বাংলাদেশে যদিও সমপর্যায়ের অনেক দেশের মতো লকডাউনের প্রকার বা গভীরতা নিয়ে কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে; করোনা মহামারি থেকে জীবন রক্ষায় দেশে দেশে লকডাউন চলছে। তাতে উৎপাদন-ভোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এসব মানুষের জীবন রক্ষায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। অর্থনৈতিক স্থবির অবস্থায় সরকারি ব্যয় বৃদ্ধিতে কেউ কেউ অবশ্য শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন মূল্যস্ম্ফীতির। কিন্তু অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মহামারির সময় জীবন বাঁচানোকে প্রাধান্য দিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। উন্নত দেশগুলো সে পথ অনুসরণপূর্বক ব্যয় বাড়াতে থাকে। এতে সুফল মিলেছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকাংশ সরকারি ব্যয় বৃদ্ধিতে পিছিয়ে রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, করোনার অভিঘাত মোকাবিলায় জিডিপি অনুপাতে সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে একেবারে পেছনে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। অথচ করোনার কারণে দারিদ্র্য বৃদ্ধি, কর্মচ্যুতিসহ নানা সামাজিক সংকট দেখা দিয়েছে।

ত্রিশের মহামন্দার সময় থেকেই এটি প্রায় সর্বজনস্বীকৃত- এ রকম পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে খরচ বাড়াতেই হবে; যাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় স্পেন্ডিং প্রায়োরিটি বা ব্যয়ে প্রাধিকার। এ আর্থিক সংকট করোনার জন্য ঘনীভূত হয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ এও বলছেন, এখন অর্থনীতিতে প্রণোদনা দেওয়ার চেয়ে মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছানো অনেক বেশি জরুরি। বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই করোনার সময়ে রাজস্ব আহরণ হ্রাস পেলেও খরচের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এর সমন্বয় করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই তিনটি গ্রোথ ড্রাইভারের কথা বলে থাকেন। তার মধ্যে প্রথমটি হলো বেসরকারি ভোগ। দ্বিতীয়টি, বেসরকারি ব্যয়। তৃতীয়টি হলো রপ্তানি। এসবই এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিকল্প অর্থাৎ চতুর্থটি হলো সরকারি খরচ। সরকারি খরচ মানে 'সরকারি বিনিয়োগ'। এ ক্ষেত্রে ব্যয় মানে বাজার চাঙ্গা করার জন্য সরকারকে টাকা খরচ করতে হবে, যাতে বাজারে পণ্যের দাম বহাল থাকে। কৃষক এবং উৎপাদনকারী যেন তার পণ্যের নূ্যনতম ন্যায্য দাম পান। তা না হলে সব দিক থেকেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়বে।

অর্থনীতি চাঙ্গা করে তুলতে গেলে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকেই প্রাথমিকভাবে তাকাতে হবে। কিন্তু শুধু ঋণের জোগান বাড়ালেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি সংস্থাগুলোর স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে কি? অর্থনীতিবিদদের একটা বড় অংশ মনে করছে, শুধু ঋণের জোগান বাড়িয়ে বা শর্ত শিথিল করে তাদের করোনা সংকট থেকে টেনে তোলা যাবে না। এ জন্য আলাদা করে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। মানুষ কাজ হারিয়েছে, কাজ কম পাচ্ছে; কম আয় করছে। ফলে যে মাত্রায় গতিশীল হওয়া দরকার অর্থনীতি, তা হচ্ছে না। অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় না বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে না। এ জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের দিকে না তাকিয়ে কর্মসৃজনমূলক প্রকল্প হাতে নিতে হবে সরকারকে। করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসৃজনকে প্রাধান্য দেওয়া ও বিলাসী ব্যয় নিরুৎসাহিতকরণ উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশকেও একই পথ অনুসরণ করতে হবে। তাছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশই আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখা এবং ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনা ও স্বল্প সুদে কিছু ঋণ সুবিধা প্রবর্তন করেছে, যাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত হয়; কর্মসংস্থান ঠিক থাকে এবং উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ে। এখন প্রয়োজন এর কার্যকর বাস্তবায়ন।

মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে অর্থনীতির স্বাস্থ্য দ্রুত ফেরানো সম্ভব নয়। ক্রেতারা পণ্য না কিনলে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন করবে না। জনবল নিয়োগ করবে না। বিনিয়োগও করবে না। কোম্পানির উৎপাদিত পণ্য যদি অবিক্রীত অবস্থায় থাকে, তাহলে তারা নতুন ঋণ নিয়ে মজুদ বৃদ্ধি করবে কেন? কী করেই বা পুরোনো ধার শোধ করবে? এর উল্টো যুক্তিও আছে। কেউ বলতে পারেন, বিধিনিষেধ উঠে গেলে ধীরে ধীরে কোম্পানিগুলো খুলবে, আবার উৎপাদন শুরু হবে; কর্মচারীরা তাদের বেতন পেতে শুরু করবেন। বেতন হাতে পেলে তারা পণ্য কিনতে শুরু করবেন। ফলে কোম্পানিগুলোরও উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ থাকবে। তাই আলাদা করে চাহিদা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। অর্থনীতি যাতে তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, এ জন্য বরং সরবরাহের দিকটা আরও মসৃণ করা যেতে পারে। তাদের মতে, সহজ শর্তে ঋণ সরবরাহ ব্যবস্থাকে মজবুত করে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ত্বরান্বিত করতে হবে। আর সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়ে গেলে চাহিদা নিজে থেকেই তৈরি হয়ে যাবে। অর্থনীতিতে যাকে বলা হয়, 'সাপ্লাই ক্রিয়েটস ইটস ওউন ডিমান্ড'। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন, এ ভাবনায় গলদ আছে। মানুষ তার আয়ের পুরোটা খরচ করে না; আয়ের একটা অংশ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে। যে আয়টা সঞ্চিত হয়ে রইল, তার ঠিক সমান মূল্যের উৎপাদন কিন্তু ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিক্রি হবে না। সঞ্চয়ের কারণে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে একটা ব্যবধান থেকে যাবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিনিয়োগের চাহিদা কম হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এ সংকটের সময় বেশিরভাগ উদ্যোক্তা সাহস করে বিনিয়োগ করবেন না। আর বিনিয়োগের চাহিদা না থাকলে সঞ্চয়ের অংশ অবিক্রীতই থাকবে। সব মিলিয়ে সঞ্চয়ের অনুপাত বাড়বে। আর তার সঙ্গে যেহেতু বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা কম, ফলে চাহিদায় ঘাটতি দেখা দেবে। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় চাহিদা বাড়ানো। চাহিদা দু'ভাবে বাড়ানো যেতে পারে। প্রথমত, মানুষের হাতে, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের হাতে সরাসরি কিছু টাকা পৌঁছে দেওয়া। গ্রহীতা এ টাকা ভোগ্যপণ্যের ওপর সরাসরি খরচ করে পণ্যের চাহিদা বাড়াবেন। দ্বিতীয়ত, সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে দেশে যে শুধু পণ্যের চাহিদা বাড়বে, তা নয়। সরকারি বিনিয়োগের ফলে দেশের পরিকাঠামোর উন্নতি ঘটবে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগও খানিকটা বাড়তে পারে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি, অমর্ত্য সেনসহ অনেকে বলছেন, সরকারের আর্থিক ঘাটতি কম রাখার চেষ্টা করার কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছাতে হবে। হতদরিদ্র, কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত জনগণকে সুরক্ষা দিতে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি ও বাজারে মুদ্রা সরবরাহের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করছে বিশ্বের অন্যান্য দেশ।

আশার দিক হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী আগামী বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর জন্য বরাদ্দ আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন প্রয়োজন তা সত্যিকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেই সঙ্গে গরিব কিন্তু উৎপাদনশীল মানুষের কাছেও এককালীন কিছু টাকা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।

আমরা এও জানি, ব্যয়ের জন্য আয় বৃদ্ধিও প্রয়োজন। তাই নতুন উদ্যোগে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও কর ফাঁকি রোধের বিকল্প নেই। পাশাপাশি অপচয় ও দুর্নীতি রোধের বিষয়টিও ভুললে চলবে না।

 অর্থনীতি বিশ্নেষক

মন্তব্য করুন