দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বিজ্ঞানীরা এমন একটি মারণাস্ত্র তৈরি করেন, যা সারাবিশ্বকে ধ্বংস করতে সক্ষম; সেটি আণবিক অস্ত্র। কিন্তু বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আরও দুটি অস্ত্র আবিস্কৃৃত হয়; যা আণবিক অস্ত্রের চাইতেও ভয়ংকর। এ দুটি অস্ত্র হলো ফুড (খাদ্য) এবং মিডিয়া (সংবাদমাধ্যম)। খাদ্যকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এটা সাফল্যের সঙ্গে প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৬ সালে বিখ্যাত মার্কিন ম্যাগাজিন 'ফরেন অ্যাফেয়ার্স'-এ একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, তার শিরোনাম ছিল 'ফুড অ্যাজ উইপন' (অস্ত্র হিসেবে খাদ্য)। এই প্রবন্ধে দেখানো হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশকে চুক্তিবদ্ধ খাদ্যসাহায্য যথাসময়ে না পাঠিয়ে কীভাবে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে লক্ষাধিক নরনারীকে হত্যা করেছিল এবং মুজিব সরকারের পতনের পথ তৈরি করেছিল। অনুরূপভাবে পরবর্তী সময়ে ইরাকে ১১ বছর ধরে খাদ্য, বেবিফুড ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ দ্বারা বন্ধ করে দিয়েছিল। তাতে ১৭ লাখ নরনারীর মৃত্যু হয়েছিল। তারপর অন্যায় ও অবৈধ যুদ্ধ দ্বারা ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে পরাজিত ও হত্যা করেছিল।

শুধু বাংলাদেশ ও ইরাকে নয়; পৃথিবীর অনেক দেশে, যেখানে আমেরিকা তাঁবেদার সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে পারেনি, সেখানেই সরকারের পতন ঘটানোর জন্য মিথ্যা এবং বানোয়াট খবর প্রচার করেছে সেসব সরকারের বিরুদ্ধে। অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি দ্বারা ভিকটিম দেশটিতে খাদ্যাভাব ও অরাজকতা সৃষ্টির পর ওই দেশের সরকারকেই সেজন্য দায়ী করে বিশ্বজনমতের কাছে নিন্দিত করার জন্য প্রচারমাধ্যমকে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে বশ করে ফেলেছে সিআইএ। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে, ভিয়েতনাম ও তৎকালীন বিশ্বে নানা অভ্যুত্থান সৃষ্টির জন্য সিআইএর প্রধান অস্ত্র ছিল মিডিয়া। রাসেলের মতে, বিশ্বে আণবিক অস্ত্রের চাইতেও ক্ষতিকর অস্ত্র মিডিয়া। আণবিক শক্তি যেমন মানবকল্যাণে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু তার ধ্বংসশক্তি ভয়ানক, তেমনি মানবকল্যাণে মিডিয়ারও বিরাট কল্যাণকর রূপ আছে। কিন্তু তারও ধ্বংস শক্তি অসাধারণ।

মিডিয়ার সাহায্য ছাড়া ভয়াবহ ইরাক যুদ্ধ বাধানো টনি ব্লেয়ার ও জর্জ বুশের পক্ষে সম্ভব হতো না। এই দুই নেতা মিথ্যা প্রচার শুরু করেন, ইরাকে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে এমন ভয়াবহ বিশ্বধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে, যা ৪৫ মিনিটের মধ্যে লন্ডনে পৌঁছে লন্ডন শহর ধ্বংস করতে পারবে। এই মিথ্যা কথাটা অনবরত প্রচার করেছে পশ্চিমা মিডিয়া। সাদ্দামের বিরুদ্ধে যত মিথ্যা প্রচার করেছে পশ্চিমা মিডিয়া তত মিথ্যা হিটলারের বিরুদ্ধেও প্রচার করেনি। পরে প্রমাণিত হয়েছে সাদ্দামের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়ার সব প্রচারই ছিল মিথ্যা। সাদ্দামকে অবৈধ বিচারে হত্যা করার পরিবর্তে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার হওয়া উচিত ছিল জর্জ বুশ, টনি ব্লেয়ারসহ বড় বড় পশ্চিমা মিডিয়ার সম্পাদকদের। মিডিয়ার মিথ্যা প্রচার ছাড়া বুশ-ব্লেয়ারের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সম্ভব হতো না।

বিশ্ব ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে, শত্রুকে অন্যায়ভাবে নিধনের জন্য মানুষ দুটি উপায় ব্যবহার করে। এক. শত্রু বা শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার এবং একই সঙ্গে শত্রুর নিকটাত্মীয়দের মধ্য থেকে একজন বা কয়েকজন বিভীষণ খুঁজে বের করা। সেই রামায়ণ-মহাভারতের যুগে দেখা যায় রাবণকে পরাজিত করার জন্য রাবণের ভাই বিভীষণকে রাম ব্যবহার করেছিলেন। ইমাম হাসানকে বিষ দিয়ে হত্যা করার জন্য তার এক স্ত্রীকে বশ করেছিলেন মাবিয়াপুত্র এজিদ।

এ যুগের ইতিহাসে আসি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটেনকে প্রচারণার যুদ্ধে হারানোর জন্য হিটলার চার্চিল মন্ত্রিসভার সদস্য আমেরির পুত্র আমেরি জুনিয়রকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে দেশত্যাগ করিয়েছিলেন। আমেরি জুনিয়র বার্লিনে গিয়ে হিটলারের প্রচার সচিব গোয়েবলসের সঙ্গে মিলে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে প্রচার যুদ্ধ শুরু করেন। এই সময় ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন এমন সব গোপন রহস্য আমেরি জুনিয়র ফাঁস করেছিলেন যা ব্রিটেনকে বিপাকে ফেলেছিল। যুদ্ধশেষে আমেরিকে যখন বন্দি করা হয়, মন্ত্রীপুত্র হওয়া সত্ত্বেও তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করে নাৎসি যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তার বিচার ও দণ্ড হয়েছিল।

মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসেরকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য সিআইএ তার আপন ভগ্নিপতিকে বশ করেছিল। তিনি ছিলেন মিসরের সামরিক বাহিনীর একজন ফিল্ড মার্শাল। তিনি নাসেরের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার শুরু করেন। পশ্চিমা বিগ মিডিয়া তার সত্যাসত্য যাচাই না করেই ঢালাওভাবে প্রচার শুরু করে। মিসরের বিখ্যাত দৈনিক আল আহরামের তৎকালীন সম্পাদক মোহাম্মদ হাইকেল নাসেরের পক্ষে কলম ধরেন এবং পশ্চিমা মিডিয়ায় নাসেরবিরোধী উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা খণ্ডন করেন। নাসেরের মৃত্যুর পর হাইকেল লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় নাসেরের ওপর দীর্ঘ আলোচনা লিখে তার বিরুদ্ধে পশ্চিমা প্রচার মিথ্যা প্রমাণ করেছিলেন। নাসের তার ভগ্নিপতিকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার করে প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা করেছিলেন।

প্রসঙ্গক্রমে লিখছি, আশির দশকের গোড়ায় লন্ডনে মোহাম্মদ হাইকেলের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন, 'নাসেরের মতো তোমাদের মুজিবও পশ্চিমা দেশে একজন মিস-আন্ডারস্টুডম্যান। তাকে নানা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ায় জোর প্রোপাগান্ডা হয়েছে। তোমাদের উচিত এর প্রতিবাদ করে জোরালো লেখা। আমি নাসের সম্পর্কে সানডে টাইমসে লিখছি।'

হাইকেল ঠিকই বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই নানা মিথ্যা প্রচারণার শিকার হতে হয়েছে। অধ্যাপক শামসুল হক ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। তিনি অসুস্থতার জন্য ওই পদ ছেড়ে দিলে দলীয় নির্বাচনে খোন্দকার মোশতাককে হারিয়ে এবং মওলানা ভাসানীর মনোনয়নে শেখ মুজিব দলের সাধারণ সম্পাদক হতেই মোশতাক গ্রুপের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে চরিত্র হননের যে প্রচার চালানো হয়েছিল, তখনকার মুসলিম লীগপন্থি বাংলা দৈনিক আজাদ ও ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজ তা ফলাও করে প্রকাশ করেছিল।

শেখ মুজিব যখন তার ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করে কারাবন্দি হন, তখন তার বিরুদ্ধে আইয়ুব-মোনায়েম চক্র রাজনীতির মাঠে নামায় তারই চাচা সালাম খানকে। একদিকে সরকারি ও আধা সরকারি মিডিয়ায় (ট্রাস্ট পত্রিকা) শেখ মুজিবের রাজনৈতিক, এমনকি ব্যক্তিগত চরিত্রে কালিমা লেপন করে জোর প্রচারণা চালানো হয়, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পাল্টা আওয়ামী লীগ (পিডিএমপন্থি আওয়ামী লীগ নামে পরিচিত) গঠন করে ঘোষণা করা হয় শেখ মুজিবকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা প্রায় সকলেই সালাম খানকে সমর্থন জানান। এ সময় দলের তরুণ নেতারা (জেলা পর্যায়ের) শেখ মুজিবকে সমর্থন না দিলে তখনই তার রাজনৈতিক নীতি ও নেতৃত্ব ব্যর্থ হতো এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যেমন হতো না, তেমনি বাংলাদেশও স্বাধীন হতো না।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ১৯টি দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়েছিল। এক শ্রেণির মিডিয়া তা ফলাও করে প্রচার করেছিল। সবক'টি দুর্নীতির মামলা উচ্চ আদালতের বিচারে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিব ছিলেন দীর্ঘকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার চরিত্র হনন দ্বারা আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার বহু চেষ্টা হয়েছে। এ জন্য তার চাচা সালাম খানকে পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছিল। এ যুগে অর্থাৎ বর্তমান সময়েও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত চরিত্র ও রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস করার জন্য সম্প্রতি তার আপন ছোটভাই মির্জা আবদুল কাদেরকে মাঠে নামানো হয়েছে বলে মনে হয়।

