এক বছরের বেশি সময় ধরে চলমান করোনার অতিমারিকালে 'মোস্ট ফ্রিকোয়েন্ট' ভাবনার নাম 'স্বাস্থ্যকর জীবন ব্যবস্থা'। কিন্তু আমরা যত বেশি উন্নয়নের পথে হাঁটছি, ততই বোধ হয় এই পৃথিবীর সুস্থতাকে সংকটে ফেলে দিচ্ছি; সেই সঙ্গে পুরো মানব জাতিকে। গত এক বছরে বাংলাদেশ বেশ যোগ্যতার সঙ্গে করোনা মোকাবিলা করেছে ঠিকই, তবে করোনাকালীন মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দেখা গেছে ঠিক ততটাই উদাসীনতা। প্রতিটি নদী ও জলাধার অপচনশীল মাস্ক-গ্লাভ্‌সে যেন সয়লাব। জলাবদ্ধতা তো সৃষ্টি করছেই, সেই সঙ্গে মানুষসহ প্রতিটা প্রাণের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করছে। এরই মধ্যে কত মাছ বা অণুজীবের বংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তার কোনো হিসাব নেই। এভাবেই আমাদের ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ছে। ফল হিসেবে করোনার মতো ভয়াবহ ব্যাধি পুরো বিশ্বের মাথাব্যথার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির পণ্যবাহী ট্রাক পৌঁছে যেতে দেখা যায়। চকচকে কংক্রিটের রাস্তার কল্যাণে আজ প্লাস্টিকের পেট বোতলের কোমল পানীয় কিংবা প্যাকেটজাত বিস্কুট- চিপস প্রান্তিক গ্রামগুলোতে এখন মানুষের হাতে হাতে। কিন্তু এসব পণ্যের সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্যও পৌঁছে যাচ্ছে দূর-দূরান্তের প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে। প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ বা ব্যবস্থাপনার দায়ভার না পণ্যের ভোক্তারা নিচ্ছে, না সেই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বহন করছে। আমাদের দেশে এসব কোম্পানিকে বাধ্য করতে কোনো ধরনের কার্যকর আইনও নেই। ফলস্বরূপ সুন্দরবনের শেষ প্রান্তে দুবলার চরের মতো জায়গায় কচ্ছপকে মিনারেল পানির বোতলের ভাঙা টুকরো খেয়ে মরে পড়ে থাকতে দেখি। এই অবকাঠামোভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনাকে আজ সবাই 'টেকসই উন্নয়ন' বলে সংজ্ঞায়িত করছে কিনা, তা আরেকবার খতিয়ে দেখার সময় বোধ হয় এখনই।

মুনাফা করতে গিয়ে পরিবেশ দূষণ কমানোর ব্যাপারে কে কী দায়িত্ব পালন করবে, তা রাষ্ট্রকে নির্ধারণ করতে হবে। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়িত করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। প্রত্যেক নাগরিক তখনই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে পালন করবে, যখন দেশের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা লাভ করবে। তখন সাধারণ মানুষের দাবির মুখে রাষ্ট্র একটি কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন করতে সক্ষম হবে। এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানির উৎপাদিত পণ্য থেকে সৃষ্ট বর্জ্যের কারণে নদীদূষণ হলে কোম্পানিকে শাস্তির আওতায় আনার নজির নেই। কিন্তু ভবিষ্যতে তা প্রণীত হতেই পারে। যদিও আমরা উন্নয়নশীল দেশ, আর প্লাস্টিক বা ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও তেমন কঠোর নীতি অবলম্বন করতে পারেনি। রাষ্ট্রের যথাযথ নীতির অভাব আর অপচনশীল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এ দেশের মানুষের উদাসীনতার কারণে প্রকৃতি দ্রুত ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। করোনাকালে মেডিকেল বর্জ্যের মহা অব্যবস্থাপনা সেই গতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ।

দু'মিনিট থেমে একটু ভাবলেই আমরা এই চলতে থাকা অনিয়মের কারণ নিশ্চিত উদ্ধার করতে পারব। কিন্তু সেই দু-দণ্ড দাঁড়ানোর ফুরসত কি আমাদের আছে? ইঁদুর দৌড়ের নাগরিক জীবনে প্রতেক মানুষ যেন একেকটি পাগলা ঘোড়া। প্রত্যেককে উন্নত জীবনের নেশায় পেয়েছে। আর সেই জীবন পেতে হলে আমাদের এখন অনেক অনেক অর্থ উপার্জন করতে হবে। কারণ অর্থই সব সুখ নিশ্চিত করে আমাদের দেবে সুরক্ষা। কিন্তু সত্যিই কি আমরা সুরক্ষিত? করোনায় যেভাবে গৃহবন্দি থেকেও মানুষ নিজের সুরক্ষা খুঁজে পায়নি, তেমনি এক দিন এই অর্থনীতির উচ্চ জিডিপি আমাদের সুজলা-সুফলা দেশের নদী-প্রকৃতি-প্রাণ কেড়ে নিয়ে আমাদের কী সুরক্ষা দেবে- কেউ সেটি ভাবার জন্য প্রস্তুত?

