তৃতীয় বিশ্বের নির্বাচনে সত্য-মিথ্যার মিশেলে বাগ্‌যুদ্ধ নতুন নয়। তবে এই বিতর্ক নিজ দেশ ছাপিয়ে প্রতিবেশী দেশকে আক্রান্ত করার নজির দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বেশি চোখে পড়ে। এই যেমন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত ইস্যু। তবে সম্প্রতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ সম্পর্কে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যা বলেছেন, তা কোনো শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। তিনি বলেন, 'যে কোনো পিছিয়ে পড়া দেশে উন্নয়ন হতে শুরু করলে সেটা প্রথমে কেন্দ্রে হয়। তার সুফল প্রথমে বড়লোকদের কাছে পৌঁছায়, গরিবদের কাছে নয়। এখন বাংলাদেশে সেই অবস্থা চলছে। ফলে বাংলাদেশের গরিব মানুষ এখন খেতে পাচ্ছে না। সে কারণেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ চলছে' (সমকাল ১৬ এপ্রিল ২০২১)। এ কথা বলার আগে বাংলাদেশে চাকরি করে প্রতি বছর ভারত কী পরিমাণ রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত হয়, তা জেনে নেওয়া উচিত ছিল।

ভারত যদি উন্নত দেশ হতো, ভারতের উন্নয়ন যদি সুষম হতো, ভারতে যদি প্রচুর কর্মসংস্থান থাকত, তাহলে অমিত শাহর এই কথার সারবত্তা কিঞ্চিৎ থাকলেও থাকতে পারত। ভারতে রাজ্য থেকে রাজ্যে উন্নয়ন বৈষম্য আকাশচুম্বী। শিক্ষিত বেকার বেসুমার। বরং বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য তেমন নেই। যা হোক, আমি এসব বিষয়ে আলোচনা করতে চাই না। আমি অমিত শাহের ঐতিহাসিক এক ভুল সংশোধন করতে চাই।

বাংলা ও বাঙালি নিয়ে ভারতের অপর অংশের বিদ্বেষ ও ঈর্ষার ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা কৃষি-অর্থ-বাণিজ্যের সমৃদ্ধশালী অঞ্চল। মোগলদের পতনের যুগে বাংলার অর্থনৈতিক জোগান কিছুটা তাদের স্বস্তি দিয়েছিল। একই সময়ে 'চৌথ' আদায়ের নামে বাংলায় উপর্যুপরি মারাঠি-বর্গি আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল বাংলার সম্পদ লুটপাট করা। ব্রিটিশ বেনিয়ারা ঐশ্বর্যশালী বাংলাকেই প্রথম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল অর্থনৈতিক কারণেই। আবার ব্রিটিশ শাসনামলে দক্ষিণ ভারতের বড় বড় ব্যবসায়ী বাংলায় তাদের ব্যবসায় কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। বিড়লা-গোয়েঙ্কা-মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা বাংলা বাণিজ্যে পুঁজি খাটিয়ে প্রচুর লাভবান হয়েছিলেন। বাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রসরমানতা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।

কংগ্রেস নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলে বলেছিলেন, 'হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্ক টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্ক টুমোরো।' কলকাতা ১৯১১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জাগরণের কেন্দ্রে ছিল কলকাতা তথা বাংলা। চিন্তা-চেতনায় প্রাগ্রসর বাঙালি অনেকের জন্যই মাথাব্যথার কারণ ছিল। ব্রিটিশরা বাঙালিকে পূর্ব-পশ্চিমে এবং পাকিস্তানিরা বাঙালিকে হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত করে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চেয়েছিল। শ্রেণিচরিত্রের পার্থক্য থাকলেও ১৯০৫ এবং ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করা হয়েছিল। এ বিরোধিতার লক্ষ্য ছিল একটাই, বাঙালির নৃতাত্ত্বিক ঐক্য রক্ষা করা। অবিভক্ত বাংলার সর্বশেষ মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শরৎ বসু প্রমুখরা 'অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা' গঠনের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। অমিত শাহের সমশ্রেণি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বিড়লা-গোয়েঙ্কারা বরং বাংলা ভাগের আগুনে ঘি ঢেলেছিল।