প্রথমে মনে করেছিলাম, এটা পারিবারিক ঝগড়া। অনেক পরিবারেই এ ধরনের ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ থাকে। সম্ভবত এখানেও বড় ভাইয়ের সঙ্গে ছোট ভাইয়ের কোনো কারণে ঝগড়া হয়েছে, সেজন্যই ছোট ভাই তার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। নইলে এই বিরোধের পেছনে কোনো কারণ, কোনো রাজনৈতিক বিরোধ থাকতে পারে না। কেননা দুই ভাই-ই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। একজন বড় নেতা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আরেকজন উল্লেখযোগ্য নেতা নন। পৌরসভার মেয়র মাত্র।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই দেখলাম ছোট ভাই কাদের মির্জার বক্তব্য উগ্র ও অশালীন হয়ে উঠছে। তার মধ্যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গুরুতর প্রচারণা রয়েছে। বিএনপি যে অভিযোগগুলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে করে, তা আরও বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। সবচাইতে মনে খটকা জাগানো 'নিরপেক্ষ' নামে পরিচিত একই হাউসের একটি ইংরেজি ও বাংলা দৈনিকের ভূমিকা দেখে এক পত্রিকায় পৌরসভার মেয়র, যার বক্তৃতা বিবৃতি কোনো জাতীয় দৈনিকের শেষের পাতায় ছোট করে এক দিন বা দু'দিন ছাপা হতে পারে, সেই বক্তৃতা ও বিবৃতি রোজ প্রথম পাতায় দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা কোনো জাতীয় নেতার বক্তব্য যেখানে ছাপা হয়, সেখানে রোজ ফলাও করে ছাপা হচ্ছে। বস্তুত কাদের মির্জাকে জিরো থেকে হিরো বানিয়েছে এই দুটি মিডিয়াই। তাদের দেখাদেখি আরও দু-একটি কাগজ এই খবর ছেপেছে। তবে অত গুরুত্ব দিয়ে নয়।

গুড মিডিয়া অবশ্যই সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী। কিন্তু ব্যাড মিডিয়া যে দেশ এবং জনগণের কত ক্ষতি করতে পারে, তার উদাহরণ বিদেশে যেমন আছে, তেমনি বাংলাদেশেও আছে। কাদের মির্জা আওয়ামী লীগের লোক। কিন্তু তিনি নিজের ভাই ওবায়দুল কাদেরের রোজ চরিত্র হনন করে চলেছেন। আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যেসব গালি-নিন্দা খিস্তি-খেউড় চালাচ্ছেন, তা আওয়ামী লীগের অতীতের শত্রুরাই কেবল উচ্চারণ করতে পারেন। দুই দৈনিকের (ইংরেজি ও বাংলা) কাছ থেকে উৎসাহ ও প্রশ্রয় পেয়ে কাদের মির্জা রোজ এখন তার খিস্তি-খেউড় বাড়িয়েই চলেছেন।

'নিরপেক্ষ' দৈনিক দুটি তাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার প্রমাণ দিতে পারতো, যদি কাদের মির্জার খবর যতটুকু গুরুত্ব দিয়ে ছাপা দরকার, ততটুকু গুরুত্ব দিয়ে ছাপতো। তাকে সাংবাদিকতার নীতিমালা অগ্রাহ্য করে তিলকে তাল করে নিজেদের রাজনৈতিক অভীষ্ট সিদ্ধির মূলধনে পরিণত না করতো। সম্প্রতি কাদের মির্জা লন্ডন সফর করে গেছেন। তার সঙ্গে তারেক রহমানের দেখা-সাক্ষাতের গুজব বাজারে রয়েছে। এছাড়া একজন অখ্যাতনামা লোক হয়েও তিনি ক্ষমতাসীন দল, তার সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ডন কুইকাপাটের মতো হুংকার ছাড়ার, হুমকি দেওয়ার সাহস কোথায় পাচ্ছেন, কে বা কারা তাকে উৎসাহ ও অর্থ জোগাচ্ছে, সে সম্পর্কে কিছু তথ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কি 'নিরপেক্ষ' পত্রিকা দুটি করতে পারত না? আরও একটি প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ শক্তিশালী ক্ষমতাসীন দল। তাদের এক পুঁচকে কর্মী দলের বিরুদ্ধে ডান্ডা ঘোরাচ্ছেন, তা নিয়ে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড একেবারেই নীরব কেন? তার বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন কেন এখন পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে না? এও এক রহস্য।

[লন্ডন, ৭ মে শুক্রবার, ২০২১]

মন্তব্য করুন