সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'ভাইরাল' হয়েছে একজন চিকিৎসক, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের বাগ্‌বিতণ্ডা। নানা অভিযোগের মধ্যে যিনি চিকিৎসক, তার অভিযোগ; তার সঙ্গে যেই আচরণ করা হয়েছে- সেই একই আচরণ তার সমপর্যায়ের পুলিশ বা প্রশাসনের ক্যাডারের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে এই পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট করতে পারত কিনা? অর্থাৎ, গাড়ি চলাচলের পাস দেখানোর পরও ইউনিফর্ম পরিহিত কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয়পত্র সেই পুলিশ সদস্য বা ম্যাজিস্ট্রেট দেখতে চাইতেন কিনা?

আমরা সচরাচর যা দেখি তাতে মনে হয়, তারা এমন পর্যায়ের পুলিশ বা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তার পরিচয়পত্র দেখা তো দূরের কথা, গাড়ি থামানোর পর হয়তো কয়েকবার দুঃখ প্রকাশ করতেন। রাস্তার এই ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং আন্তঃক্যাডারদের সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতার বৈষম্যের মূল ঘটনার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আমার হাতে ক্ষমতা রয়েছে এবং চাইলে আমার থেকে রাষ্ট্রের উঁচু পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তাকেও হেনস্তা করতে পারি- সেই মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। যতদিন আন্তঃক্যাডারদের সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতার বৈষম্যের অবসান না হবে, ততদিন এই সমস্যা বাড়তেই থাকবে এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হতেই থাকবে। কেননা, সবাই পুলিশ বা প্রশাসন ক্যাডারেই যেতে চাইবে। বিশেষায়িত লেখাপড়া শেষে বিশেষায়িত পেশায় কেউ ইচ্ছাকৃত যাবে না।

সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শেষে পুলিশ, প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারের প্রতি ঝুঁকছেন; বিশেষ করে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা। গত কয়েকটি বিসিএসে আমরা লক্ষ্য করেছি, এসব শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে পুলিশ, প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এই তিনটি ক্যাডারের পুরোটাই দখল করে নেবে। কেননা, আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানের প্রথম সারির বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই চিকিৎসা বা প্রকৌশল বিষয়ে লেখাপড়ার চেষ্টা করেন এবং যারা ব্যর্থ হন তারা সরকারি যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের কোনো একটি বিষয়ে না হলে মানবিক বা ব্যবসায় শাখার যে কোনো একটি বিষয়ে লেখাপড়া করেন।

সুতরাং এখানে স্বীকার করে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা থাকা উচিত নয়, যেসব শিক্ষার্থী চিকিৎসা বা প্রকৌশল বিষয়ে লেখাপড়া করছে তার বেশিরভাগই যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান, মানবিক বা ব্যবসায় শাখার শিক্ষার্থীদের থেকে তুলনামূলক বেশি মেধাবী। যেহেতু তারা অন্যদের তুলনায় মেধাবী, সেহেতু তারা চাইলেই অন্যদের পেছনে ফেলে এই ক্যাডারগুলো দখল করে নিতে পারে খুব সহজেই এবং নিচ্ছেও। যেটা রাষ্ট্রের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতির কারণ।

কেননা, বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় করে রাষ্ট্র একজন ভালো চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা কৃষিবিদ তৈরি করার পরও তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। একটি জাতির জন্য একজন ভালো চিকিৎসক, কৃষিবিদ বা বিজ্ঞানীর গুরুত্ব কতটুকু, তা এই মহামারির সময়ে আমরা মনে হয় কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছি। বিদ্যমান বাস্তবতায় এখন রাষ্ট্রকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাষ্ট্র চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা কৃষিবিদ তৈরি করার পর তাদের কাছ থেকে সেবা গ্রহণ করবে নাকি অন্য পেশায় ঠেলে দেবে?

বৈধ-অবৈধ দুই সুযোগই কয়েকটি ক্যাডারে বেশি। যোগ্যতা থাকার পরও চিকিৎসা, কৃষি বা শিক্ষা ক্যাডারে এসে রাস্তায় অপমানিত হওয়ার চেয়ে রাস্তায় ক্ষমতা দেখানোই আনন্দের। যদি সব ক্যাডারে সমান সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা যেত তাহলে হয়তো বিষয়গুলো এমন নাও হতে পারত।

পেশাগত দায়িত্বের কারণে একেক ক্যাডারের সদস্যরা একেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। যেমন, পররাষ্ট্র ক্যাডারে যারা নিয়োগ লাভ করেন ও বিদেশে অবস্থান করবেন তারা বিদেশি ভাতা ভোগ করবেন, সন্তানের পড়াশোনার ভাতা ভোগ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একই সঙ্গে যারা শিক্ষা ও চিকিৎসা ক্যাডারে রয়েছেন, তাদের জন্যও বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসনের ক্যাডারের জন্যও বিদেশে উন্নত ট্রেনিং ও লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা ও চিকিৎসা ক্যাডারের জন্য সেটি কি নিশ্চিত করা হয়েছে? আবার পদোন্নতির শর্তও সবার জন্য সমান করতে হবে। কারও শর্ত সহজ কারও কঠিন, তা নয়। পদ না থাকলে যদি নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্যাডারে পদোন্নতি দেওয়া যায় তাহলে পদ না থাকলে অন্য ক্যাডারদের পদোন্নতি দিতে সমস্যা কোথায়? অথবা সব ক্যাডারের জন্যই পদ সৃষ্টির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রায় প্রতিটি অফিসের প্রধান পদগুলো নির্দিষ্ট একটি ক্যাডারের কর্মকর্তারা দখল করে রেখেছে, সেটিও অসন্তোষের একটি কারণ।

সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

md.asaduzzaman90@yahoo.com

মন্তব্য করুন