মুশতাক আহমেদের লেখালেখির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। জানতাম না তার কুমির খামার সম্পর্কেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রমূলক কথাবার্তা বলা আর গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মুশতাককে গত বছর ৬ মে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রায় ১০ মাস কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন মুশতাক। ছয়বার তার জামিন আবেদন নাকচ করা হয়েছিল। এই সময়ে তিনি দেখা করতে পারেননি তার বৃদ্ধ মা-বাবা ও স্ত্রীর সঙ্গে। অবশেষে গত মাসে কারাবন্দি অবস্থাতেই মুশতাক মৃত্যুবরণ করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বক্তব্য প্রকাশ করে মুশতাক কতটা গুরুতর অপরাধ করেছিলেন যে, তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছিল? মুশতাকের বিষাদময় মৃত্যুর পর এ প্রশ্ন তুলেই নাগরিকরা তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।

গত কয়েক দিন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টগুলোতে আমি চোখ বুলিয়েছি। দেখেছি তার বিভিন্ন পোস্টে প্রকাশিত হয়েছে প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ আর ভালোবাসা। গ্রেপ্তার হওয়ার চার দিন আগে নিজের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে মুশতাক 'করোনাকালে বুলবুলির সংসার' নামে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। বুলবুলি পাখির বাসা থেকে দুটো ছানা পড়ে যাওয়ার পর ভবনের ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে ছানা দুটো খুঁজে বের করে মই দিয়ে বাচ্চা দুটো বাসায় তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন মুশতাক। এই পোস্টটি পড়ে মন বেদনার্ত হয়েছে; কারণ বুলবুলি পাখির ছানাদের মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা যিনি করেছিলেন, প্রাণীর প্রতি গভীর মমতা থাকা এমন একজন মানুষ অকালে মারা গেলেন! তিনি যে কুমির চাষ শুরু করেছিলেন এবং চা বাগানে চায়ের গাছ লাগিয়েছিলেন; তাও স্পষ্ট করে যে, তার মন গতানুগতিক ছিল না। যারা অনুভূতিপ্রবণ এবং অপ্রথাগতভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত, সমাজের বিভিন্ন সমস্যা তাদেরই বেশি পীড়া দেয়। আর সমাজে অনিয়ম দৃশ্যমান হলে সচেতন নাগরিকরা অন্যায় ঘটার কারণগুলো অনুধাবন করে সামাজিক অন্যায়ের সমালোচনা করবেন; তাই তো প্রত্যাশিত।

মুশতাক, কিশোর আর দিদারুলের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কথাবার্তা বলা আর গুজব ছড়ানোর যে অভিযোগপত্র পুলিশ দিয়েছে, সেখানে সাক্ষী করা হয়েছে ভবন আর মার্কেটের নিরাপত্তারক্ষী, পিয়ন আর মুশতাকের একজন আত্মীয়সহ ছয়জনকে। এই সাক্ষীদের পাঁচজনই জানিয়েছেন, তারা পুলিশকে কোনো সাক্ষ্য দেননি। কয়েকজন কেবল মুশতাকের জব্দ করা জিনিসের তালিকায় সই করেছেন। সাক্ষী করা হয়েছে এমন একজন নিরাপত্তারক্ষীকে যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছেন- মুশতাক ফেসবুকে কী লিখতেন, কাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রমূলক কথা বলেছেন তা তিনি জানতেন কিনা। তখন সেই নিরাপত্তারক্ষী জবাব দিয়েছেন, 'হেরা হইল গিয়া মালিক। আমি দারোয়ান। তারা কী করে, আমি ক্যামনে জানমু?' এই নিরাপত্তারক্ষী আরও জানিয়েছেন, ফেসবুক কী, তা তিনি জানেন না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেছেন, 'মুশতাক, কিশোর, দিদারুল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। তারা বিভিন্ন অন্যায়, নির্যাতন দেখে আর সংবিধান স্বীকৃত অধিকার না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে মতপ্রকাশ করেছেন।' আন্তর্জাতিক সংগঠন আর্টিকেল ১৯-এর আঞ্চলিক প্রধান ফারুখ ফয়সাল বলেছেন, 'করোনাকালে মানুষ নানা কারণে ক্ষুুব্ধ হয়ে ভার্চুয়াল জগৎকে মতপ্রকাশের জন্য বেছে নিয়েছেন। মুশতাক, কিশোর, দিদারুল কাউকে হুমকি দেননি। তারা কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দিয়েছেন।'

যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মুশতাককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সেই আইনটির অপব্যবহার হচ্ছে এবং তা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে- এমন কথা বলছেন অনেকেই। একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, গত বছর এই আইনে দায়ের করা ১৯৭টি মামলার মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৮টি মামলা হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে সংবাদ পরিবেশন বা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগে। মামলায় বলা হয়েছে, মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে এবং ফেসবুকে দেওয়া হয়েছে মিথ্যা তথ্য। প্রশ্ন হচ্ছে- ক্ষমতাশালীদের অবমাননা হয়েছে- এমন অভিযোগেই এ আইনে মামলা বেশি হচ্ছে কেন? সরকার ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের যৌক্তিকভাবে সমালোচনা করার অধিকার একটি গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের আছে। আর অনেক সময়ই এই সমালোচনা হতে পারে ব্যঙ্গাত্মক চিত্র বা মন্তব্যের মাধ্যমে। কার্টুনের মাধ্যমে ঝাঁজালো রাজনৈতিক সমালোচনা কি আমাদের দেশে অতীতে হয়নি? পরমতসহিষ্ণুতা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক, যা অবহেলিত হলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিই বিপন্ন হয়। আর বিচক্ষণ ব্যক্তিমাত্রই বোঝেন, ক্ষমতাশালী অবস্থানে থেকে কেবল প্রশস্তি গ্রহণ করা আর যুক্তিনির্ভর সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করা কখনোই সমাজের জন্য শুভ ফল বয়ে আনে না।

