স্বাধীনতার আগে যে নীতিমালায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হতো তা কালো আইন হিসেবে পরিচিত ছিল। আইনটি বিলুপ্ত করে ১৯৭৩ সালে প্রণয়ন করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নতুন নীতিমালা, যেটি ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ নামে পরিচিত। এই নীতিমালার অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের চার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে বিবেক ও যুক্তির শক্তিতে মুক্তির পথ সন্ধান করাই ছিল জাতির পিতার এই মহান প্রয়াসের নির্যাস। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ভাবধারার আমলাতন্ত্রকে আমূল পাল্টাতে চেয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৯ জুন বঙ্গভবনে বঙ্গবন্ধু দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, 'যে সিস্টেম আজ আমরা দেখি, সেই সিস্টেম ব্রিটিশ কলোনিয়াল সিস্টেম। ব্রিটিশ সিস্টেম করে গিয়েছিল বা যেটা আমাদের দেশে চলছিল অর্থাৎ উপনিবেশবাদীরা দেশকে শোষণ করার জন্য যে সিস্টেম দেশের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মধ্যে চালু করে গিয়েছিল, সেই অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সেই সিস্টেম, সেই আইন, সেই সব কিছু পরিবর্তন করার নামই বিপ্লব।' ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ভাবধারার আমলাতন্ত্র পাল্টানোর মাধ্যমে জাতির পিতা দ্বিতীয় বিপ্লব সংঘটিত করার মহান প্রয়াস পেয়েছিলেন। কিন্তু জনবিরোধী অপশক্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতাসহ পরিবারের প্রায় সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

জাতির পিতার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেদিন বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে প্রত্যাবর্তনের পর অনেক লড়াই-সংগ্রাম করে সামরিক শাসনের কবল থেকে জাতিকে মুক্ত করে গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠিত করেন। আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্টেম্নর সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হওয়ার পথে, সে সময় একজন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিবকে বঙ্গমাতার নামে নামকরণকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ প্রদান জাতির পিতার উচ্চশিক্ষাভাবনার পরিপন্থি হলো কিনা সেটি বিশ্নেষণের যথেষ্ট অবকাশ রাখে।

আমরা মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক এবং প্রশাসনিক নেতৃত্বে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই যথোপযুক্ত পক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এবং শিক্ষা কার্যক্রম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু আমলাতান্ত্রিক কর্মক্ষেত্র নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চরিত্র শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামোগত নানাবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দকে সঠিক পথে পরিচালনার কাজে তথা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র শিক্ষকরাই উপযুক্ত ব্যক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য হলো গবেষণালব্ধ শিক্ষা বিতরণ। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় সৃজনশীল কর্মতৎপরতার প্রধান উৎস। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর যেন অসীম আকাশের চেয়েও বড়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আগামী দিনের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, আমলা, কবি, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ সব তৈরি হয়। আজকাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিজ্ঞান অনুষদেও ইতিহাস, বাংলাদেশ স্টাডিজ পড়ানো হয়। রাষ্ট্র ও জাতি গঠনে অবদান রাখতে সক্ষম মানুষের জন্ম হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এমন একটি বৈচিত্র্যময় প্রতিষ্ঠানে একজন আমলাকে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া কি বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ?

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বা আর্থিক ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে একাডেমিক প্রোগ্রামগুলোর তাত্ত্বিক, বাস্তবিক ডিজাইন প্রণয়ন ও অধিকতর উন্নয়নের কৌশল বা গবেষণার খাত বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না রেখে শুধু আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ-দক্ষতা দিয়ে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। আমলারা খুব 'দক্ষ' প্রশাসক, এরকম কথা আজকাল নানা মহল থেকে বলার চেষ্টা করা হয়। যারা বাজেট বরাদ্দ দেন তাদের কাছে সবিনয় প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা-প্রশিক্ষণ বাবদ রাষ্ট্র কতটুকু অর্থ বরাদ্দ করে? দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা বসার কক্ষ পর্যন্ত পান না। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা নেই। এমনকি পর্যাপ্ত ক্লাসরুম পর্যন্ত নেই। শিক্ষার্থীরা হলে যে অমানবিক অবস্থায় থাকে সেখানে মাথা হেঁট হয়ে আসে আমাদের। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সামনে শুধু বিসিএসভিত্তিক চাকরিকেই আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে অত্যন্ত কৌশলে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীরা বিসিএসের গাইড মুখস্থ করে। কারণ তাদের এটা জানতে এবং মানতে বাধ্য করা হচ্ছে যে, এদেশে শুধু বিসিএস ক্যাডারদের সম্মান এবং চাকরির নিশ্চয়তা আছে। সব মিলে একটা বন্ধ্যা, মূক ও বধির সমাজ সৃষ্টির সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের একটা আলোকিত অংশ স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে সৃষ্টিশীলতাকে আঁকড়ে ধরে আছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখনও বর্ণিল এবং সজীব রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশালত্ব এবং তার অভিভাবকত্বকে ধারণ করতে পারেন শুধু একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকই, আর কেউ নন। এক্ষেত্রে জাতির পিতার উচ্চশিক্ষা ভাবনা আমাদের জন্য পাথেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে বঙ্গবন্ধু কতখানি আন্তরিক ছিলেন সেটি একটি ঘটনা বললে পরিস্কার হবে। প্রয়াত এইচ টি ইমাম তার 'বাংলাদেশ সরকার, ১৯৭১-১৯৭৫' গ্রন্থে লিখেছেন- '১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ প্রিলিমিনারি ক্লাসের শিক্ষার্থীগণ অটো প্রমোশনের দাবিতে উপাচার্য, বিভাগীয় প্রধান, ডিন, প্রভোস্ট, প্রক্টর প্রমুখকে প্রায় ছয় ঘণ্টা ঘেরাও করে রেখেছিল। উপাচার্যের কক্ষে অটো প্রমোশন প্রশ্নে তখন এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছিল। বঙ্গবন্ধু ঘেরাও পরিস্থিতির কথা অবগত হওয়ামাত্র অকুস্থলে ছুটে যান এবং বিকেলের মধ্যেই ঘেরাওকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্ধার করেন। শিক্ষকদের প্রতি এই অসৌজন্যমূলক আচরণ প্রদর্শন করায় তিনি ঘেরাওকারীদের প্রতি খুবই বিরক্ত হন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জাতির জনক তাদের উদ্দেশে বলেন, আমি ছাত্রজীবনে ছাত্ররাজনীতি করেছি। কিন্তু আমি কখনও এ রকম অসদাচরণ করিনি।' (ইমাম :২০১৩ :২৮৯)।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের শিক্ষা খাত নিয়ে বলা হয়েছিল, মোট দেশজ উৎপাদনের চার ভাগ এই খাতে নিয়োজিত করতে হবে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও কি এই দাবি বাস্তবায়িত হয়েছে? বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ও আহ্বানে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধের পরে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতেও আমরা দেখছি জাতির পিতার আদর্শ বাস্তবায়িত হয়নি। যে আমলাতন্ত্রকে তিনি বদলাতে চেয়েছিলেন সেই আমলাতন্ত্রই ক্রমশ জেঁকে বসছে সব কিছুর ওপর। বিশেষ করে গত ১২ বছর যখন বঙ্গবন্ধুর দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তখন কি এই আশা কেন দুরাশায় রূপান্তরিত হবে? বাংলাদেশ সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও উল্লেখ আছে জিডিপির অন্তত ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখার। কিন্তু শিক্ষা খাতের এই আর্থিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণে যখন বাংলাদেশ করোনার মতো মহামারি মোকাবিলায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জীবন ও জীবিকার সংগ্রামে সফল হতে চলেছে, তখন একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলাকে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হলো। জাতির পিতার রাজনৈতিক আদর্শ এবং উচ্চ শিক্ষাভাবনার সঙ্গে বেমানান এই সিদ্ধান্ত দেশের উচ্চশিক্ষার মেধা, যুক্তি ও সৃজনশীলতাভিত্তিক প্রগতিশীল পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করবে বলেই আশঙ্কা। সংগত কারণে আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করছি। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব স্তরে শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার সকল পদে শিক্ষকদের পদায়ন আইন করে নিশ্চিত করার দাবি জানাই।

সভাপতি, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন