কিছুদিন আগে ব্রিস্টলের থানা ভাঙচুর করা হয়েছিল; পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। সবকিছুই ঘটেছিল পুলিশের সামনে। ইউটিউবে এর ভিডিও পাওয়া যায়; আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন। ব্রিস্টলে? সবচেয়ে সহিংস হলেও ব্রিটেনের নানা প্রান্তে ভীষণ শক্ত প্রতিবাদ হয় সমাবেশ-মিছিল ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে আরও বেশি ক্ষমতা দিয়ে আইন করার জন্য সংসদে বিল আনার জেরে।

সম্প্রতি বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপের নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিক অসন্তোষে পুলিশের গুলিতে পাঁচজন নিহত এবং আরও বেশ কিছু মানুষ আহত হয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র আরও প্রাণ নিয়েছে। ২০১৬ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির বিপক্ষে বিক্ষোভকারীদের ওপরে পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হয়। ২০১৭ সালেও বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ-বিপক্ষের মানুষের মধ্যে একটা সভায় গোলযোগ সৃষ্টি হলে হামলায় একজন নিহত হয়।

বাঁশখালীর ঘটনাটি ঠিক কী পরিস্থিতিতে ঘটেছিল তার মোটামুটি একটা ধারণা আমরা মিডিয়া থেকে পেয়েছি। মিডিয়ার রিপোর্ট থেকে জানা যায় রমজানে ঘণ্টাপ্রতি মজুরি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বাড়ানো, কর্মঘণ্টা কমানো এবং তাদের বাসস্থানের কিছু উন্নয়নের দাবি ছিল। খুব সাধারণভাবেই আমাদের মনে হয় দাবিগুলো একেবারেই নগণ্য এবং খুবই যৌক্তিক। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে এর জন্যই তাদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হয়। নানা মিডিয়া থেকে আমরা যতদূর জানতে পারি তাতেও এটা মনে হবার যথেষ্ট কারণ আছে- শ্রমিকরা খুব বেশি বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি না করলেও পুলিশ তাদের ওপরে হামলা করে। এরপর পরিস্থিতি যথেষ্ট ঘোলাটে হয়ে পড়ে এবং গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম অত্যন্ত অযৌক্তিক ও উদ্ভট দাবি তারা করেছে এবং শুরু থেকেই তারা চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি করেছে, তবুও কী যে ঘটনা ঘটেছে, সেরকম কিছু ঘটা কি অনিবার্য ছিল? বাঁশখালীর ঘটনায় চট্টগ্রাম জোনের ডিআইজি বিবিসিকে বলেন, পুলিশ সদস্যদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয় এবং প্রচুর ইটপাটকেল ছোড়া হয় তাদের দিকে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও এই রাষ্ট্রের সন্তান, তাই তারা অতি তুচ্ছ পরিস্থিতিতে গুলি করে মানুষ মেরে ফেলেছেন, তেমন কোনো পূর্বানুমান আমি রাখি না। কিন্তু তারপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকে, এসব গুলিবর্ষণ অনিবার্য ছিল কি?

পুলিশ সেনাবাহিনী নয়। হাতে অস্ত্র থাকলেও পুলিশ একটা 'সিভিল' বাহিনী। সেই কারণেই সারাবিশ্বে পুলিশ বাহিনীর বিশেষায়িত কোনো বিভাগের হাতে অনেক বেশি সক্ষম অস্ত্র থাকলেও সাধারণ পুলিশ বাহিনীর হাতের অস্ত্র থাকে অনেক কম সক্ষমতার। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ পুলিশের হাতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্রই থাকে না, থাকে লাঠি। শুধু একটি লাঠি হাতে টহল দেওয়া পুলিশ দেখার জন্য ব্রিটেনের কথা বললে অনেকেই সেটি নিয়ে পরিহাস করবেন এটা বলে- বাংলাদেশের মতো আইন না মানা একটা জাতির পুলিশের পক্ষে সেটি সম্ভব নয়। তাহলে তাদের বলছি ভারতকে দেখতে, আমাদের একেবারেই কাছাকাছি মানসিকতার একটি দেশেও বহু পুলিশ সাধারণ টহল লাঠি হাতেই দেয়।

ট্রাফিক পুলিশ ছাড়া আমাদের দেশে আগ্নেয়াস্ত্রহীন পুলিশ দেখা যায় না। নূ্যনতম একটা শটগান থাকে পুলিশের হাতে। তাও সেই সংখ্যাটা খুব অল্প। সাধারণ পুলিশের কাছে এই মুহূর্তে যে অস্ত্রটি দেখা যায় সেটিকে সাধারণভাবে আমরা চিনি চায়নিজ রাইফেল হিসেবে (চায়নিজ এসকেএস টাইপ ৫৬)। অর্থাৎ বাংলাদেশ পুলিশ এখন গণহারে এমন একটি অস্ত্র ব্যবহার করছে যার সক্ষমতা মিলিটারি-গ্রেডের। শুধু সেটিই না, সাধারণ টহলের সময়ও কখনও কখনও দুই-একজন পুলিশের হাতে একে-৪৭ কালাশনিকভ শ্রেণির অস্ত্র দেখা যায়। আমি আবারও স্পষ্ট করছি এই অস্ত্রের কথা বলা হচ্ছে সাধারণ পুলিশের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত পুলিশ যেমন এবিপিএন, এসবিপিএন, র‌্যাব, সোয়াট ইত্যাদিকে বাদ রেখে। বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের হাতে বেশি সক্ষমতার অস্ত্র থাকতেই পারে।