অবশ্য বিখ্যাত রুশ তাত্ত্বিক মিখাইল বাকুনিন বলেছিলেন, ক্ষমতা মানুষকে অসৎ করে তোলে। তার মতে, সমাজের মাথা হয়ে যাওয়ার পর এমনকি সুশিক্ষিত এবং বিদ্বান ব্যক্তিরা ক্রমেই ক্ষমতালোভী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে উঠতে থাকেন। সমাজের অভিভাবক হিসেবে সত্যের অনুসন্ধান এবং সত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার যে দায়িত্ব, তা উপেক্ষা করে তারা নিজেদের ক্ষমতা কীভাবে সুরক্ষিত করা যায়, তা নিয়েই ভাবতে থাকেন। তাই বাকুনিন বলেছেন, ক্ষমতা আর সুবিধাপ্রাপ্তি মানুষের মন আর বুদ্ধি দুই-ই কলুষিত করে তোলে। কোনো শাসকের অনুভূতি আর যুক্তিবোধ যদি ক্ষমতা ধরে রাখার লোভের কাছে পরাজিত হয়, তখনই সেই শাসক তার কোনো ত্রুটির যৌক্তিক সমালোচনা গ্রহণ করবে না, বরং সমালোচনা তাকে ক্রুদ্ধ করে তুলবে। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত 'হীরক রাজার দেশে' (১৯৮০) চলচ্চিত্রে শাসকের এই অন্যায় ক্রোধের কথা উল্লেখ করেছেন উদয়ন পণ্ডিত (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)। পাঠশালায় নিজের ছাত্রদের তিনি বলছিলেন, 'রাজা যদি প্রজার শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তো বড় চিন্তার কথা। মানুষ বজ্রপাতকে ভয় করে। কিন্তু রাজক্রোধ তো তার থেকেও ভয়ংকর। বাজ শুধু এক জায়গায় পড়ে। এক জায়গার অনিষ্ট করে। কিন্তু রাজক্রোধ যে কতজনকে আঘাত করবে, কত লোকের সর্বনাশ করবে, তার তো কোনো ঠিক নেই।'

আমাদের দেশে এমন রাজক্রোধের নমুনা তো দেখেছি। ইংরেজ আর পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ করার ইচ্ছা এই দেশের জনগণের জন্য তৈরি করেছিল ভয়াবহ বিপর্যয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি ক্ষমতার প্রতি লোভের কারণে অন্যায়ভাবে ক্ষমতা গ্রহণের ঘটনা, যারা মানুষের অনিষ্ট করেছে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের কাছে টানার দৃষ্টান্ত। ক্ষমতালোভী শাসকের অন্যায্য আচরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে পীড়িত হয়েছে গণমানুষ। বিশ্বাস করতে চাই, বর্তমান সময়ে যে রাজনীতিবিদরা এই দেশ পরিচালনা করছেন, তাদের বিবেচনা শক্তি আছে। তারা আত্মজিজ্ঞাসা এবং নাগরিকদের করা যৌক্তিক সমালোচনার গুরুত্ব বোঝেন। অতীতে আমাদের দেশে বিভিন্ন আমলে শাসকরা ক্ষমতার যে কদর্য ব্যবহার দেখিয়েছিল, তা নিশ্চয় ভুলে যাওয়া উচিত নয়। ক্ষমতার উপভোগ্য বলয়ে থেকে অতীত মনে না রাখলে পুরোনো সময়ে রাষ্ট্রে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী যেভাবে নিপীড়ন করেছিল, সেই অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বর্তমান সময়েও। আর ক্ষমতা অন্যায্যভাবে ব্যবহারকারী সবসময়ই ধিকৃত হন- ইতিহাস সেই শিক্ষাই দেয়।

বিখ্যাত চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি বলেছেন, কোনো সরকার নিজেদের কর্মকাণ্ড বৈধতা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন পরিস্থিতিকে 'প্রকৃত সত্য' বলে বর্ণনা করতে পারে। কিন্তু তাদের দাবির পক্ষে যদি যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকে তাহলে সেই দাবি হয়ে ওঠে মিথ্যাভাষণ এবং এবং সেই অসত্য দাবি অনুযায়ী পরিচালিত কাজগুলোর কোনো ন্যায্যতা থাকে না। সমাজে অনিয়ম ঘটতে দেখলে সচেতন নাগরিকরা যদি নিশ্চুপ থাকেন তাহলে অন্যায়ই প্রশ্রয় পাবে। তাই বিদ্যমান সামাজিক আর রাজনৈতিক সমস্যার যৌক্তিক সমালোচনা করা জরুরি। আর নাগরিকদের এই স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করা হলে সমাজের কল্যাণই বিনষ্ট হবে। এমন বিভিন্ন যুক্তি চিন্তা করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বক্তব্য প্রকাশের কারণে মুশতাক আহমেদের গ্রেপ্তার, প্রায় ১০ মাস তার একটানা কারাবাস, আর কারাবন্দি অবস্থায় তার মৃত্যু বিদ্যমান ব্যবস্থার জন্য তৈরি করেছে একটি গ্লানি। আশা করব, ক্ষমতাশালীরা এই অগৌরব অনুধাবন করবেন। এই কথাও ক্ষমতাশালীদের মনে রাখা প্রয়োজন- সেই শাসকই মহৎ যিনি নীতিবোধ আর ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত সৃষ্টির মাধ্যমে শাসন করেন।
 

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা

বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন