প্রয়াত রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন- বাংলাদেশ রেলওয়ের 'কালো বিড়াল' তিনি তাড়াবেন। 'কালো বিড়াল' বলতে তিনি দুর্নীতিবাজদের বুঝিয়েছিলেন। এই 'কালো বিড়াল' শুধু রেলওয়েতেই নয়; দেশে প্রায় সব খাত-অধিদপ্তর-দপ্তর কিংবা বিভাগেই কমবেশি আছে। ওদের নখরাঘাতে সব সম্ভাবনা ছিন্নভিন্ন; 'খাই খাই' থাবায় রাষ্ট্রীয় অর্থের নাশ ঘটেই চলেছে। ওরা নিজেদের উদরপূর্তি করছে একের পর এক বিস্ময় আর প্রশ্নের জন্ম দিয়ে। দেশের অন্যতম জরুরি সেবা খাত স্বাস্থ্য বিভাগে ওদের দোর্দণ্ড প্রতাপ বা শক্তির উৎস কোথায়, তা যেন এক অন্তহীন প্রশ্ন। করোনা দুর্যোগেও তাদের দুস্কর্মের খতিয়ান ক্রমেই দীর্ঘ হয়ে চলেছে।

'কালো বিড়াল' এ দেশে ক্ষণে ক্ষণে জন্মে; বেড়ে ওঠে সুশীতল ছায়াতলে। ক'দিন আগে একটি দৈনিকের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ, গত বছর দেশের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী তুলনামূলক কম থাকলেও ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষার প্রধান উপকরণ টেস্টিং কিট কেনার হিড়িক ছিল। হাসপাতালগুলো থেকে হাজার হাজার ডেঙ্গু কিট গায়েব হয়ে গেছে! এবারও ডেঙ্গু মৌসুম সামনে রেখে চলছে কিট কেনার প্রস্তুতি! ৮ মে সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ, করোনার নমুনা পরীক্ষার নামে অবাধ বাণিজ্য চলছে। বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে এই রমরমা কাণ্ড। আমাদের স্মরণে আছে, গত বছর করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতি যখন সার্বিকভাবে নাজুকতা সৃষ্টি করেছিল, তখন রিজেন্ট গ্রুপের চিকিৎসাকেন্দ্রের কর্ণধার মো. সাহেদ বিদেশগামীদের করোনা পরীক্ষার নামে কী ভয়াবহ প্রতারণা-জালিয়াতি করেছিল! তার একের পর এক বহুমুখী দুর্নীতির নগ্ন চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসতে লাগল। এই সাহেদের সখ্য ছিল বলবানদের সঙ্গে। সাহেদের দুস্কর্মের খতিয়ান যখন সংবাদমাধ্যমে ভারী হয়ে উঠল, তখন এর প্রতিকারে সরকারের সংশ্নিষ্ট মহলগুলো নড়েচড়ে উঠল।

সাহেদ এখন কারাগারে। তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে করা মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা কী অথবা এর ভবিষ্যৎই বা কী, এসব ভবিতব্য। এ রকম একজন-দু'জন সাহেদ ধরা পড়লেও অনেক সাহেদ কিন্তু দুস্কর্মের জটাজাল সৃষ্টিতে নিষ্ফ্ক্রিয় নয়। স্বাস্থ্য খাত বরাবরই দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে বিগত কয়েক বছর ধরেই অন্যতম শীর্ষ খাত হিসেবে পর্যালোচিত। চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি ও শিক্ষার অধিকার সংবিধানবদ্ধ মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম হলেও, এ দু'খাতেরই দুর্নীতির মচ্ছব বহুবার সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। আগে তো বটেই, করোনা দুর্যোগে স্বাস্থ্য খাতের 'কালো বিড়াল'রা আরও বেশি বেপরোয়া। স্বাস্থ্য বিভাগের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিদায়ও ঘটেছিল এ কারণে।

মনে পড়ছে, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের 'পাতালে হাসপাতালে' গল্পটি। এ গল্পের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আমাদের অনেক বাস্তব চিত্রেরই ব্যাপক মিল রয়েছে। ষাট থেকে আশির দশকের সমাজের ক্ষয়, মানুষের ক্ষয়, যন্ত্রণা-নিষ্পেষণ তার এ গল্পে উঠে এসেছে। জীবনের গায়ে একদিকে নিপীড়নের দগদগে ক্ষত, অন্যদিকে বলবানদের স্বেচ্ছাচারিতা তার ওই গল্পে দাগ কেটেছে অক্ষরে অক্ষরে। রক্তমূল্যে স্বাধীনতা অর্জনের পরও আমাদের দেশে বলবান চক্রের ক্ষমতা, অর্থের দাপট আর সরকারের দায়িত্বশীলদের অপকর্ম বাস্তবতার নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। একই সঙ্গে বিত্তের দ্বন্দ্ব, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়, চারিত্রিক সমস্যার প্রকটতা ইত্যাদি নেতিবাচকতা আমাদের সমাজদেহে ক্ষত সৃষ্টি করে চলেছে। 'পাতালে হাসপতালে' গল্পে আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগের যে চিত্র পরিস্ম্ফুটিত, তা যেন আজও এ সমাজের কদর্যের সাক্ষ্যবহ।

