চিকিৎসা পেশার লোকজন মানুষের নাড়ির খবর রাখেন। আক্ষরিক অর্থে একজন চিকিৎসক যখন রোগীর নাড়ির গতি (পালস্‌) দেখার জন্য হাতের কবজির কিঞ্চিত উপরে স্পর্শ করেন তখনই বোঝেন নাড়ির গতি। আর এ গতি দেখেই রোগীর ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে তা আঁচ করতে পারেন। আগের যুগের ডাক্তার, বৈদ্য কবিরাজরা নাড়ির গতি আর জিহ্বার শুস্কতা বা আর্দ্রতা ও চোখের পাতা টেনে তার রং রেখেই চিকিৎসাকর্ম চালাতেন। এতে করে রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের মধ্যে একধরনের নৈকট্য তৈরি হতো। পরস্পরের আস্থার জায়গা হতো মজবুত। এখন অবস্থা একেবারে ভিন্ন। রোগ নির্ণয়ের অজস্র 'ডিভাইস', যান্ত্রিক কলাকৌশল প্রযুক্তির বিভিন্ন প্রয়োগ, চিকিৎসা যেমন সহজ করেছে, তেমনি সংকুচিত হয়ে এসেছে রোগী-ডাক্তার পারস্পরিক আস্থার জায়গা। টেলিমেডিসিন, ভার্চুয়াল চিকিৎসা, হোয়াটস আপ যা-ই বলি না কেন, কোথায় যেন একটি অতৃপ্তি থেকে যায় রোগী-চিকিৎসক দুই পক্ষেরই।

ডাক্তার বাড়িতে বসে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইলে রোগীর কথা শুনে, চেহারা দেখে চিকিৎসাপত্র দেন। এতে করে রোগী-ডাক্তার সরাসরি কথা স্পর্শ আশ্বাস, বিশ্বাস সব কিছুতেই রয়ে যায় দোলাচল। চিকিৎসার এই ধরন-ধারণ অতিমারি করোনার কারণে অনেক ব্যাপকতা লাভ করেছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে নিজেদের নিরাপদ রেখে চিকিৎসকরা যা করছেন, তা সময়ের প্রয়োজনে 'যথেষ্ট'। একদম হাত-পা গুটিয়ে বসে না থেকে তারা যে মুখের কথাটা রোগীকে শোনাতে পারছেন, ওষুধ-পথ্যের নির্দেশনা দিচ্ছেন তা অবশ্যই প্রয়োজনীয় ও প্রশংসনীয়। প্রথিতযশা, স্বনামধন্য একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আমার সামনেই সদ্য বিএসএমএমইউ থেকে অবসরপ্রাপ্ত একজন শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞকে বলছিলেন, যেভাবে 'দূর চিকিৎসা' পদ্ধতিতে কাজ করছেন, এতে সত্যিকারে ডাক্তারি হয় না। ফি-ও তো কম নেন না। অন্তত ফি-টা কম নেন। মানুষের এই সংকটকালে যত মানবিক হওয়া যায়, ততই মঙ্গল।

জীবনের ভয় কার না আছে। সবাই বাঁচতে চায় এই সুন্দর ভুবনে মানুষের মাঝে। এই মানুষই যদি না থাকে, তাহলে কাদের নিয়ে বেঁচে থাকা। বৃক্ষ-লতা-গুল্ম-ফুল-পাতা, দীঘি-নদী-নালা, হ্রদ সমুদ্র পর্বতমালা- এ সবকিছুই নিজ নিজ সৌন্দর্যের পেখম মেলে পৃথিবী আলোকিত করবে আর 'মানুষ' চলে যাবে অনন্তলোকে তা কি হয়! আর হয় না বলেই মানুষ বাঁচানোর দায় কাঁধে নিয়ে এই ঘোর অন্ধাকার দুর্দিনে মাঠে নামতে হয়েছে চিকিৎসকদের। তারা মাঠে আছেন, থাকবেনও। তাদের সঙ্গে আরও আছেন স্বাস্থ্য সেবার অন্যান্য স্তরের কর্মী বাহিনী। তারা প্রত্যক্ষ করোনাযোদ্ধা। এদের স্যালুট, হাজারো অভিবাদন। এদের কাজেকর্মে উৎসাহিত করা অতি আবশ্যক। হায়-হুতাশ! কোথায় সে উদ্যোগ। সরকারি-বেসরকারি সব তরফই নীরব। ভারতে নরেন্দ্র মোদি সরকার করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় বেশ কিছুদিন সন্ধ্যা লগ্নে শঙ্খ বাজিয়ে, উলুধ্বনি দিয়ে, কাঁসা-পিতলের বাদ্য-বাজনায় করোনা চিকিৎসায় নিবেদিত ডাক্তার ও অন্যদের উৎসাহিত করতে নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করেছেন।

ইতালিতেও ঘরবন্দি লোকজন নেচে-গেয়ে, হাততালি দিয়ে অভিনন্দিত করেছেন করোনা যোদ্ধা স্বাস্থ্যকর্মীদের। এবারের করোনা দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতের জেরবার অবস্থার মধ্যেও হেলিকপ্টার থেকে ফুল ছিটিয়ে করোনা যোদ্ধাদের সম্মানিত করা হয়েছে। আমাদের দেশে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী গত ২৭ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎপেশার লোকজনকে কেউ তাদের কাজের জন্য অভিনন্দিত করেন না বলে আক্ষেপ করেছেন। করোনা মহামারির দেড় বছরে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন ১৫৫ জন চিকিৎসক। এছাড়া দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মারা গেছেন ১২ জন নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। এ পরিসংখ্যান ডাক্তারদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) দেওয়া। এই মুহূর্তে করোনার ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডাক্তার নার্সসহ যেসব স্বাস্থ্যকর্মী করোনা চিকিৎসায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন, তাদের এই কর্মে স্বতঃস্ম্ফূর্ততা, উদ্দীপনা আনার তাগিদ অনুভব করছেন না কেউই। করোনাকালে এটি একটি করুন বিষয়।

উপ-পরিচালক ডাইরেক্টর, সেন্ট্রাল হসপিটাল লি.,
ধানমণ্ডি, ঢাকা

মন্তব্য করুন