বাঙালি জাতি যেসব কীর্তিমান সন্তানকে নিয়ে গর্ব করতে পারে, আলী আহাম্মদ চুনকা তাদের অন্যতম। সব্যসাচী ঘরানার এই মানুষটি জীবনের প্রথম দিক থেকেই ছিলেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য রাজপথের সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৫৪ সালে নারায়ণগঞ্জ শহর ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রচণ্ড মহামারি দেখা দেয়। বসন্ত রোগে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। চুনকা তার সহকর্মীদের নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান। ১৯৬৩ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ করতে কর্মীদের নিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ভিক্ষের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় বঙ্গবন্ধুর প্রশংসায় সিক্ত হন তিনি।

১৯৪৮ সালে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া আলী আহাম্মদ চুনকা বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সকল পর্বে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে এলাকার তরুণ সমাজ ও দলীয় নেতাকর্মীদের সহযোগে মুক্তিবাহিনী গঠন করেন আলী আহাম্মদ চুনকা। তার নেতৃত্বে শহরের থানার অস্ত্রাগার লুট হয় এবং এসব অস্ত্র ২৫ মার্চ থেকে পাকস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধের কাজে ব্যবহার করা হয়। স্বাধীনতার পর নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন অরাজকতা বন্ধ করতে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৩ ও ১৯৭৮ সালে দু'বার তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী ঘরানার এবং তার বিশিষ্ট বন্ধু খাজা মহিউদ্দিন ও খোকা মহিউদ্দিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে নির্বাচন করেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'তোদের মধ্যে যে জয়ী হয়ে আসবে, সেই আমার লোক'। চুনকা অনেক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। বঙ্গবন্ধু বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, 'আমি জানতাম চুনকা তুই জয়ী হবি।' চুনকা ছিলেন গণমানুষের নেতা। আওয়ামী লীগের রাজনীতির পাশাপাশি সমাজের অবহেলিত মানুষের দাবি আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি রাজ ওস্তাগার সমিতি, নরসুন্দর সমিতি, নৌকা মাঝি সমিতি, মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি, নারায়ণগঞ্জ পাট শ্রমিক সমিতি, জাহাজী শ্রমিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সামাজিক ও শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি ছিলেন। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর দলের অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু আলী আহাম্মদ চুনকা আত্মগোপন না করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে প্রকাশ্যে রাজপথে প্রতিবাদী অনুষ্ঠানমালা পরিচালনা করেন। একপর্যায়ে তাকেও জেলে যেতে হয়।

রাজনীতিতে তার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। সমাজসেবায় আনন্দ পেতেন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে তিনি নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাব, সুধীজন পাঠাগার ও নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের জায়গা বরাদ্দ দেন। শহরের জামতলা ঈদগাহ মাঠ, লাঙ্গলবন্দ স্নানাগার, নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল, সোনারগাঁ জাদুঘর, জিমখানা মাঠ, পৌর পাঠাগার, চাষাঢ়া স্টেডিয়াম তিনিই সংস্কার করেন। তারই বহু পরিশ্রমে শহরের বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে আধনিকতার ছোঁয়া লাগে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক সাবলীল ধারার ব্যক্তিত্ব আলী আহাম্মদ চুনকা। সব ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর মানুষের কাছে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। প্রায় সাড়ে চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে অনন্য এক মহীরুহে পরিণত হন। চুনকা চলমান যে কোনো ঘটনাকে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে আলাদাভাবে চিন্তা করতেন এবং সেই বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেছেন। পৌরসভার প্রথম পাঁচ বছরের সাফল্য তাকে দ্বিতীয় দফা ১৯৭৮ সালে আবার বিজয়ী করে। তিনি রাজনীতিতে একজন সফল ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে ছিলেন।

১৯৮৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পরলোকগমন করেন। আজকের এই দিনে তাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। আলী আহাম্মদ চুনকার কন্যা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী এখন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র। পিতার মতো তিনিও নিয়োজিত রয়েছেন জনগণের সেবায়।

কবি ও সাংবাদিক

মন্তব্য করুন