প্রতিদিন বিপর্যয়ের নতুন রেকর্ড আমাদের মন ভেঙে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা দেয়ালে রায়হানের অসহায় অর্তনাদের ছবি দেখে কে-ই বা নিজেকে ধরে রাখতে পারে! রাজধানীর পাঁচ হাসপাতাল ঘুরেও পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাননি রায়হানের মা। অবশেষে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান! গত বছর করোনা সংক্রমণের পর থেকেই এমন অসহায় দৃশ্য আমরা দেখে আসছি। এবারের পরিস্থিতি যে আরও নাজুক; এক সপ্তাহের চিত্রেই তা স্পষ্ট। মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ৬৬ জনের মৃত্যু ও ৭ হাজার ২১৩ জনের সংক্রমণের খবরের হিসাব মেলাতে যখন সবাই ব্যস্ত; পরদিন বুধবারই সেই হিসাব ভেঙে আমরা দেখেছি, নতুন করে করোনাভাইরাস শনাক্ত ৭ হাজার ৬২৬ জন। করোনাকালে বাংলাদেশে এটাই এক দিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত। এভাবে পরিসংখ্যান আমাদের কতদূর নিয়ে যাবে, জানি না।

আমরা ভাবছিলাম, করোনা জয় করে আমরা বুঝি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছি। সবার টিকা নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিগগিরই বাংলাদেশ বুঝি করোনামুক্ত হয়ে যাবে। বছরব্যাপী বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার তারিখও ঘোষিত হয়েছিল। কিন্তু মাসখানেক ধরেই আমরা দৃশ্যপট পাল্টে যেতে দেখলাম। করোনা সংক্রমণের উল্লম্ম্ফন। হঠাৎ সংক্রমণ আর মৃত্যুহার বাড়তে থাকে। এমনকি তা গত বছরের রেকর্ডও ভেঙে দেয়। নতুন রেকর্ড হয়, পুরাতনটা ভাঙে। সপ্তাহখানেক ধরে এই ভাঙা-গড়ার খেলাই চলছে। আর তার পেছনে ঘটে চলেছে কত মানবিক-অমানবিক গল্প! কোনো গল্প সংবাদমাধ্যমে আসে; ইন্টারনেটের কল্যাণে ভাইরাল হয়; আর কোনো গল্প চোখের আড়ালেই থেকে যায়।

করোনাভাইরাসের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ 'স্বাস্থ্য'। অথচ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেমন হযবরল, স্বাস্থ্যবিধিও তথৈবচ। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা নাজুক; এ ভাইরাসের সংক্রমণ না হলে মনে হয় তা এতটা স্পষ্ট হতো না। একদিকে আইসিউ শয্যা নেই, অন্যদিকে হাসপাতালে আসন সংকট; যথাযথ সেবা ও দক্ষ চিকিৎসকের অভাব; অব্যবস্থাপনা-অনিয়ম ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত স্বাস্থ্য বিভাগ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সরকারের বিশেষ কমিটি থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য কতটা আমলে নেওয়া হচ্ছে- এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার অপর্যাপ্ততায় ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের কথা অনেকেই বলেছেন। অবস্থার নাজুকতায় সরকার অবশেষে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ফিল্ড হাসপাতাল অবশ্যই জায়গামতো হওয়া দরকার। গত বছর সংক্রমণের সময় সরকার মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে ফিল্ড হাসপাতাল করলেও তেমন কাজে আসেনি। কারণ সেই অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র শহরের অধিকাংশ আবাসিক এলাকা থেকে অনেক দূরে ছিল।

করোনাভাইরাস আমাদের জাতীয় কোনো বিষয় নয়; বৈশ্বিক এ দুর্যোগ অন্যরা কীভাবে মোকাবিলা করছে, তা যেমন দেখতে হবে; একই সঙ্গে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে গত বছরের ভুল থেকেও আমাদের শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ বছর সংক্রমণের যে বর্ধিত হার দেখা যাচ্ছে, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সামান্যই। সোমবার থেকে লকডাউনের নামে দেওয়া 'বিধিনিষেধে' সবই চলছে প্রায় স্বাভাবিক। বুধবার থেকে নগরে চলছে গণপরিবহন। তাহলে আন্দোলনে থাকা ওই ব্যবসায়ীদের কী দোষ? যখন আরও খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে, তখন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান ঢিলেঢালা বিধিনিষেধের পরিণতির কথা আমরা ভাবতে পারি না। রায়হানের অসহায় আর্তনাদের হতাশা আমাদের মস্তিস্কে যেন জেঁকে বসে। ব্রাজিলে এক দিনে চার হাজার মানুষের মৃত্যু আমাদের মন খারাপ করে দেয়। ভারতে এক দিনে লক্ষাধিক আক্রান্ত ও ছয় শতাধিক মৃত্যু আমাদের হতাশা আরও বৃদ্ধি করে। আমরা এখনও সচেতন নই। স্বাস্থ্যবিধি মানতে আমাদের অনেকেরই এত অনীহা; মাস্ক পরতে পরতে যেন আমরা ক্লান্ত! যেখানে জীবন বাঁচানোই সংশয়, সেখানে এখনও আমরা নির্বিকার! ঢিলেঢালা লকডাউন আর আমাদের অবহেলার মাশুল কতটা ভারী হতে পারে, আমরা জানি না। রেকর্ড ভাঙা-গড়ার ভয়ানক খেলার অংশ যখন আমরা, সচেতন আমাদেরই হতে হবে। প্রশাসন কঠোর হোক, সমস্যাগ্রস্ত মানুষের পাশে আপনাদের পাশাপাশি হৃদয়বান মানুষও থাকবে নিশ্চয়ই।

সাংবাদিক ও গবেষক
mahfuz.manik@gmail.com

মন্তব্য করুন