অন্যদৃষ্টি

কার কতটুকু প্রয়োজন

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

দেবাশীষ দেবনাথ

বলা হয়ে থাকে- মানুষই সৃষ্টির সেরা জীব। কেউ কেউ মানুষকে অমৃতের সন্তান বলে অভিহিত করেন। সেরা ভাবতে সমস্যা নেই। কিন্তু যখনই ভাবি, উৎকৃষ্ট কাজগুলো না হয় মানুষই করল; নিকৃষ্ট কাজগুলো করল কারা? উৎকৃষ্ট কাজগুলো যেমন অন্য কোনো গ্রহের প্রাণী এসে করে দেয়নি; তেমনি নিকৃষ্ট কৃতকর্মও অন্য কারও নয়। সবাই খারাপ কিংবা সবাই ভালো করে, তাও নয়। অনেক মানুষ অবশ্যই আছেন যারা সর্বাবস্থায় ভালো। তারা কারও খারাপ কিছু করার চিন্তা মাথায় রাখেন না। কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম, কানাডার একটি বাঙালি পরিবারের ছবি দিয়ে তার নিচে লেখা আছে- এরা চোরের পরিবার; এদের বর্জন করুন। ঘটনার সত্য-মিথ্যা জানি না। কিন্তু এই যে ছবি গণমাধ্যমে এলো, ফেসবুকে উঠল, এটা কি তারা নিজেরা কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজন দেখেননি? তারা সমাজে মুখ দেখান কীভাবে? ওই পরিবারের সদস্যরা নাকি কয়েক হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো- এত টাকা দিয়ে তারা কী করবেন?

আজকাল অনেকে বলে থাকেন, দেশের অনেক শিক্ষিতই নাকি সবচেয়ে বেশি অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কথাটা যেমন অসত্য নয়, তেমনি অত্যুক্তিও নয়। অশিক্ষিতরা দুর্নীতি করেন না, তাও বলা যাবে না। তবে এটা বলা যায়, শিক্ষিত দুর্নীতিবাজরা দেশের যত ক্ষতি করবেন, অশিক্ষিত দুর্নীতিবাজরা ততটা পারবেন না। দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিতে যদি কোনো গোষ্ঠী বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তারা সেই শিক্ষিত দুর্নীতিবাজরাই। সমাজে সাধারণত তিন শ্রেণির মানুষ রয়েছে- অশিক্ষিত, মধ্যশিক্ষিত আর উচ্চশিক্ষিত। একটি জাতিকে মানবসম্পদে পরিণত করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষা। প্রশ্ন হলো, আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে জনগণকে শিক্ষিত করে তাদের মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে পারছি কি? আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় উচ্চশিক্ষা কতটুকু প্রয়োজন, তা ভাবার প্রয়োজন আছে। সবাইকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার আদৌ প্রয়োজন আছে কি? যদি প্রয়োজন না থাকে এবং যথাযথ মূল্যায়ন করার সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারি, তাহলে গাদা গাদা শিক্ষিত বেকার তৈরির কোনো মানে আছে কি? শিক্ষা সংকোচনের কথা বলছি না; শিক্ষা সংকোচন চাইও না। কিন্তু সবার জন্য উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবতে হবে। উচ্চশিক্ষিত হবে সীমিত সংখ্যক মানুষ, যারা তাদের মেধা, প্রজ্ঞা ও অর্জিত অভিজ্ঞতা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়তা করবেন। যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হবেন, তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আগে আবশ্যিকভাবে নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং কোনোভাবেই তার নৈতিক স্খলন ঘটবে না- সে অঙ্গীকার করতে হবে।

কিন্তু যারা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন না, তারা কী করবেন? তাদের শিক্ষাবঞ্চিত করা যাবে না; রাষ্ট্র তা করতে পারে না। তাদের যোগ্যতা, মেধার ভিত্তিতে বাস্তবমুখী বিভিন্ন শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষিত করে বিভিন্ন খাতে কাজে লাগাতে হবে। এমনকি পেশাগত দক্ষতা দিয়ে তাদের বিদেশেও পাঠানো যেতে পারে। অপেশাদার একজন শ্রমিক-কর্মচারীর তুলনায় একজন দক্ষ শ্রমিক তার নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এমনকি দেশের উন্নয়নেও আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াতে পারেন। কাজেই উচ্চশিক্ষা উচ্চশিক্ষা বলে না চেঁচিয়ে বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষাদানের মাধ্যমে একটা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করা জরুরি। কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি কর্মস্পৃহা বাড়ায়; কাজের মানও বাড়ে, গতিও বাড়ে। কর্মীর কর্মদক্ষতা, তার অভিজ্ঞতা, মেধা যখন যথাযথভাবে মূল্যায়িত হবে, তখন একজন কর্মী যেমন লাভবান হবেন, রাষ্ট্রও লাভবান হবে। আমাদের দেশে কর্মীর মূল্যায়ন হয় মূলত তার বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে। বেতন-ভাতার ক্ষেত্রেও বিরাট পার্থক্য দেখা যায়। পার্থক্য অবশ্যই থাকবে, তবে তা যেন আকাশ-পাতাল না হয়, সেটাও দেখতে হবে। ব্যক্তির অর্জিত গুণাবলির যথাযথ মূল্যায়ন হতে পারে ব্যক্তিস্বাধীনতার অন্যতম প্রধান নিয়ামক। প্রতিটি মানুষের মধ্যে আত্মোপলব্ধি ঘটুক, প্রতিটি মানুষ পূর্ণতা পাক, নিজেকে সৃষ্টির সেরা জীব বলে প্রমাণ করুক। যার যতটুকু প্রয়োজন তার জন্য ততটুকুই নিশ্চিত করা দরকার।

অধ্যাপক, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