শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। ছাত্ররা যে কোনো দেশের ভবিষ্যৎ, শিক্ষকরা দেশ গড়ার কারিগর। শিক্ষক নামেই আছে অনেক মর্মকথা : শি-শিষ্টাচার, ক্ষ-ক্ষমাশীল, ক-কর্তব্যপরায়ণ। শিক্ষা হলো আচরণের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। শিক্ষা এমন একটা প্রক্রিয়া যেখানে শেখার সুবিধা বা জ্ঞান, দক্ষতা, মান, বিশ্বাস এবং অভ্যাস অর্জন করা যায়। পরিতাপের বিষয় ছাত্রজীবনের মূলমন্ত্র- 'ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ' এখন বিতাড়িত নীতিবাক্য। অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা আজ শুধু ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করে। যদিও শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা। পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান যাচাই করা হয়; কিন্তু বর্তমানে পড়াশোনার মাধ্যমে পরীক্ষা পদ্ধতি টেস্ট করা হয়। যেমন কতটুকু পড়া হলে এ প্লাস পাওয়া যাবে বা কী পড়লে পাস করা যাবে। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হারকে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়; কিন্তু দিতে হবে গুণগত এবং কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থাকে।

পৃথিবীতে যত সম্পর্ক আছে, এর মধ্যে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক একটু আলাদা। এর মধ্যে নিহিত থাকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, শাসন ও স্নেহ। এই সম্পর্কের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পায় উপযুক্ত শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। এই মধুর সম্পর্কে কোথায় যেন চিড় ধরেছে। কারণ ছাত্র-শিক্ষকের মাঝে আরও কয়েকটি চরিত্রের সংযোগ আছে। যেমন অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজব্যবস্থা। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে টানাপোড়েনের উৎস বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভিন্ন হতে পারে, তবে প্রাথমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত সাধারণত কোচিং কিংবা টিউশনি দিয়ে শুরু হয়। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী শুধু ক্লাসে বসে শিক্ষকের পড়া বুঝতে পারা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। কেউ দু-একটা চমকপ্রদ লেকচার ভিডিও করে দিতে পারেন, যা একবার শুনেও অনেকে মনে রাখতে পারবেন। কিন্তু একজন শিক্ষককে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্লাসে পাঠ্যক্রম শেষ করতে হয়, যেখানে উপস্থিত থাকেন অনেক শিক্ষার্থী। তাই দুর্বল ছাত্রছাত্রীদের তাদের অভিভাবক কিংবা শিক্ষকের সহযোগিতা নিতে হয়; কিন্তু যাদের বাবা-মা শিক্ষিত নন কিংবা অফিসে ব্যস্ত থাকেন তাদের ক্লাসের বাইরে শিক্ষকের সহায়তা খুব প্রয়োজন। আমার জানা মতে কোচিং-টিউশনি জাপান, চীন, মালয়েশিয়া এবং আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে প্রচলিত আছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু শিক্ষক যারা নানান উপায়ে শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে আসতে বাধ্য করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শিক্ষার্থী ভিন্ন উপায়ে গণিতের সমাধান করলে কেটে দেওয়া অথবা কোনো শিক্ষার্থী নিজ থেকে বাংলা কিংবা ইংরেজিতে রচনা বা অনুচ্ছেদ লিখলে নম্বর কম দেওয়া এবং কোচিংয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন বলে দেওয়া। অথচ শিক্ষকের বা অন্য কারও লেখা নোট মুখস্থ করে পরীক্ষায় লেখা নকলের শামিল। কোচিং নিয়ে মাঝে মাঝে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়, যার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। তবে এখনও অনেক নিবেদিত শিক্ষকও আছেন, যারা তাদের ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রাণ উজাড় করে জ্ঞানদান করছেন। শিক্ষার্থীদের নিজের মতো লিখতে দিতে হবে; অন্যথায় ভবিষ্যতে তার কাছে থেকে সৃষ্টিশীল কিছু প্রত্যাশা করা যায় না। আজকাল আমরা দেখি, শিক্ষার্থীরা বাংলা বা ইংরেজিতে এ প্লাস পায়; কিন্তু তাদের অনেকেই একটা বাক্য সঠিকভাবে লিখতে পারে না, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাসও করে না। তখন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সবার মাঝে হতাশা নেমে আসে। তবুও আমরা শিক্ষা নিতে পারি না। বিভিন্ন শ্রেণিতে ধর্মীয় এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর পড়াশোনা করে ভালো ফলাফল করে কিন্তু আমাদের অনেকের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা বলতে কিছু নেই।

কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। কারণ শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান সবাই মনে করে টিউশনি করে ওই শিক্ষক অনেক টাকা আয় করতে পারেন। তখন ওই শিক্ষক ক্লাসে ভালো না পড়িয়ে স্বভাবত লক্ষ্য থাকে কীভাবে কোচিং কিংবা টিউশনি করা যায়। তবে এও সত্যি, ছাত্রের প্রয়োজন না হলেও কিছু অভিভাবক অনেকটা প্রতিযোগিতা করে সন্তানকে কোচিং বা টিউশনিতে নিয়ে যান। শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মানী না দিলে কোনোদিনই তার কাছ থেকে সৃষ্টিশীল কিছু প্রত্যাশা করা যাবে না। বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো থাকে এবং রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর অনুপাতে শিক্ষকের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। সারাদেশে অনেক সরকারি কলেজে একাদশ, দ্বাদশ, ডিগ্রি (পাস), বিএস (অনার্স) এবং এমএ বা এমএসসি কোর্স থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি বিভাগে শিক্ষক আছেন মাত্র ৫ থেকে ১২ জন, যা খুবই অপ্রতুল। অনেক বিভাগে ক্লাস করার মতো জায়গা নেই; কিন্তু ভর্তি করা হচ্ছে অনেক বেশি। এটা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চরম অন্যায় এবং প্রহসনমূলক কাজ। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষায় টাকা ব্যয় হলে এটা খরচ নয় সবচেয়ে উত্তম বিনিয়োগ। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষাব্যবস্থাকে দেখতেন উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে।

সব পর্যায়ে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক আরও অংশগ্রহণমূলক হওয়া উচিত। অনেক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা অভিভাবকদের কথা শোনেন না। আবার অভিভাবকদের অতি আবদার রক্ষা করাও সম্ভব হয় না। তবে শিক্ষার্থীকে তার শিক্ষককে সবসময় সম্মান করতে হবে, যেমন করতে হয় নিজের বাবা-মাকে। কিছু ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেও নিজের বাবা-মা কিংবা শিক্ষকদের সম্মান করতে পারে না। এটাই যেন প্রতীয়মান হচ্ছে যে, আজকাল আমরা সার্টিফিকেটের জন্য লেখাপড়া করে থাকি। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব স্তরই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায় ব্যতিক্রম। যেখানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক বিকাশসহ জীবনের প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা একটু আলাদা। সেখানে সারাদেশ থেকে শিক্ষার্থীর অনেকে বাবা-মাকে ছেড়ে অনেকটা নতুন পরিবেশে এবং অনেকের জন্য বাংলা হতে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করতে হয়। সঙ্গে থাকে কারও থাকার সমস্যা; তাই আবাসিক হলে থাকতে হয় এবং মিশতে হয় অনেক জেলা কিংবা বিভিন্ন বিভাগের ছাত্রদের সঙ্গে। এখানে অনেকে নিয়মিত পড়ালেখা করে, আবার কেউ করে না। তাই সহপাঠী নির্বাচন করতে ভুল করলে জীবন খুব কঠিন হয়ে যায়। এখানে প্রথমবারের মতো কোচিং কিংবা প্রাইভেট টিউটর ছাড়াই পড়ালেখা করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ক্ষেত্রেই নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকে নিতে হয়। তবে ভালো ফলাফল করতে হলে নিয়মিত গ্রুপ স্টাডি করতে হবে। যদিও একটা বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা যে লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে তাদের ইচ্ছা কি পূরণ হয়? এই নিয়ে গবেষণা এবং পর্যালোচনা প্রয়োজন। তবে এটা বলতে পারি, ছাত্র-শিক্ষকের দূরত্ব আরও কমে আসা উচিত এবং প্রতিটি বিভাগে ছাত্র-শিক্ষক নিয়মিত মাসিক কিংবা ত্রৈমাসিক সভা হওয়া উচিত।

কবি কাজী কাদের নেওয়াজের লেখা 'শিক্ষকের মর্যাদা' কবিতার মতো অবস্থা আর নেই; যদিও ছাত্র-শিক্ষকের নিবিড় সম্পর্ক এবং উপযুক্ত শিক্ষাক্রম আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কার্যকরী পরিবর্তন আনতে পারে। যুগের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করা প্রয়োজন। কিন্তু ঘন ঘন শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন এবং পরিমার্জন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবক সবার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। তবে বিদ্যালয় পর্যায়ে বইয়ের সংখ্যা কমিয়ে মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক এবং প্রতিষ্ঠান সবাইকে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করে সব প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করতে হবে। শিক্ষকদের সঠিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে শিক্ষকের মর্যাদা নিজেদেরই অর্জন করতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের অধ্যয়ন হতে হবে মূল তপস্যা। তাহলে সমাজ তথা দেশ পাবে প্রকৃত শিক্ষিত, দক্ষ, পরিশ্রমী এবং নৈতিকতাসম্পন্ন জনসম্পদ। বাংলাদেশ পরিণত হবে বিশ্বে উন্নত জাতি হিসেবে।

অধ্যাপক, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
shahmiran@du.ac.bd

মন্তব্য করুন