সম্প্রতি হিমছড়ির ভেসে আসা মৃত তিমির ঘটনা সাপেক্ষে নানা আলোচনা উঠে এসেছে। ৯ ও ১০ এপ্রিল ভেসে আসা মৃত তিমি দুটি আলোড়ন তুলেছে বিশাল কাঠামোর কারণে। এদেশের সমুদ্রসৈকতে তিমি ভেসে আসা খুব দুর্লভ ঘটনা নয়। ১৯৯১ সালে উখিয়ার ইনানী সৈকতে ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে হিমছড়ি সৈকতে এভাবে ভেসে এসেছিল বিশালাকার তিমি। যদিও তিমিদের ব্যাপারে সমুদ্র প্রাণ বিশেষজ্ঞ বা 'মেরিন লাইফ এক্সপার্টদের' অংশগ্রহণ খুব কম দেখেছি অথবা সেই ধরনের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি অথবা তিমির মতো একটা প্রাণী সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এক ধরনের অপারগতা লক্ষ্য করা যায়।

কক্সবাজার থেকে টেকনাফের দিকে চলে যাওয়া মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে অবস্থিত হিমছড়ি সৈকত। এক পাশে খাড়া উঁচু পাহাড়, আরেক পাশে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। এই সৈকতটা একটু নির্জন, কেমন যেন প্রাচীন পৃথিবীর অনুভূতি ঘিরে ধরে। এখানেই পর পর দু'দিন ভেসে ওঠা বিশালাকৃতির মৃত তিমি দুটি প্রথম দেখতে পায় স্থানীয় বাসিন্দারা। সাগরের পানিতে ভাসতে ভাসতে তিমিটির সামনের অংশ পচে বিকৃত হয়ে গেছে। সর্বশেষ হিসাব থেকে জানা যায়, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের দুটো তিমিরই ওজন আনুমানিক ১০ টন করে। সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের হিসাব-নিকাশ থেকে জানা যায়, এই তিমির বয়স আনুমানিক ২৫ বছর। দ্বিতীয়টি লম্বায় ৪৬ ফুট ও প্রস্থে ১৮ ফুট। প্রথমটি একই সৈকতে ভেসে আসা তিমিটি লম্বায় ছিল ৪৪ ফুট ও প্রস্থে ১৬ ফুট। তার মানে প্রায় কাছাকাছি আকৃতির তিমি এ অঞ্চলে ভেসে আসে। দুটিই সৈকতের বালুচরে পুঁতে ফেলা হয়েছে। তিমির হাড়গোড় বা অস্থি-কঙ্কাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত থাকলেও তিমি থেকে সংগৃহীত নমুনার গবেষণার ব্যাপারে কিছু জানা যায়নি।

উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালের এই সময়ে শহরের লাবণী পয়েন্ট সৈকতে ভেসে এসেছিল একটি মরা নীল তিমি; যেটি আকারে প্রায় ৬৫ ফুট ছিল; সেই তিমির কঙ্কাল সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ভেসে আসা নীল তিমির কঙ্কাল শিক্ষা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করা উচিত বলে অনেক পরিবশেবাদী মনে করেন। সাগরে লক্ষ প্রজাতির প্রাণীর বিচরণ; মাঝেমধ্যে কিছু কিছু প্রাণী মারা যাওয়াটা স্বাভাবিক মনে করলেও জেলা প্রশাসন, স্থানীয় পুলিশ, বন বিভাগ, মৎস্য অধিদপ্তরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্নিষ্টরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, কোন কারণে মারা গেছে সেটি ময়নাতদন্তের আগে বলা যাবে না।

এ প্রজাতির তিমি আমাদের বঙ্গোপসাগরে রয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এসব তিমি চোখে পড়ে। এক সামুদ্রিক প্রাণ বিশেষজ্ঞ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের জলসীমায় এত বিশালাকার তিমির সচরাচর দেখা মেলে না; গভীর সাগরে বড় জাহাজের ধাক্কায় অথবা শিকারিদের হত্যার কারণে তিমিটির মৃত্যু হতে পারে। অবশ্য পরিবেশবাদীদের ধারণা, বাংলাদেশের জলসীমার বাইরে তিমিটি মারা যেতে পারে; গভীর সাগরে মাছ ধরার জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগেও তিমিটি মারা যেতে পারে। পেটে আঘাতের চিহ্নও রয়েছে। কেউ বলেছেন এটি নীল তিমি, কেউ বলেছেন ব্রাইডস তিমি। তবে একজন বলেছেন, হিমছড়ি সৈকতে ভেসে আসা তিমিটি হ্যাম্পবাক তিমি অর্থাৎ কুঁজো তিমি। এটি মহাসাগরীয় প্রাণী। তার থেকে আরও জানা যায়, এ জাতীয় তিমি দলছুট হয়ে পড়লে মান-অভিমান বা হতাশায় অনেক সময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তিমিটি বেশ ক'দিন আগে প্রাণ হারিয়ে বঙ্গোপসাগরে ভেসে শেষ পর্যন্ত কক্সবাজার হিমছড়ির সেই প্রাচীন সৈকতের বালুচরে জোয়ারের পানিতে উঠে পড়ে।

আজকে পৃথিবীতে সহনশীলতা-নমনীয়তার প্রচণ্ড অভাব, রয়েছে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলার অজ্ঞতা। তিমিদের সঙ্গে সহনশীল অভিজ্ঞতাই আমাদের শেখাতে পারে শুধু দু'জাতির মানুষ নয়, প্রজাতি নয়, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা গোত্রের বুদ্ধিমান প্রাণীও এক সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে।

আমরা জানি না, তিমিগুলো কী কারণে মারা গেছে পরিবেশ দূষণে, মানুষের শিকারে, জাহাজের আঘাতে? তবে প্রতিটি প্রাণীই ইকোলজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু মানুষের জন্য নয়, তিমি ও অন্যান্য প্রাণের সঙ্গে মানবিক আচরণ জরুরি। করোনাকালীন, ঘনীভূত বিপর্যয়ে এই বাস্তবতাই যেন উঠে এসেছে।

বিজ্ঞান বক্তা

মন্তব্য করুন