আজ নিভৃতচারী প্রচারবিমুখ আপন ঐতিহ্যের শিকড়সন্ধানী লোক-ঐতিহ্য সংগ্রাহক, প্রখ্যাত লোকতত্ত্ববিদ ও লোক-ঐতিহ্য সাধক মোহাম্মদ সাইদুরের মৃত্যুবার্ষিকী। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিন্নগাঁও গ্রামে ১৯৪০ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ ছিলেন লোকগীতি গায়েন। বাবা কুতুব উদ্দিন ছিলেন গান বাঁধিয়ে। তাদের অনুসরণ করে মোহাম্মদ সাইদুরের এ অভ্যাসটা গড়ে উঠেছিল ছোটবেলা থেকেই।

সাইদুর কিশোর বয়সে লালনের নাম জানতেন। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া থেকে বাউল সম্রাট লালনের গান সংগ্রহের মাধ্যমে শুরু হয় তার পথচলা। এভাবেই শিকড়সন্ধানী সংগ্রাহক সাইদুর বেড়ে ওঠেন।

বাংলা একাডেমিতে ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপত্র নিয়ে লোকসাহিত্য সংগ্রাহক পদে যোগ দেন। সাইদুর কেবল লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ছিলেন না; বাংলা একাডেমিতে একটি সমৃদ্ধ লোকশিল্প জাদুঘর গড়ে তোলার মূলে তার সংগ্রহগুলোর অবদান উল্লেখযোগ্য। এখানে বাংলা একাডেমির ফোকলোর বিভাগের আর্কাইভস এবং লোকশিল্প জাদুঘরে তার সংশ্নিষ্ট কর্মকাণ্ডের স্পর্শ পাওয়া যায়। কলাবাড়িয়ার ওপর তার হাজার পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি অসাধারণ কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। 'জামদানী' গ্রন্থটি নিবিড় ফিল্ড ওয়ার্কভিত্তিক। এমন একটি তথ্যভিত্তিক গ্রন্থ ইংরেজিতেই অনূদিত হয়ে প্রকাশের অপেক্ষায়।

মোহাম্মদ সাইদুর ছিলেন বাংলাদেশের লোক-সংস্কৃতির প্রধানতম সংগ্রাহক ও বিশিষ্ট লোকতত্ত্ববিদ। তার সংগৃহীত লোক-ঐতিহ্যের প্রতিটি শাখায় উচ্চতর গবেষণা করা যায়। ইতিহাস সচেতনতা তাকে 'কিশোরগঞ্জের ইতিহাস' রচনা ও সম্পাদনায় উদ্যোগী করেছে। লোকসাহিত্য যেমন, তেমনি লোকশিল্প সংগ্রহেও তার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য। বাংলা একাডেমি ছাড়াও তিনি লোকশিল্প সংগ্রহে সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে এক উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সাহচর্যে থেকে নকশিকাঁথার এক বিশাল ভান্ডার গড়ে তোলেন। পটুয়া শিল্পী কামরুল হাসানও ছিলেন তার গুণগ্রাহী। বাংলা একাডেমির আর্কাইভসে মোহাম্মদ সাইদুর তার একক চেষ্টায় 'মৈমনসিংহ গীতিকা' সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তার একক লোকশিল্প সংগ্রহের প্রদর্শনী হয়।

১৯৮৮ সালে লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল আর্ট গ্যালারিতে ওপেন এয়ার প্রদর্শনীতে তার নিজস্ব লোকশিল্পের প্রদর্শনী হয়েছে। ১৯৮৯ সালে বাংলা একাডেমিতে যৌথভাবে 'নকশিকাঁথার প্রদর্শনী' করেছে। এ সময় তার কয়েকটি লোকশিল্পের বিষয়ভিত্তিক ইংরেজি প্রবন্ধ সচিত্র প্রদর্শিত হয়। লোক-ঐতিহ্য সংগ্রহে দেশের ৬৮ হাজার গ্রামের প্রায় ৬০ হাজারের বেশি গ্রামে তার পদচারণা ঘটেছে। তিনি

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছেন জাপান, ভারত, সিঙ্গাপুর, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে। এসব দেশে তিনি খুঁজেছেন লোকসংস্কৃতির শিকড়। লোকশিল্পের ১২ হাজারেরও বেশি নির্দশন তিনি সংগ্রহ করেছেন। তার নকশিকাঁথার সংগ্রহ বিশ্বে বিরল। ছোট-বড় মিলিয়ে এ নকশিকাঁথার সংখ্যা ৩০৩। তার রচনায় মৌলিক বিষয় ও ফিল্ডওয়ার্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেমন- শিয়ালের কিস্‌সা, জামদানি, বেড়া ভাসান উৎসব, মহররম অনুষ্ঠান, লোকনাট্য, আনুষ্ঠানিক লোকসংগীত, পালা গান ইত্যাদি।

তার সাধনার ফলস্বরূপ তিনি দেশ ও বিদেশে সংবর্ধিত ও পুরস্কৃত হয়েছেন। তার কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ এবং ২০০২ সালে কারুশিল্পী পরিষদের সম্মাননা লোক ও কারুশিল্পী, লোকসংগীত শিল্পীদের তথ্য প্রদানকারী উৎস হিসেবে তার নামটি সর্বাগ্রে আসে।

'মোমেনশাহী গীতিকার পালাগানগুলো'র সংগ্রাহক ছিলেন মোহাম্মদ সাইদুর। সেখান থেকে 'মাধব মালঞ্চী কইন্যা' শীর্ষক পালাগানটি নাট্যরূপ দিয়ে কলকাতার অন্য থিয়েটারের কর্ণধার বিভাস চক্রবর্তী 'শিশির মঞ্চ' থেকে মঞ্চস্থ করান। এর শতরজনী মঞ্চ উপলক্ষে কলকাতায় মোহাম্মদ সাইদুরকে 'মাধব মালঞ্চী কইন্যা'র সংগ্রাহক হিসেবে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। জাপানের ফুকুওয়াকা এশিয়ান আর্ট গ্যালারি থেকে ২০০১ সালে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। ১৯৮৮ সালে আরণ্যক নাট্যগোষ্ঠী লোক নাটক সংগ্রহের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মাননা প্রদান করে। দেশে-বিদেশে মোট ১৭টি সম্মাননা পান তিনি। মোহাম্মদ সাইদুর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং শিল্পাচার্যের সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করেছেন। শিল্পাচার্যের কাঁথা সংগ্রহ সাইদুরের মাধ্যমেই। পটুয়া কামরুল হাসানও ছিলেন সাইদুরের খুব কাছের এবং প্রিয় ব্যক্তিত্ব। শিল্পী এসএম সুলতানের সঙ্গেও ছিল তার গভীর সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফোকলোরবিদ ডক্টর হেনরি গাসির তার গ্রামের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত লোকশিল্প জাদুঘরটি উদ্বোধন করেছিলেন। তবে এর সফল বাস্তবায়ন এখনও হয়নি।

 সাংবাদিক
dulu1963@gmail.com

মন্তব্য করুন