স্বকর্মের দায়ে এবং সরকারি দমননীতির চাপে অনেকটা ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা বিএনপির। ক্ষমতাসীন থাকাকালে চরম দুর্নীতি ও একনায়কী আচরণ, তদুপরি দলের শীর্ষ নেতৃত্বে মতভেদ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও স্বার্থপরতার মতো অরাজনৈতিক ও অবাঞ্ছিত ভূমিকা বিএনপির বর্তমান অবস্থার কারণ। 'তারেক ফ্যাক্টর' এবং বিভাজক মানসিকতাও এর জন্য কম দায়ী নয়। সরকার এ সুযোগ নিয়েছে দমননীতির মাধ্যমে। সর্বোপরি জামায়াত সংশ্নিষ্টতা নিয়ে বিতর্ক বা ভিন্ন মত বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে দলের অভ্যন্তরীণ শক্তিতে ঘুণ ধরাতে, ভাঙনের আভাস তৈরি করতে।

বিএনপির এই ভঙ্গুর অবস্থা বাইরে ঢেউ তুলছে না। একদা যারা দলে জোর গলায় সোচ্চার ছিলেন, তাদের কেউ কেউ প্রয়াত, কেউ দুর্নীতির দায়ে একেবারে নীরব, নাম উল্লেখ না করলেও রাজনীতিমনস্কদের এটা বুঝতে কষ্ট হয় না। এক সময় যে তরুণগোষ্ঠী খালেদা জিয়ার 'কামান' হিসেবে পরিচিত ছিল, তাদের এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ সমর্থক একদা তরুণদের সবাই নীরব, সম্ভবত গ্রেপ্তারের আতঙ্কে। কার্যত গৃহবন্দি খালেদা জিয়া তাই এখন রাজনৈতিকভাবে শক্তিহীন এবং বয়সের ভারে ও অসুস্থতায় জীর্ণ- দলে বলিষ্ঠ ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে সংকট (অভাব)।

বিএনপির মহাসচিব বিচক্ষণতা হারিয়ে, কিয়ৎ পরিমাণ রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ ঘটালেও তারেক অনুগামিতায় সঠিক ধারা থেকে পথভ্রষ্ট এবং অনেকাংশে আপসবাদী। মওদুদ-আব্বাস দলে আছেন কিনা বুঝে ওঠা কঠিন। এ অবস্থায় দলীয় নেতৃত্বে দুর্বলতা প্রকাশই স্বাভাবিক ঘটনা, যদিও সম্প্রতি দলটির বক্তব্যে ঘুরে দাঁড়ানো ও প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহণের ভাবনা প্রকাশ পাচ্ছে।

সরকারের দমননীতি উপেক্ষা করে সক্রিয় হয়ে ওঠা, সভা-সমাবেশের আয়োজনের সিদ্ধান্তে তেমনটাই মনে হয়। বেশকিছুটা সাহস সঞ্চয় করে, রাজনৈতিক ইস্যুনির্ভর করে তারা মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনকি কোথাও কোথাও নামছেও। এমন আভাসও মিলছে যে, এবার বিএনপি দমননীতি উপেক্ষা করেই প্রতিবাদী আন্দোলনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাবে। সেখানে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ জাতীয় সমস্যা প্রাধান্য পাবে।

যেমন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : 'এক দফা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিন'। এক দফা বলতে তাদের বক্তব্য 'জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে রাজপথে নেমে সরকার পতনের আন্দোলনে শরিক হওয়া' অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে আনুষঙ্গিক ছোটোখাটো দাবি। সারাদেশে এ উপলক্ষে বিক্ষোভ অনুষ্ঠান পালিত হয়েছে। বিএনপির পক্ষে, পুলিশের দমননীতি সত্ত্বেও।

কিন্তু বিএনপির সমস্যা যেমন অভ্যন্তরীণ, তেমনি বহির্বৈশ্বিক। এক সময়কার আন্তর্জাতিক আস্থা এখন আর বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বের প্রতি নেই। নানা কারণে সে আস্থার স্থানটি দখল করে নিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নরেন্দ্র মোদির ভারত এ ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর। সেই সূত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

