গত মাসের ২৪ তারিখ দুপুরে লাউয়াছড়ার একটি অংশে বন বিভাগের একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আগুন লাগে। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় কমলগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ইউনিট ও বন বিভাগ আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। ঘটনার তদন্তে শ্রীমঙ্গলের সহকারী বন সংরক্ষক মির্জা মেহেদী সারোয়ার ও বন মামলার পরিচালক জুলহাস উদ্দিনের সমন্বয়ে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ঘটনার তিন দিন পর ২৮ এপ্রিল বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অফিসে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি। সম্ভবত প্রাকৃতিক বনে আগুন লাগার ঘটনায় এটিই দ্রুততম সময়ে জমা হওয়া কোনো তদন্ত প্রতিবেদন। করোনা মহামারিকালের নিদারুণ ঝুঁকির ভেতরেও এ কাজটি সম্পন্ন করার জন্য বন বিভাগকে অভিনন্দন। কারণ, বছর বছর সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জে আগুন লাগিয়ে মাছ চাষের জন্য জায়গা দখল হয়। প্রতিকারে কোনো তৎপরতা নেই। শেলা নদীতে তেলবোঝাই জাহাজডুবি থেকে শুরু করে সুন্দরবনে নিত্য রাসায়নিক বোঝাই যান ডোবে। কোনো তদন্ত প্রতিবেদন নেই। এমনকি ১৯৯৭ সালে ঝলসে গিয়েছিল লাউয়াছড়া। কোনো বিচার মেলেনি। লাউয়াছড়ার এই সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড ঘিরে বন বিভাগের এই সাহসী তৎপরতা দেশে এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।

কী আছে তদন্ত প্রতিবেদনে :তদন্ত কমিটি কেবল সরেজমিন পরিদর্শন ও জিজ্ঞাসা নয়; অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজও বিশ্নেষণ করেছে। চারদিকে পুড়ছে বন, অথচ ভিডিওতে দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রমিকদের 'নির্লিপ্ত' দেখতে পেয়েছে কমিটি। কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনে ১০টি মতামত উল্লেখ করেছে। ১. বিগত ২৪-৪-২১ তারিখ দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১ ঘটিকার মধ্যবর্তী কোনো এক সময় মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী রেঞ্জ, শ্রীমঙ্গলের অধীন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পূর্বদিকের শেষপ্রান্ত হীড-বাংলাদেশ সংলগ্ন বাঘমারা ফরেস্ট ক্যাম্পের অধিক্ষেত্রাধীন বনভূমিতে আগুন লাগে এবং বেলা আনুমানিক ২টা ২০ মিনিট থেকে আড়াইটা পর্যন্ত আগুন বিদ্যমান থাকে। ২. ওপরে বর্ণিত স্থানে যেখানে বন বিভাগ কর্তৃক বর্তমান ২০২০-২১ সালে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল উন্নয়ন ও বন্যপ্রাণীর খাদ্যসংস্থান তৈরিতে বন বাগান সৃষ্টির লক্ষ্যে ঝোপ-ঝাড়, আগাছা, লতাগুল্ম প্রভৃতি স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে কর্তন করা হয়েছিল, সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত। ৩. সংঘটিত ফরেস্ট ফায়ার এক থেকে দেড় একর বনভূমিতে ছড়িয়ে যায়। যার অধিকাংশই বাগান সৃজনের স্থানে, যেখানে বিদ্যমান জঙ্গল স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে কর্তন করা হয়েছিল। ... গাছপালার উপরিভাগ এখনও সবুজ। ৪. বনায়নের জন্য জঙ্গল পরিস্কার করা জায়গায় আগুনে পোড়া স্থানে আগামী জুন মাসের মধ্যেই চারা গাছ রোপণ করা হবে। বাকি অংশে অল্প দিনের মধ্যে ন্যাচারাল হিলিংয়ে বন নিজে নিজেই তার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে। ৫. সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে বনের গাছের কোনো গুরুতর ক্ষতি হয়নি। ৬. বনের আগুন বন বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবেই অল্প সময়ে নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হয়েছে। যথাসময়ে আগুনের সামনে লম্বালম্বিভাবে ফায়ার লাইন তৈরির ফলে মূল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বনাঞ্চলে প্রবেশ করতে পারেনি এবং যার ফলে বনের সামান্য ক্ষতি হয়েছে। ৭. বর্ণিত অগ্নিকাণ্ড ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছে বলে তদন্তে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি। তবে বনায়ন কাজে আগাছা বা জঙ্গল অপসারণ কাজে বাগানে আগুন না লাগানোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ওই বনাঞ্চলে আগুন লাগার ঘটনায় মো. মোতাহার হোসেন, বনপ্রহরী, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাঘমারা ক্যাম্প দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ দিয়েছে। ... এ ব্যাপারে তার সার্বিক তদারকির অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। ৮. কমিউনিটি প্যাট্রোল দলের সদস্য মো. মহসিন আগুন লাগা দেখেও নির্লিপ্ত ছিলেন। ... তার গাফিলতি না থাকলে এবং আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তা নেভানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে এক-দেড় একর বন এলাকার চেয়েও কম এলাকা পোড়ার ঘটনা ঘটতে পারত। ৯. মূলত বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছ থেকে সংবাদ পাওয়ার পরেই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম তার নেতৃত্বে বন বিভাগের স্টাফরা আগুন নেভানোর কাজে যুক্ত হয়েছেন। ১০. ভবিষ্যতে বনে এ ধরনের আগুন লাগার ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য বন বিভাগের মাঠ পর্যায়ের স্টাফদের আরও তদারকি বাড়াতে হবে এবং বনে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো সব গাছের প্রতিই যত্নবান হতে হবে। ... পার্শ্ববর্তী ফায়ার সার্ভিসের টেলিফোন নম্বরগুলো সঙ্গে রাখতে হবে।

