করোনাকালের একাকিত্ব আমাদের সৃজনশীল হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। প্রত্যেক মানুষ সুন্দরভাবে সময়কে উপভোগ করার পদ্ধতি অন্বেষণ করে চলছে। শিল্পী-সাহিত্যিকরা ঘরে বসে দর্শক-শ্রোতাকে বিনোদনের খোরাক দিচ্ছেন। করোনা আমাদের শিল্পীসত্তাকে জাগিয়ে তুলেছে। আমার মনে হয়, প্রযুক্তির কল্যাণে করোনাকালে আমাদের সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে, সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। অন্তর্জালে এত আয়োজন, সমারোহ, বিনোদনের আয়োজনে দুঃসময়ে দুশ্চিন্তার সুযোগ কোথায়!

এরপরও অবচেতন মনে সব সময়ই আতঙ্ক; কখন দুঃসংবাদ আসে। বিশেষ করে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার পর মধ্য মার্চ থেকে পরিস্থিতি এক ভয়াল রূপ নিচ্ছে। নতুন ধরনের অণুজীব দক্ষিণ আফ্রিকান ভেরিয়েন্টের প্রাদুর্ভাবের ফলে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। আগের ভাইরাসের চেয়েও বহুগুণ শক্তি নিয়ে নতুন এই ঘাতক ক্ষিপ্রতার সঙ্গে মানুষের ফুসফুস আক্রান্ত করে মৃত্যু ঘটাচ্ছে। সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। উপচে পড়া রোগীর ভিড়ে হাসপাতালগুলোর অবস্থা বেসামাল। এ পরিপ্রেক্ষিতে গৃহবন্দি জীবনের আনন্দঘন পরিবেশে বিষাদের ছায়া পড়ছে ক্ষণে ক্ষণে। উৎকৃষ্ট উপায়ে জীবন কাটানোর উদ্যম প্রতিনিয়ত প্রাণঘাতী ভাইরাসের বিষাক্ত ছোবলে হোঁচট খাচ্ছে।

এই গেল মুদ্রার এক পিঠের জীবনালেখ্য। এ পাশে আছে জীবিকার নিশ্চয়তা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি হাতের নাগালে। ঘরে থেকেও জীবনাচারের পরিবর্তনে ও প্রযুক্তির বহুমাত্রিক ব্যবহার করে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার সুযোগ। কিন্তু উপেক্ষিত রয়ে গেল আরেক পাশের কথা, যেখানে আছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আছে করোনাকালে কর্ম হারানো নিম্নবিত্ত শ্রেণি থেকে হতদরিদ্র শ্রেণির মানুষ, যাদের এক দিনের রোজগার বন্ধ হলে সংসারে চুলা জ্বলে না। জীবিকার তাগিদে জীবন তাদের কাছে তুচ্ছ। এ পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য অতিমারিকালে ঘরে থেকে জীবনাচরণের উৎকৃষ্ট উপায় উদ্ভাবন এক অবান্তর ভাবনা।

করোনার নতুন জোয়ারে মৃতের সংখ্যাধিক্য, সংক্রমণের উল্লম্ম্ফন এবং উপচেপড়া রোগীর চিকিৎসার সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের জীবন রক্ষাই সরকারের কাছে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদে সরকারের কাছে মহামারির প্রকোপ কমানোর জন্য লকডাউন জারি করা ছাড়া বিকল্প উপায় নেই। এ কথা বলা বাহুল্য, লকডাউনের ফলে আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হওয়ায় দেশের স্বল্প আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে পড়েছে। এ অবস্থায় সামগ্রিকভাবে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে দুঃসময়কে সুসময়ে রূপান্তরের চিন্তা দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর পক্ষে অলিক কল্পনারই নামান্তর। এ অবস্থায় দেশের বিত্তহীন ও কর্মহীন মানুষকে আর্থিক সহায়তা দিতে সরকারের সঙ্গে যদি এনজিও, বহুজাতিক কোম্পানি, বিত্তশালী শ্রেণি একযোগে শামিল হয়, সে ক্ষেত্রে হয়তো সার্বিকভাবে দুঃসময়কে সুসময়ে রূপান্তর করা যেতে পারে।

অবশ্য পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সকল আন্দোলন-সংগ্রামে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেই স্বাধিকার বা অস্তিত্বের লড়াইয়ে নাবিকের মতো হাল ধরতে হয়েছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বেই বিজয় অর্জিত হয়েছে। যে ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, তার অধিকাংশই ছিল কৃষক, শ্রমিক নিম্নবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্তি। এ পরিপ্রেক্ষিতে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে শতাব্দীর এই ভয়াবহ দুর্যোগকালে ভীত না হয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে কভিড-১৯ অতিমারি মোকাবিলা করব। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে এ অঞ্চলের মানুষ বহু অতিমারির মোকাবিলা করেছে, কিন্তু এতে তাদের সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়নি। এবারও কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় জোয়ারে করোনাভাইরাস দ্রুত পরিবর্তনশীল রূপে বহুগুণ শক্তি বৃদ্ধি করে মরণযজ্ঞে মেতে উঠেছে। কিন্তু কালের বিবর্তনে আমাদের সংস্কৃতির শিকড় এত গভীরে প্রোথিত যে, এর সহজাত শক্তি ও সতত সৃজনশীল বহুমাত্রিক রূপ করোনার প্রাণঘাতী শক্তি ও রূপের ছলনাকে প্রতিহত করে প্রবহমান সংস্কৃতির ধারাকে আরও বিকশিত করবে।

মন্তব্য করুন