এসব ঘটনা বিএনপির জন্য রাজনৈতিক সংকটের বিশেষ বিশেষ রূপ; যা আসলে তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই প্রশ্ন ওঠে, বিএনপির জন্য বর্তমানে বড় রাজনৈতিক সংকট কোনখানে। এ প্রশ্নে মতভেদ যথেষ্ট। আসলে নানা মাত্রিক সংকটে ভুগছে বিএনপি। তাদের প্রশ্নবিদ্ধ পূর্বনীতি, তারেক ফ্যাক্টর, দুর্নীতি, নির্বাচনী নীতি নিয়ে এক সময়কার একতরফা জেদি অবস্থান, সর্বোপরি জঙ্গি জামায়াতসঙ্গ ইত্যাদি মিলে সংকটের প্রকাশ। এখনও তারা বিশেষ ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে সংকটমুক্ত হতে পারেনি- স্বভাবতই দুর্বলতা।

তাই এমন রাজনৈতিক শিরোনাম দৈনিক পত্রিকায় অস্বাভাবিক নয় :'সংকট থেকে বের হওয়ার পথের সংকটে বিএনপি'। অর্থাৎ সঠিক, প্রশ্নবিদ্ধহীন, জনবান্ধব নীতি তথা পথের সন্ধানই বিএনপির জন্য বড় রকমের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। জামায়াত সম্পর্কে আজ পর্যন্ত তারা নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

এ ঘটনা আওয়ামী লীগের জন্য সুবিধা সৃষ্টি করে দিয়েছে। কারণ এ কথা সত্য যে, বিভিন্ন দল সম্পর্কে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও জনসাধারণ জামায়াতবান্ধব নয়। দীর্ঘদিনের রাজনীতি বাংলাদেশে এ সত্যটি প্রমাণ করে দিয়েছে।

বিস্ময়কর যে, এ সত্যটি বিএনপি অপ্রিয় বুঝেও বোঝেনি, বা বলতে হয়, বুঝতে চায়নি। স্বভাবতই এর ফলাফল বিএনপির জন্য শুভ হয়নি। বরং এর সুফলভোগী হয়েছে আওয়ামী লীগ রাজনীতি; পরিমাণে তা যতই হোক। অন্যদিকে বিএনপি ধুঁকছে তার একাধিক সমস্যা ও সংকট নিয়ে। তবে মানতে হবে, বিএনপির সর্বনাশা গলার কাঁটা অদূরদর্শী গ্রেনেড হামলা, যার কুফল তাদের সর্বোচ্চ নেতাদের ভুগতে হচ্ছে।


দুই.

বিএনপির কোমরভাঙা অবস্থার রাজনৈতিক সুফল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আওয়ামী লীগ সরকার ভোগ করেনি; বরং নেতিবাচক প্রবাদকে সত্য প্রমাণ করেছে : অপরিমিত ক্ষমতা একক হাতে কেন্দ্রীভূত হলে সদ্ব্যবহারের সম্ভাবনা পিছু হঠে। তাই জন্ম নেয়- সম্রাট, খালেদ, সন্ত্রাসবাদী, নারী নির্যাতক তরুণ ক্যাডার বাহিনী- গুম, খুন, ছিনতাই, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিতে যারা অভ্যস্ত হয়ে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। উদাহরণ অনেক।

জন্ম নেয় দুর্নীতি, লোভ-লালসা, অনাচার, সন্ত্রাস যা জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এমনকি দেখা দেয় দলের ভেতরে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সন্ত্রাস, ভোটের রাজনীতিতে অসন্তুষ্টদের বিদ্রোহ। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন আওয়ামী লীগ দলে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী কেন্দ্রে তেমন না হলেও তৃণমূলে, প্রান্তিক স্তরে তা যথেষ্ট দৃশ্যমান- তারা সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নির্দেশ মানতেও প্রস্তুত নয়, আপন স্বার্থ বিবেচনায়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মতে এর কারণ দলে 'কাউয়ার প্রবেশ'। এটা আংশিক সত্য। দলের ত্যাগী বা অসন্তুষ্ট নেতাকর্মীদের ক্ষোভই প্রধান কারণ। তাই সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনগুলোতে শাস্তির হুমকি সত্ত্বেও বিদ্রোহ বন্ধ হচ্ছে না ব্যক্তিস্বার্থের টানে। বিব্রত দলপতিরা। সমস্যা সামাল দেওয়া সহজ হচ্ছে না তাদের পক্ষেও। নির্বাচন নিয়ে সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা নেহাত কম নয়, এমনকি মৃত্যু।