ব্রিটিশ-বাংলার সর্বশেষ গভর্নর ফ্রেডরিক বারোজও ব্রিটিশ সরকারের কাছে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা গঠনের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তা না হলেও কলকাতাকে 'ফ্রি সিটি' ঘোষণার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তিনি বাউন্ডারি কমিশনের চেয়ারম্যান স্যার সিরিল রেডক্লিফকে বলেছিলেন, 'বাংলাকে ভাগ করলে দুটি বিষয় ঘটবে। প্রথমত, নিশ্চিতভাবেই ভয়ানক রক্তপাত ঘটবে। দ্বিতীয়ত, দুই অংশেরই উন্নয়ন হতে হবে। বারোজের দুটি আশঙ্কাই সত্য হয়েছিল।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ পাট পূর্ব বাংলায় উৎপাদিত হতো অথচ একটিও পাটকল ছিল না। এ ছাড়া ওই সময়ের বাঙালিদের কল্পনায় ছিল না যে, বাংলা স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। যা হোক, বাংলাভাগের ফলে পাট ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের বাজার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। কেননা, পূর্ব বাংলায় একটিও পাটকল ছিল না, অন্যান্য কলকারখানাও খুবই কম ছিল। এ ছাড়া ১৯৪৯ সালে মুদ্রার অবমূল্যায়নকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। এই বাণিজ্যযুদ্ধে মূলত পূর্ববাংলাই ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সমানভাবে কলকাতার শিল্প-কলকারখানাও কাঁচামালের সংকটে পড়ে। কেননা পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার অর্থনৈতিক বিন্যাস একে-অপরের প্রতি গভীরভাবে নির্ভরশীল ছিল।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে 'মাইগ্রেশন' একটি ঐতিহাসিক সত্য। তবে এই 'মাইগ্রেশনে' লাভবান হয়েছে ভারত। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ লোক পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমায় এবং তা দেশভাগের আইনানুসারে 'অপশন' দেওয়ার সুযোগে। অন্যদিকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পূর্ববাংলায় এ সময় এসেছিল প্রায় সাত লাখ মানুষ।

পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিমবঙ্গে যারা গিয়েছিলেন তারা সবাই জমিদার, জোতদার, বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ব্যাংকার ইত্যাদি ধনিক শ্রেণির হিন্দু। অন্যদিকে ভারত থেকে এসেছিলেন গরিব মুসলমান কপর্দকশূন্য অবস্থায়। দেশভাগের চার বছরের এক গড় হিসাবে দেখা গেছে, এসব অভিবাসীর মাধ্যমে প্রতিবছর পূর্ববাংলা থেকে ভারতে ৪০ কোটি রুপি গেছে এবং ভারত থেকে পূর্ববাংলায় মাত্র ২ কোটি রুপি করে এসেছে।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরে এক ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। দেশভাগের পর যেসব মানুষ ভারতে গেছেন, তাদের অনেক আত্মীয়স্বজন এখানে রয়ে গেছেন। আবার ওপারে যারা গেছেন, তারাও রেখে যাওয়া স্বজনদের টান অনুভব করেন। কাজেই সীমান্তের দু'পারের এই আত্মীয়তার কারণে আবার ভ্রমণভিসায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ কলকাতাসহ ভারতের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান ভ্রমণ করতে যান, আবার ফিরে আসেন।

'খাবার না পেয়ে' ভারতে যান- এ কথা যাচাই করার জন্য অমিত শাহ বাংলাদেশে আসতে পারেন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে চীন ও ভারতকে পেছনে ফেলে তৃতীয়, গার্মেন্ট শিল্পে দ্বিতীয়, 'গরু ও পেঁয়াজ' উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে। কৃষিকে পেছনে ফেলে জিডিপিতে শিল্প এগিয়ে গেছে, নগরায়ণ গতি দ্রুততর, সামাজিক উন্নয়নের সব সূচকে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। গ্রামে শ্রমিকের অভাব। সেখানে কি কাজের আশায় তারা ওপারে যাবে, বলুন তো?

পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। এ সম্পর্ক ভালোবাসার, এ সম্পর্ক আত্মার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে দু'দেশের মানুষের রক্ত মিশে আছে। ভারতের জনগণ ভাতের থালা আমাদের সঙ্গে ভাগ করেছে। আমরা সব সময় এ ঋণ স্বীকার করি। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্বদানকারী অনেকের নাড়ি পূর্ব বাংলার মাটিতে পোঁতা রয়েছে। বাংলাদেশের শ্মশান-গোরস্তানে ওপারের অনেকের পূর্বপুরুষের দেহাবশেষ রয়ে গেছে। এপারের অনেকের জন্যও এ কথা প্রযোজ্য। গুজরাটি অমিত শাহের বঙ্গ-দর্শনে এই ইতিহাস অজানা থাকার কথা নয়।

সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় mrahim77@du.ac.bd

মন্তব্য করুন