পুলিশের এখনকার প্রধান অস্ত্র চায়নিজ রাইফেল বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিও ব্যবহার করে। অর্থাৎ সীমান্তে যে কোনো সময় যুদ্ধাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা মাথায় রাখা এবং সেটি মোকাবিলায় সদা প্রস্তুত থাকা একটি আধা সামরিক বাহিনীকে যে অস্ত্র দেওয়া হয়েছে সেই একই অস্ত্র একেবারে সাধারণ পুলিশের হাতে থাকে কীভাবে? বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য কয়েকজনের হাতে এই ধরনের অস্ত্র থাকলেও সব পুলিশের হাতে একই অস্ত্র থাকা কী মানে বহন করে? পুলিশ সম্পর্কে একেবারে বেসিক ধারণা থাকা মানুষও জানে এই বাহিনীর হাতের অস্ত্র তো আসলে মানুষকে হত্যা করার জন্য দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় এক ধরনের ডেটারেন্স হিসেবে- বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং আইন ভঙ্গকারীদের মনে আগাম ভীতি তৈরি করার জন্য।

অস্ত্রের ধরন নিয়ে এত কথা কেন? আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি পুলিশের হাতে কোন ধরনের অস্ত্র আছে সেটি অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের আচরণ নির্ধারণ করে। আপনি যদি এমন একটি অস্ত্র বহন করেন, যেটির গুলি ৫০০ মিটারের মধ্যে যে কোনো লক্ষ্যকে সঠিকভাবে ভেদ করতে পারে (এফেক্টিভ রেঞ্জ) আর পৌঁছতে পারে দুই কিলোমিটার দূর পর্যন্ত, তাহলে একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবিলার বিকল্প অনেক কিছুই আপনার মাথায় কাজ না করারই কথা। এছাড়া দূরপাল্লার এই অস্ত্র ঝুঁকি তৈরি করবে গোলযোগের বাইরে থাকা অনেক দূরের মানুষের জন্যও। তাহলে প্রশ্ন থাকবেই, অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটা দেশের পুলিশের হাতে গণহারে এমন যুদ্ধোপযোগী অস্ত্র তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্য আসলে কী? সারাবিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতও যখন একেবারেই নন-লেথাল টেজার গান (উচ্চমাত্রায় বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে কাউকে স্বল্প সময়ের জন্য পুরোপুরি নিষ্ফ্ক্রিয় করে ফেলার অস্ত্র) ব্যবহার করছে, সেখানে আমাদের পুলিশের আইজি কেন আরও শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহারের আহ্বান জানান?

ব্রিস্টলের থানায় হামলা এবং পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো উদাহরণ ব্রিটেন কিংবা পশ্চিমা উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে একেবারে কম নয়। এমনকি সভ্য-সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রেও ভয়ংকর গোলযোগ লেগে যেতে পারে। কিন্তু ব্রিস্টল নিয়ে যে কেউ খোঁজ নিলে দেখবেন সেই ভয়ংকর পরিস্থিতিতেই পুলিশ ঢাল দিয়ে মানুষকে ঠেকানোর চেষ্টা করেছে, গুলি করা দূরে থাকুক। এমনকি সেই ঘটনার পর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন বেশ কিছু পুলিশ সদস্য, সাধারণ ভাংচুর-অগ্নিসংযোগকারী নাগরিকরা নয়। অথচ এ রকম একটা পরিস্থিতি আমাদের দেশের পুলিশ গুলি করে মানুষ মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ বলে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। ব্রিস্টলের ঘটনা প্রমাণ করে সম্প্রতি আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া বাঁশখালীর ঘটনায় আরও অনেক কম ক্ষয়ক্ষতি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত।

এই ঘটনায় গুলিতে বেশকিছু মানুষ মারা যাওয়া এবং সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে পদক্ষেপ না নেওয়া ভবিষ্যতে পুলিশকে এই ধরনের পরিস্থিতির প্রতি গা-সওয়া করে তুলতে পারে; পুলিশ হয়ে উঠতে পারে আরও বেশি 'গুলিতে স্বচ্ছন্দ' (ট্রিগার-হ্যাপি)। এই রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে পুলিশকে অনেক বেশি 'ট্রিগার-হ্যাপি' হয়ে উঠতে দেখার চাইতে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা খুব বেশি কিছু নেই।

পাদটীকা: যে বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য, আইন প্রয়োগ করার জন্য মারাত্মক মারণাস্ত্র ব্যবহার করে, সেই বাহিনীর 'মনের খবর'ও আমাদের জানা উচিত। পুলিশ বাহিনীর সাধারণ সদস্যদের কাজের পরিবেশ, বসবাসের পরিবেশ, কর্মঘণ্টা, ছুটি না পাওয়া, কাজের ভয়ংকর চাপ এগুলো তাদের মধ্যে প্রচণ্ড স্ট্রেস এবং অবদমন তৈরি করে, যেটা হয়তো তাদের এই ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক দ্রুত ধৈর্য হারিয়ে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি করে। এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ এক আলোচনা; যা করা যাবে আরেকদিন।

শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

মন্তব্য করুন