বক্তব্য শুধু আমার নয়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকদেরও। একটি সংবাদ প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট। সংক্ষিপ্ত শিরোনাম : 'দলে অস্বস্তি, সরকার বিব্রত'। কাদের মির্জার সুবচন নিয়ে উল্লিখিত শিরোনাম। গত ক'দিন যাবৎ কাদের মির্জাকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে রীতিমতো তোলপাড় চলছে; সেই সঙ্গে বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য। এক সময় জয়নাল হাজারী ছিলেন দলের শক্তি হয়েও বড় সমস্যা।

ইতোমধ্যে বিদেশে সাংসদ পাপুলের দুর্নীতি, অভিযোগ, বিচার, শাস্তি নিয়ে কম ঝড় ওঠেনি। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে তার সাংসদ পদ বাতিলের। এমন একাধিক ঘটনা আওয়ামী লীগ ও তার সরকারকে চরম বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন করে তুলেছে। সেই সঙ্গে গোদের ওপর বিষফোড়া কাদের মির্জার সুবচন। তাকে কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না।

এ উপলক্ষে পূর্বোক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে :'সাংসদদের দুর্নীতি, নির্বাচন ব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে কাদের মির্জার বক্তব্য প্রভাব ফেলেছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর।' শুধু কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নয়, তৃণমূল রাজনীতিও এর প্রভাবমুক্ত নয়। কারণ তাদের ক্ষোভ, অভাব, অভিযোগের প্রতি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বড় একটা গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।

মির্জার প্রধান অভিযোগ দলের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অন্তদ্র্বন্দ্ব-কলহ এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এসব বিষয়ে উদাসীনতা নিয়ে, যা বলাবাহুল্য দলীয় স্বাস্থ্য ও সংহতির জন্য ক্ষতিকর। তার কথার গুরুত্ব আরও এ কারণে যে, তিনি ওবায়দুল কাদেরের ভাই এবং একজন আওয়ামী লীগ নেতা এবং মেয়র। দলের এ জাতীয় ক্ষোভ-অসন্তোষ নিয়ে ইতোপূর্বে আলোচনা অনেক হয়েছে। এক কথায়, রাজনীতিতে অস্থিরতা ও নৈরাজ্য।

হয়তো এসবের প্রভাব পড়েছে আওয়ামী জোটেও। তাই অবাক হওয়ার নয়, এমন সংবাদ শিরোনামেও : 'সঙ্গ ছেড়ে সবল হতে চায় জাতীয় পার্টি'। এরশাদ আমলে দুর্নীতি মামলার ভয় জাপাকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। মাথা উঁচু করার উপায় ছিল না। এখন এরশাদ নেই, সম্ভবত সেসব ভয় নেই। তাই জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের মাথা উঁচু করে সমস্যা ও অভিযোগ তুলে ধরেছেন। দলটিকে পোষা অবস্থান থেকে মুক্ত করতে চাচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ে একমত। লক্ষ্য এককভাবে শক্তিমান হয়ে ওঠা।

সম্ভবত রওশন এরশাদ ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন, চাইতে পারেন ক্ষমতা-সংলগ্ন হয়ে থাকতে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা সরকারের 'বি-টিম' হয়ে থাকার পরিবর্তে সংগঠিত হয়ে, বিএনপির দুরবস্থায় নিজদের শক্তি বৃদ্ধি করে সবল বিরোধী দল হিসেবে সংসদে অবস্থান নিতে আগ্রহী। বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা একটি সুযোগ বলে তারা মনে করেন। তাই ভাবনা জোট ছেড়ে দলের রাজনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি-শক্তিবৃদ্ধি। আওয়ামী লীগ কি এটা চাইবে? চাক বা না চাক- ঢেউ উঠতে শুরু করেছে। বুদ্ধিমান মাত্রেই এ সুযোগ নিতে চাইবে। চাইছে জাপা। চাইতে পারে অন্য শরিক দল। আওয়ামী লীগকে এসবের মোকাবিলা করতে হবে বিচক্ষণতার সঙ্গে।

ভাষাসংগ্রামী, কবি, রবীন্দ্র গবেষক, প্রাবন্ধিক

মন্তব্য করুন