দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে পর্যটন শিল্প। করোনার ভয়ংকর বাস্তবতায় সেই পর্যটন শিল্প এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। কর্মহীন হয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন পর্যটন সংশ্নিষ্ট মানুষেরা। গত বছরের মার্চের প্রথম দিকে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার কয়েকদিন পরই বন্ধ ঘোষণা করা হয় দেশের সব পর্যটন কেন্দ্র। প্রায় পাঁচ মাস পর ২২ আগস্ট থেকে আবার পর্যটন কেন্দ্রগুলো খুলতে শুরু করে। ঝিমিয়ে পড়া পর্যটন শিল্প প্রাণ ফিরে পায়। গেল শীত মৌসুমে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের ঢল নামে। অবরুদ্ধতার আড়মোড়া ভেঙে জাগতে থাকা পর্যটন শিল্প আবারও অসহায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সামনে। দেশে দ্বিতীয় দফায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ফের লোকসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত ২ এপ্রিল সমকালের এক প্রতিবেদনে প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের বরাতে বলা হয়েছে, গত এক বছরে পর্যটন শিল্পের সব খাত মিলিয়ে ক্ষতি হয়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ও এ খাতকে টিকিয়ে রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। বিশেষ করে সরকারি প্রণোদনা ও সহযোগিতা না পেলে পর্যটনে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের সংকটে পড়বেন। এ ছাড়া অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। এতে কর্মসংস্থান হারাবে লাখ লাখ মানুষ।

বিগত ১০ বছরে দেশের পর্যটন শিল্পকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছে অনলাইনভিক্তিক ট্রাভেল গ্রুপগুলো। একসময় মানুষ ভ্রমণের জন্য পর্যটননগরী কক্সবাজার, সিলেট, কুয়াকাটা, সুন্দরবন আর পাহাড়ি অল্প কিছু এলাকাকে বিবেচনা করতেন। কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় তরুণরা পর্যটনে নতুন এক ধারা নিয়ে এলো। 'অনলাইনভিত্তিক ট্রাভেল গ্রুপ' যেখান থেকে দল বেঁধে ঘুরতে যাওয়া হয়। আর মজার ব্যাপার হলো, মানুষ দেশের অনেক স্থান সম্পর্কে নতুন করে জানতে থাকল। কম খরচে দল বেঁধে এই ভ্রমণ দেশের পর্যটনকে গতানুগতিক ধারা থেকে বের করে নিয়ে আসে। আমরাও পর্যটন খাতকে নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হতে থাকলাম। অনেক মানুষের জীবন ও জীবিকায় পরিবর্তন এলো।

আক্ষেপের বিষয় হলো পর্যটন নিয়ে কাজ করা তরুণদের সংগঠিত করা কিংবা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করার উদ্যোগ তেমন নেওয়া হয়নি। করোনাকালে এই তরুণ উদ্যোক্তারা অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় কর্ম হারিয়েছেন এ খাত সংশ্নিষ্ট মানুষরা। ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, করোনা শুরুর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে পাঁচ লাখের বেশি বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসেছিল। করোনাকালে পুরো বছর শূন্য হয়ে পড়ে বিদেশি পর্যটক আসা। গত বছরের নভেম্বরের পর অভ্যন্তরীণ পর্যটনে কিছুটা চাঙ্গা ভাব দেখা দিলেও করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে দ্বিতীয় দফায় লকডাউন শুরু হওয়ায় আবার অনিশ্চয়তা তৈরি হলো এ খাতে। দুঃখজনক হলেও সত্যি ক্ষতিগ্রস্ত সব খাতের জন্য সরকার প্রণোদনা দিলেও কিছুই পায়নি পর্যটন শিল্প। ব্যাংকগুলো বলেছে, পর্যটন শিল্প ঝুঁকিপূর্ণ। ঋণ দিলে পরিশোধ করতে পারবে না। বাংলাদেশে পর্যটনকে একটি উদীয়মান শিল্প ধরে নেওয়া হয়। কয়েক বছর ধরে এ শিল্প হাঁটি হাঁটি, পা পা করে এগোচ্ছে। করোনাভাইরাসের আকস্মিক প্রাদুর্ভাবে খাতটি প্রায় ধ্বংসের পথে। পর্যটনে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে আমাদের সঠিক পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এর সঠিক রূপরেখা তৈরি করতে হবে। সরকারের সুদৃষ্টি, সহায়তা পারে এই শিল্পটিকে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ঐতিহাসিক মসজিদ ও মিনার, পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, অরণ্য প্রভৃতি। এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যে বিশেষায়িত। করোনার সব হতাশার মেঘ দূর করে অচিরেই সম্ভাবনার সূর্য উঁকি দেবে পর্যটনকে ঘিরে, এ প্রত্যাশা এখন সংশ্নিষ্ট সবার।

সাংবাদিক ও ভ্রমণবিষয়ক লেখক
Kibriabd10@gmail.com

মন্তব্য করুন