তাসনুভা আনান শিশির নামে এক নারী বেসরকারি একটি টেলিভিশনে নাটকের কাজে গিয়েছিলেন। তার উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি, উপস্থাপনা কৌশল দেখে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ তাকে খবর পাঠের জন্য নির্বাচিত করে। এর পরের অংশটুকু সবারই জানা। হ্যাঁ, তিনি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এ বছরের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নারী হিসেবে বৈশাখী টিভিতে খবর পাঠ করেন। প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও অবহেলাকে অতিক্রম করে নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন তিনি। সবার চোখ খুলে দেওয়ার এ এক অনবদ্য সূচনা। এ গোষ্ঠীর মানুষের জীবনাচরণ অনেকের কাছে খুব একটা স্বস্তিকর নয়। হয়তো ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে আছেন, ওরা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে টাকা-পয়সার জন্য গাড়ির কাচে বাড়ি মারবে, না দিলে গালাগাল করবে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন, দল বেঁধে আপনাকে ঘিরে ধরবে। বাস, লঞ্চ, ট্রেন স্টেশনে নেমে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করছেন, তাদের পাল্লায় পড়লে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হবেই। তারা কিন্তু ভিক্ষুকও নয়, চাঁদাবাজও নয়। তাদের বলা হয় 'তৃতীয় লিঙ্গ'। তারা কেউ দালান-কোঠায় থাকে না, হাজার হাজার টাকাও কামাই করে না। শুধু ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ ও জীবনটাকে ঠেলে পার করার জন্য অন্যের কাছে হাত পাতছে।

তারা কেন এ জীবন বেছে নিয়েছে? তাদের সম্মানজনক জীবনযাপনের ক্ষেত্র কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি? তাদের এ জীবন থেকে সরিয়ে আনার জন্য আমাদের উদ্যোগ কতটুকু? অনেক ক্ষেত্রে পরিবারও তাদের সন্তানকে দায় মনে করে। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় তারা যথাযথ সহযোগিতা, সহমর্মিতা পায় না, ওদের সঙ্গে আমাদের আচরণ স্বাভাবিক নয়। ফলে তারা কিছুতেই নিজেকে মূলস্রোতের অংশ মনে করতে পারে না। তাই পরিবার থেকে পালিয়েই যেন মুক্তি। 'হিজড়া' সন্তান জন্ম নিলে অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা যেমন তাকে তাদের আস্তানায় রেখে আসে, একই সঙ্গে 'তৃতীয় লিঙ্গের সম্প্রদায় মনে করে ওই ধরনের যে কোনো শিশুর ওপর তাদের দাবি সবচেয়ে বেশি। তাইতো তারা দলবল নিয়ে অনেকটা জোর করেই তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে ওই শিশুকে নিয়ে চলে আসে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০১৩-তে বলা হয়েছে, 'হিজড়া সম্প্রদায় বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ হলেও আবহমানকাল থেকেই এ জনগোষ্ঠী অবহেলিত ও অনগ্রসর হিসেবে পরিচিত। সব নাগরিক সুবিধা ভোগের অধিকার সমভাবে প্রাপ্য হলেও তারা পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার বলে প্রতীয়মান। তাদের প্রতি সদয় আচরণ ও তাদের নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়া পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সকলের দায়িত্ব।'

তাদের 'তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, এখন তাদের পরিচয় গোপন করে নারী বা পুরুষের পরিচয় ধারণ করার প্রয়োজন পড়বে না। এখন তাদের কর্মে প্রবেশের সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। তাদের স্বকর্মসংস্থানের জন্য অনুদান, সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের সরকারি ও নামকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থার মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করতে হবে, যেন অন্যরাও তাদের কাছে টেনে নিতে উদ্বুদ্ধ হয়। আশার কথা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে একদল 'তৃতীয় লিঙ্গের' মানুষ কাজ করছে। সমাজের কুসংস্কার ও অগ্রসর চিন্তার অভাবে পরিবারে জন্ম নেওয়া এমন জনদের বাড়ি ত্যাগ করে যোগ দিতে হচ্ছে 'তৃতীয় লিঙ্গের' আস্তানায়। পারিবারিক পরিবেশ ও মা-বাবা, ভাইবোনের স্নেহ-ভালোবাসা থেকে তারা কি বঞ্চিত হতেই থাকবে? মায়ের স্নেহের পরশ কি তাদের জন্য অধরা হয়েই থাকবে? ভালোবাসাহীন রুক্ষ-শুস্ক অনাদর অবহেলায় বেড়ে উঠে সমাজের অনুগ্রহের পাত্র হওয়াই কি তাদের নিয়তি? তাসনুভা পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন- ছয় বছরের বেশি সময় ধরে ঈদে বাড়ি যাওয়া হয় না। পরিবার ও লোকজনের কটু কথা শুনতে হয় বলে বাড়িই যান না, তাই তার কাছে ঈদ মানেই প্রিয়জনদের কাছে যেতে না পারার বেদনা এবং দুঃখ-কষ্টের নবায়ন মাত্র। এত দুঃখকষ্ট, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করা তাসনুভা এখন ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিখ্যাত সব ম্যাগাজিনে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। বছর ঘুরে আবার ঈদ আসছে, এবার কি 'তাসনুভা'রা তাদের মায়েদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে পারবেন?

সরকারি চাকরিজীবী

মন্তব্য করুন