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে টিকে থাকার লড়াই করে বেঁচে থাকাই মানুষের নিয়ম; সেখানে 'টেকসই জীবন-ব্যবস্থা'র ধারণা ভাটির দেশের নিজস্ব উদ্ভাবিত জ্ঞান থেকে প্রভূত কোনো বিষয় নয়। এই জলার দেশে প্রতিনিয়ত নদীর পাড় ভাঙে-গড়ে। সেই সঙ্গে মানুষের আবাসন বদলে যায়। এখানকার মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা পুরো বিশ্বের কাছে অনন্য। এই ভূমির গঠন, নদী আর জলাভূমির সঙ্গে নিবিড় জীবনচর্চা এ দেশের মানুষকে শত প্রতিকূলতার মাঝেও টিকে থাকার অনন্য শক্তি দিয়েছে। কিন্তু এই বদ্বীপ-ভূমিতে ধীরে ধীরে নদীপথকে এক প্রকার বাদ দিয়ে শুধু সড়কপথকে প্রধানতম এবং একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

এ দেশের প্রতিটা নদীর রয়েছে বৈচিত্র্য। পানি আর পলির ভিন্নতার সঙ্গে তার জীববৈচিত্র্য আর নদীপাড়ের মানুষের জীবনও বেশ বৈচিত্র্যময়। নদীর অস্তিত্ব সংকট মানেই নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতিও আজ সংকটে। যদি নদীর সঙ্গে নায্যতার দাবি তুলতে হয়, তবে নদী আর জলাভূমির সঙ্গে মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততা ফিরিয়ে আনতে হবে। যে শহুরে জীবন আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে, তা কোনোভাবেই প্রকৃতির সম্পৃক্ততায় টেকসই জীবন-ব্যবস্থার ধারণা দেয় না। আর তাই চোখের সামনে নদী দখল কিংবা কারখানার বর্জ্যে প্রতিনিয়ত দূষিত হলেও আমরা না দেখার ভান করে মহাসড়ক দিয়ে ছুটে চলি। প্রতি বছর তাই জলাভূমির পরিমাণ কমছে আশঙ্কাজনক হারে। বর্তমানে তার মোট আয়তন এসে ঠেকেছে মাত্র ৪৫ দশমিক ৮৭ শতাংশে।

এখন কংক্রিট মানেই উন্নয়ন বলে বিশ্বাস করে সাধারণ মানুষ। তাদের দাবি, রাস্তাই একমাত্র উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে পারে। রাস্তা থাকলে সহজেই রোগীকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। অথচ সাধারণ মানুষ এই দাবিটা করে না- নদী ও হাওরের জলেও নৌ-হাসপাতাল ভাসানো সম্ভব।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি ছিল বিশ্ব সামাজিক নায্যতা দিবস। এর মূল উদ্দেশ্য বৈষম্য মিটিয়ে সমাজের প্রতিটি স্তরের মাঝে সাম্য বয়ে আনা। কিন্তু সামাজিক নায্যতা প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব, যদি আমাদের প্রকৃতি আর পরিবেশের প্রতি নায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। আমাদের এ দেশের অস্তিত্ব টিকে আছে নদনদী আর জলাভূমির সুস্থতার ওপর। নদনদীর বৈচিত্র্য রক্ষা না করা গেলে ইকোসিস্টেমের সঙ্গে নায্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিটি নদীকে অনন্য জীবন্ত সত্তা হিসেবে গণ্য করতে হবে। নদীর ওপর অযাচিত অবকাঠামো নির্মাণ না করে কীভাবে বহমান নদীর সঙ্গে জীবনধারা পরিবর্তন করা যায়, এবার সে পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। নতুবা নদীর সঙ্গে নায্যতা আসবে না। সেই সঙ্গে মানবসমাজে নায্যতা প্রতিষ্ঠা করাও দুরূহ হয়ে পড়বে। তখন শুধু দিবস পালনের মাঝেই নায্যতা খুঁজে বেড়াতে হবে। মানুষ যদি শুধু নিজেদের লোভের লাগাম টেনে ধরে; অসীম ভোগ-বিলাসের স্বপ্নে না মেতে প্রকৃতি সমন্বিত জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলে, তবেই এক দিন সমগ্র প্রাণের প্রতি নায্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

পরিবেশ গবেষক; পরিচালক, রিভারাইন পিপল

মন্তব্য করুন