তাহলে আগুন লাগল কীভাবে :ছবিসহ অগ্নিকাণ্ডের খবর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অনলাইনে প্রকাশিত হতে থাকে। তদন্ত প্রতিবেদন জমার পর ফলোআপ খবরও ছাপে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, 'দায়িত্বে অবহেলার কারণে' ঘটনাটি ঘটেছে। এমনকি বিভাগীয় বন কর্মকর্তাও গণমাধ্যমের কাছে 'দায়িত্বে অবহেলা' উল্লেখ করে দোষীদের প্রাতিষ্ঠানিক বিচারের আওতায় আনার কথা জানান। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন কী বলে? তদন্ত প্রতিবেদনের কোথাও উল্লেখ নেই- এই আগুন কে বা কারা লাগিয়েছে। যেহেতু আমাজন বা আমেরিকার মতো প্রাকৃতিক ফরেস্ট ফায়ারের নজির লাউয়াছড়াতে নেই, তাই নিশ্চয় মানুষের মাধ্যমেই এ আগুনের সূত্রপাত। তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, এই আগুন ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়নি এবং আগুন না দেওয়ার জন্য বন বিভাগের পূর্ব নির্দেশ ছিল (মতামত-৭)। তার মানে কি 'অনিচ্ছাকৃতভাবে বা অসাবধানতাবশত' এ আগুন লেগেছে? তদন্ত প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট নয়- অভিযুক্ত তিনজন আগুন লাগিয়েছেন কিনা। কিন্তু এই তিনজন আর কিছু শ্রমিক ছাড়া তো সেখানে আর কেউ ছিল না। তদন্ত প্রতিবেদন তাই বলছে। তাহলে বহিরাগত কেউ কি সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আগুন লাগিয়ে গেল? আগুন লাগার রহস্য অধরাই থেকে গেল। সবকিছুর পরও বন বিভাগ সৎসাহস নিয়ে বলেছে, তাদের তিনজনের গাফিলতির জন্যই প্রায় দেড় একর বন পুড়েছে। আশা করি, এই গাফিলতিরও বিচার করবে বন বিভাগ।

কতটুকু দাগ, কতখানি ক্ষত :সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডে কতখানি ক্ষতি হলো, এর হিসাব নেই তদন্ত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক থেকে দেড় একর বন পুড়েছে। অগ্নিকাণ্ডে 'বনের সামান্য ক্ষতি হয়েছে'। অনলাইন নিউজ পোর্টাল আইনিউজ ২৪ এপ্রিল ইউটিউবে একটি ভিডিও আপলোড করে। দেখা যায়, দমকল বাহিনী রুদ্ধশ্বাসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিকেও ছাই হওয়া থেকে অগ্নিনির্বাপণ কর্মীরা বাঁচিয়েছেন। তিন স্তরের এই বনের বনতল পুড়েছে বেশি। বনতলের বন্যপ্রাণেরা মরেছে। তাদের আবাস ও বিচরণ অঞ্চল হারিয়েছে।

অণুজীব, শৈবাল, ফার্ন, ছত্রাক, বনআলু, কচু, আদা জাতীয় কন্দ, লাইকেন, মস, গুল্ম, কেঁচো, সরীসৃপ, ব্যাঙ, বনতলের পাখি, সাপ, কচ্ছপ, সজারু- মূলত এদের অঞ্চলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। আবার এ ঘটনা নানাভাবে প্রভাব ফেলবে এই স্তরের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা বনের অন্য স্তরের বন্যপ্রাণের ওপরও। তাতে স্থানীয় খাদ্যশৃঙ্খলে একটা সাময়িক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও পড়বে। বনতলে ঘুমিয়ে থাকা অনেক বীজদানা যারা সামনের বর্ষায় চারা হয়ে জন্মাত, তাদের ক্ষতি হওয়াটা স্বাভাবিক। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে প্রাকৃতিক অঙ্কুরোদ্‌গম এবং উদ্ভিদের বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে। এটি সামগ্রিক বন বিকাশের পথে একটা ক্ষত হয়ে রইল। লাউয়াছড়ার সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে বন বিভাগ যে সাহসী উদাহরণ তৈরি করল; আশা রাখি তা আরও সক্রিয় হবে প্রতিদিন।

গবেষক ও লেখক
 animistbangla@gmail.com

মন্তব্য করুন