এ নিয়ে কোনো সংশয় থাকার কথা নয়; অনিয়ম-দুর্নীতির হোতারা বটবৃক্ষের ছায়াতলেই থাকে। তা না হলে এতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। হয়তো অনেকেরই স্মরণে আছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ১১টি উৎস চিহ্নিত করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাতিষ্ঠানিক টিম। দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশও করেছিল ওই টিম। দেশের হাসপাতালগুলোর যন্ত্রপাতি ক্রয়, ওষুধ সরবরাহ, ডাক্তার-কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে কী নৈরাজ্য হচ্ছে তা-ই তুলে ধরা হয়েছিল ওই প্রতিবেদনে। তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, 'দুদকের প্রতিবেদনে কী আছে তা পড়ে দেখব। তবে এটুকু বলতে পারি, আগামী দিনগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে। দুর্নাম যেগুলো আছে, তা ঘুচবে।' আরও অনেক প্রতিশ্রুতিই তিনি দিয়েছিলেন। কিন্তু দু'বছরেরও বেশি সময় পর এ খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র যেভাবে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে, তাতে মন্ত্রী অসন্তুষ্ট হলেও এ কথাই বলতে হচ্ছে, যদি অনিয়ম-দুর্নীতির 'লঘু' প্রতিকারও হতো, তাহলে কি আজও সংবাদমাধ্যমের খোরাক জোগাত এই খাত?

'কালো বিড়াল'-এর সংখ্যা তো নগণ্য নয়; অগণ্য। একটি কার্যকর ও জনবান্ধব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যাধি যতদূর ছড়িয়েছে, ঠিক ততদূরই অস্ত্রোপচারের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি হলেও তা হয়নি। যদি হতো তাহলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আবদুল মালেকের মতো অনেকেরই ফুলেফেঁপে ওঠা, ঢাকায় বহুতল বাড়ি-গাড়িসহ কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। স্বাস্থ্য খাতে 'কালো বিড়াল'দের দৌরাত্ম্য থামছেই না। সরকারের নীতিনির্ধারকরা স্বাস্থ্য খাতকে যতই সফল দাবি করুন; এর পরতে পরতে দুর্নীতি-অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা জেঁকে বসেছে।

আবদুল মালেকরা হলো নিমজ্জিত হিমশৈলীর চূড়ামাত্র। শুধু 'চুনোপুঁটি'দের দিকে হাত বাড়িয়ে, 'মুঘলে আজম'দের স্পর্শ না করে কি সুফল মিলবে? এই 'কালো বিড়াল'গুলোর খুঁটির জোর যেখানে, সেখানে হাত পড়ছে কি? রথী-মহারথীরা অস্পর্শিতই থেকে যাবে? হাসপাতালের ওষুধ, যন্ত্রপাতি চুরি, রোগীর খাদ্য বরাদ্দে রাক্ষুসে থাবা তো চলছেই। দুর্নীতিবাজদের ঈগল দৃষ্টি কেনাকাটাসহ বদলি, নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ইত্যাদির দিকে। 'সিন্ডিকেট'-এর থাবা থেকে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য খাতের কোনো প্রতিষ্ঠানই মুক্ত কিংবা নিরাপদ নয়। ডেঙ্গু কিট নিয়ে কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপের সন্ধান মিলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে- স্বাস্থ্য খাতে 'কালো বিড়াল'-এর এমন দৌরাত্ম্য কি চলতেই থাকবে?

শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিষ্ঠা, অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, দেশ-জাতির কল্যাণে আন্তরিক প্রয়াস, নির্মোহ অবস্থানই কি দেশ-সমাজকে রাহুগ্রাসমুক্ত করতে পারবে; যদি তার সহযোগী সব শক্তির অবস্থান একই না হয়? আমাদের দেশে সাদা বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধারই লোকের অভাব। 'কালো বিড়াল' তো আরও অধরা। কারণ 'কালো বিড়াল'দের ঘাড়ে অনেক মাথা। এদের সমূলে উৎপাটন না করে কীভাবে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব? সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান দুষ্টচক্রের ছায়া সরাতেই হবে। দূর হ আপদ!

সাংবাদিক ও লেখক

deba_bishnu@yahoo.com

মন্তব্য করুন