মহাজগতের তুলনায় আমাদের গ্রহের অবস্থান অতি নগণ্য। তেমনি নগণ্য একটি জাতির ৫০ বছরের ইতিহাস। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা ছিল এক অনন্য ও বিশেষ ধরনের, যা অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আমাদের স্বাধীনতা এসেছে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। অনেক সম্ভাবনা ও আশা নিয়ে। আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস স্বাধীনতার জন্য চরম ত্যাগ ও তিতিক্ষার গৌরবদীপ্ত কাহিনি। স্বাধীনতাই যে বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য, সেটা জাতির পিতা ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে জানিয়ে দিয়েছিলেন।

২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে শুরু হয় ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গণহত্যা অভিযান। বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা ঘোষণার অর্থ যুদ্ধ ঘোষণা। পরবর্তী পদক্ষেপ হলো ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠা।

এদিকে একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের রাজনৈতিক ভূদৃশ্যে পরিবর্তন দেখা দেয়। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ। ইন্দিরা গান্ধী তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন। অনেকের মতে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তার এই বিজয়ে পরোক্ষভাবে মদদ জোগায়। তিনি দেখলেন লাখ লাখ ভুখানাঙ্গা মানুষ আত্মরক্ষার জন্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছে। চৌকস জেনারেল মানিকশর সঙ্গে পরামর্শ করলেন। সেনাপ্রধান বললেন, বর্ষাকালে বাংলাদেশে অভিযান পরিচালনা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া চীনও নেমে আসতে পারে। তাই তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেন না। তিনি বিশ্বকে ভারতের সমস্যা বোঝানোর জন্য বিদেশ ভ্রমণে বের হলেন। প্রথমে গেলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রেসিডেন্ট নিক্সন আগে থেকেই ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি বিমুখ ছিলেন। তাছাড়া সে সময় যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থনের নীতি গ্রহণ করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। বিট কবিদের নেতা অ্যালেন গিনসবার্গ বাংলাদেশের মানবিক ট্র্যাজেডিকে নিয়ে লেখেন অমর কবিতা- 'সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড।'

যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী মনোভাব বুঝতে পেরে ইন্দিরা তার জবাব দিলেন ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি সম্পাদন করে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া সৈন্য ও মুক্তিবাহিনীকে ভারত অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিল। তারা অস্ত্র জোগান দিল। শুরু হলো গেরিলা যুদ্ধ। রাইফেল কাঁধে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো বাংলাদেশের দামাল তরুণরা একটি নতুন দেশের জন্ম সম্ভব করে তুলল। চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর অকেজো করে দেওয়া হলো। ইন্দিরা গান্ধীর হাতে সময় ছিল অল্প। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। ইন্দিরা গান্ধী এলেন কলকাতায়। লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের সমাবেশে যোগদানের সময় সংবাদ পেলেন পাকিস্তান ভারতের পাঁচটি বিমানবন্দরে আক্রমণ করেছে। একজন উপদেষ্টা বললেন, ইয়াহিয়া খানের মতো নির্বোধ লোকটি যে এমন কাজ করবে, তিনি তা আগেই অনুমান করেছিলেন।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, ডিসেম্বর ৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে আনীত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের ওপর সোভিয়েত ইউনিয়ন ৭ বার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে। মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে দ্রুত অগ্রসর হলো। মার্কিন সপ্তম নৌবহর আসার আগেই ১৬ ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিয়াজি মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

বাংলাদেশের শোষণমুক্তি ও শাসনমুক্তির জন্য যেটা করতে হলো, তার অন্য নাম মুক্তিযুদ্ধ। ২৬ মার্চ যার আরম্ভ, ১৬ ডিসেম্বর তার সমাপ্তি। যুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিত। কিন্তু তার প্রেরণা ছিল সব সময়ের শক্তি। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে তিনি মানুষের কাছে আত্মত্যাগ দাবি করলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হাত দিলেন। অল্প সময়ে অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করলেন। অসামান্য সংবিধান উপহার দিলেন। সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করলেন। সারাজীবন তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের চেষ্টায় ক্ষয় করেছেন। কিন্তু যে স্বাধীনতার জন্য তিনি সারাদেশকে মাতিয়ে তুলেছিলেন তার প্রথম সম্ভাবনাতেই হিংসা, ষড়যন্ত্র উঠল উদ্বেল হয়ে। সপরিবারে তিনি শাহাদাতবরণ করেন।

বাংলাদেশ আজ মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছে। আমাদের জাতীয় জীবনে এমন ঐতিহাসিক দুর্লভ মুহূর্ত কমই আসে। ইতিহাসে লাভ ও ক্ষতির বিচার কঠিন একটি কাজ। তার জন্য দীর্ঘকালের প্রেক্ষিত প্রয়োজন। প্রথমেই বলতে গেলে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর বহু বর্ণিল রাজনৈতিক নেতৃত্বে, ইতিহাসের অতি কষ্টকর এক পথ বেয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। বাংলাদেশের মৌলিক আদর্শগুলো, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এখন ঝলমলে পতাকার মতো উড্ডীন আছে। দেশের শতভাগ ছেলেমেয়ে এখন স্টু্কলে যায়। বিদ্যুৎ এখন প্রায় সবার ঘরে পৌঁছেছে। দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশে নেমে এসেছে। অভ্যন্তরীণ জাতীয় উৎপাদন ৮ শতাংশের চেয়েও বেশি। মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৬৪ ডলার। মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২ দশমিক ৬ বছর। উন্নয়নের সব সূচকেই বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে প্রশংসা পাচ্ছে। বাংলাদেশ দারিদ্র্যকে জয় করেছে। আমরা এখন হতদরিদ্র দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আমার সোনার বাংলা' কবিতার প্রথম দশটি চরণকে। এই সোনার বাংলা ছিল বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন। এই সেই সোনার বাংলা, যার আকাশ-বাতাস চিরদিন আমাদের মনে বাঁশি বাজায়। এই বাংলা মায়ের বদন যেন কোনোদিন মলিন না হয়, সে কথা যেন আমরা মনে রাখি।

সাবেক সচিব

মন্তব্য করুন