকন্তু রোহিঙ্গা অধিকার রক্ষার দাবি সু চির দল এনএলডি বারবারই কঠিনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এমনকি আপনি যদি দেশটিতে ভ্রমণ করেন এবং রাস্তায় সেখানকার রাজনীতিবিদ কিংবা মানুষকে রোহিঙ্গা সম্পর্কে কথা বলতে যান, তখনই বুঝবেন শব্দটি সেখানে কতটা 'ট্যাবু'। এমনকি ২০১২ সালে সেখানকার সরকার 'রোহিঙ্গা' শব্দ নিষিদ্ধ করে।

এমনকি ২০১৭ সালে পোপ ফ্রান্সিস যখন দেশটিতে সফর করেন, তখনও তিনি তার সফরে রোহিঙ্গা মুসলিম শব্দটি উচ্চারণ করেননি। রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করতে পোপকে বাংলাদেশ যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। জাতিসংঘে যখনই রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা চালানোর ওপর সমালোচনা হয়, তখন চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারকে রক্ষা করে আসছে। সু চিকে এত দিন বিশ্বে যেখানে মানবাধিকারের প্রতীক বলা হতো, সেখানে তার সরকারের সময়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা এবং তা বন্ধে নীরবতায় সু চি বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হন। এটি সত্যিই দুঃখজনক বিষয় যে, অন্য জাতিগোষ্ঠী যেমন সেখানকার মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার অগ্রাহ্য করে, সেখানকার সরকারের নীতিও ভিন্ন ছিল না।

রোহিঙ্গারা আঠারোশ শতক থেকেই রাখাইনে বসবাস করে আসছে, যা পূর্বে আরাকান নামে পরিচিত ছিল। অথচ ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি। মিয়ানমার সরকার তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে। দশকের পর দশক রোহিঙ্গা মুসলিমরা তাদের জাতিসত্তা ও ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য নির্যাতন-নিপীড়ন, বৈষম্য ও নৃশংসতার শিকার হয়। আমরা তাদের ওপর হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ ও তাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাও দেখেছি। তার ফল হিসেবে ২০১৭ সালে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা প্রাণের ভয়ে দেশত্যাগে বাধ্য হয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ওই ঘটনাকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো 'এথনিক ক্লিনজিং' বা 'জাতিগত নিধন' হিসেবে উল্লেখ করে।

আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ায় গত বছর সু চির দল এনএলডি বলেছে, বাংলাদেশের কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে যেসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, তাদের প্রত্যাবাসনে তারা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করলেও চুক্তি স্বাক্ষরে আগ্রহী ছিল না। তবে এই ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই প্রত্যাবাসন নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেনা অভ্যুত্থানে মিয়ানমারে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকও হয়। মিয়ানমারে সেনা সরকার আসার পর দেশটিতে যেভাবে পুরো প্রশাসন ঢেলে সাজানো হচ্ছে, তাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিতে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে।

একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধে নিউজ করেছি। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের এলাকাগুলোতে আমি গিয়েছি এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও আমি দেখেছি। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মানুষের সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করেছি; যারা নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ ও নানাভাবে অত্যাচারের শিকার হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলিমদের সঙ্গে যা হয়েছে, তারা যে দুর্ভোগ সয়েছে, যে মাত্রায় তাদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তা অন্যদের থেকেও ভয়ংকর। তারা দেশহীন। তারা শরণার্থী শিবিরে আছে। তারা ফেলে এসেছে নিজেদের বাড়িঘর-ঠিকানা। গণহত্যার কারণে অনেকেই তাদের আপনজন হারিয়েছে। তাদের অনেকেই ট্রমায় আতঙ্কগ্রস্ত।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সামরিক অভ্যুত্থান তাদের সবাইকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। জাতি হিসেবে তাদের রাষ্ট্রীয় পরিচিতি ও পরবর্তী প্রজন্মের ঠিকানা আরও বেশি অস্পষ্ট হয়ে গেল। সম্ভবত রোহিঙ্গাদের জন্যই সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য লেখা হবে।

কলাম লেখক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও তুরস্কের ডেইলি সাবাহর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক; ইংরেজি থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

মন্তব্য করুন