করোনা দুর্যোগে আমাদের অনেকেরই উপলব্ধি হয়েছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ঠিক কীভাবে এটা করা যেতে পারে, সে ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা এখন পর্যন্ত নেই। অনেকেই বলছেন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারের পূর্বপ্রস্তুতির সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। এর মূল কারণ অবশ্য নীতিনির্ধারকরা মূলত জোর দিয়েছেন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ওপর। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আসন সংখ্যা বাড়ানো, রোগী ব্যবস্থাপনা করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা যেমন- অক্সিজেন সিলিন্ডার, ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা, নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো ইত্যাদি। এই পরিকল্পনা দেখে এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক, তারা ধরেই নিয়েছিলেন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসবেই এবং তা মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু এর পাশাপাশি যা প্রয়োজন ছিল তা হলো করোনা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করা। এর জন্য মাত্র তিনটি কাজ করতে হয়- ১. সবার জন্য মাস্ক পরিধান করা বাধ্যতামূলক করা, ২. সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে চলা ও ৩. বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া নিশ্চিত করা। এই তিনটি কাজে আমাদের দেশের জনগণকে অভ্যস্ত করানো মোটেই কোনো সহজ কাজ নয়। এটা মানুষের সামাজিক আচরণগত পরিবর্তন যোগাযোগ কার্যক্রমের আওতায় পড়ে। যারা এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িত আছেন তারা খুব ভালোমতোই জানেন, কোনো মানুষের আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আনা কতটা সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন, যদিও তা অসম্ভব নয়। এদিকে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ কিছুটা কম।

আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা মূলত অসুস্থ ব্যক্তির রোগ ব্যবস্থাপনাকেন্দ্রিক। তবে এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য শিক্ষার ওপর অনেক জোর দেওয়া হয়েছে, যার উদ্দেশ্য মূলত চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিষয়ক মানবসম্পদ তৈরি। দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, নার্স, ফার্মাসিস্ট, কাউন্সেলর তৈরির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। উপরন্তু মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থাতেও 'কমিউনিটি মেডিসিন'-এর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে চিকিৎসকরাই বলে থাকেন। এখানে সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়, যেখানে প্রতিরোধ, প্রচারমূলক, প্রতিকার এবং পুনর্বাসনমূলক সেবা প্রদানের কথা বলা হয়। সে কারণেই এখন মনে হচ্ছে, আমাদের দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, নার্সিং সেবা এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মাধ্যমে যে সেবা প্রদান করে থাকে, সেখানেই এই পরিবর্তনটা আনা যেতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতকে প্রথমেই প্রতিরোধমূলক, প্রচারমূলক, প্রতিকারমূলক এবং পুনর্বাসন- এই চারটি ভাগে অথবা প্রতিরোধ ও প্রচারমূলক এবং প্রতিকার ও পুনর্বাসনমূলক এই দুটি ভাগ করা যেতে পারে। আমাদের স্বাস্থ্যনীতি ২০১১-তেও এই চারটি ভাগের কথা বলা আছে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় তা নেই। বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ২৯টি অপারেশনাল প্ল্যানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যার মধ্যে ১৪টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সাতটি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, চারটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় এবং নার্সিং সেবা, ঔষধ প্রশাসন, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ও নিপোর্টের নিজস্ব চারটি অপারেশনাল প্ল্যান আছে। এ ছাড়া আরও পাঁচটি সংস্থা রেগুলেটরি বডি হিসেবে কাজ করে। এই ২৯টি পরিকল্পনায় দেখা যায়, এখানে মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং কিশোর-কিশোরীদের বিষয়ে নানা ধরনের প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আছে- টিকাদান কর্মসূচি, কৃমিনাশক কর্মসূচি, স্বাস্থ্য শিক্ষা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি কার্যক্রম এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থা নিয়ে। নানা ধরনের প্রচারমূলক কার্যক্রমের জন্যও দুটি ভিন্ন অপারেশনাল প্ল্যান রয়েছে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর আলাদা আলাদাভাবে বাস্তবায়ন করে থাকে; যেখানে প্রাত্যহিক জীবনাচার, জীবনদক্ষ শিক্ষা, সামাজিক আচরণ পরিবর্তন যোগাযোগ শিক্ষাবিষয়ক কাজ হয়ে থাকে। আর বেশিরভাগ পরিকল্পনাই মূলত হাসপাতালকেন্দ্রিক সেবা ব্যবস্থাপনা, এর সরঞ্জাম ক্রয় প্রক্রিয়া, কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক-অসংক্রামক রোগের ব্যবস্থাপনা, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করে থাকে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে কোথাও পুনর্বাসনমূলক কোনো কাজের পরিকল্পনা দেখা যায় না। যদিও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাজের মধ্যে নানা ধরনের পুনর্বাসনমূলক কাজ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু দেশের বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো ধরনের পরিকল্পনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অপারেশনাল প্ল্যানে নেই। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠী অসুস্থ হলে তাকে সুস্থ করার জন্য চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা আছে।

আমাদের দেশ এখন জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ উপভোগ করছে। তবে এখন থেকেই ভবিষ্যতের বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে সচল ও সুস্থ রাখার পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে তাদের জন্য পুনর্বাসনমূলক সেবাকাঠামো তৈরি করতে হবে। এর পাশাপাশি চলমান প্রতিরোধ ও প্রচারমূলক কাজের পরিধি এবং ব্যাপকতা যদি বাড়ানো যায় তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হাসপাতালভিত্তিক প্রতিকারমূলক সেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ কমে আসবে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করলেই এর কার্যকারিতা বোঝা যাবে। আমরা যদি শুধু সাধারণ জনগণকে মাস্ক পরা ও সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যাপারে সচেতন করতে পারতাম, তাহলে হয়তো করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে এত বেগ পেতে হতো না।

পৃথিবীর কোনো দেশেই হাজার হাজার আইসিইউ থাকে না বা থাকার প্রয়োজনও হয় না। আমাদের দেশেও এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকাটা অস্বাভাবিক নয় এবং এর জন্য ঢালাওভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আস্থা হারানো ঠিক নয়। বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যেই এই প্রতিরোধ ও প্রচারমূলক এবং পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রমকে আরও জোরদার করার মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ থেকে আমরা নিরাপদে থাকতে পারি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মধ্যে কাজ ভাগ না করে সম্মিলিতভাবে যদি কাজ করা যায়, তবেই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নামকরণের সার্থকতা নিশ্চিত হবে। 'পরিবার কল্যাণ' শব্দ দুটির ব্যাপকতা অনেক বেশি, তাই স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়ে অধিক নজর দিতে হবে।

উপ-পরিচালক (গবেষণা), বিআইজিএম

মন্তব্য করুন