প্রতি বছরের মতো আবারও ফিরে এসেছে খুশির ঈদ। সারা বছরের ১২টি মাস অর্থাৎ ৩৬৫ দিনের দৈনন্দিন ব্যস্ততা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-কষ্ট দূরে সরিয়ে রেখে ঈদ আসছে নির্মল আনন্দের বার্তা নিয়ে। এই আনন্দ উৎসবে থাকে পরম তৃপ্তি, যেমন জাগতিক তেমন পারলৌকিক। আজকের বস্তুতান্ত্রিক যুগে মানুষ ধর্মীয়বোধ ও বিশ্বাস থেকে নিজেদের অনেকটা দূরে সরিয়ে রাখলেও ধর্মের প্রতি একটা টান চিরকালীনভাবে রক্তের মধ্যে থেকে গেছে। তাই মানুষ একদিকে যেমন নিছক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার মতো সময় করে উঠতে পারে না জাগতিক নানা প্রয়োজনের তাগিদে, তেমনি অন্যদিকে সামাজিক নানা উৎসব আয়োজনেও স্বতঃস্টম্ফূর্তভাবে শরিক হতে পারে না সময় ও সুযোগের অভাবে। ঈদের আনন্দ মানুষের কাছে জাগতিক ও পারলৌকিক বিষয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেয়।

এই খুশির উৎসব সর্বজনীন। আবালবৃদ্ধবনিতা, ধনী-গরিব, উচ্চ-নীচ, নারী-পুরুষ, সাধু-ভণ্ড, বিদ্বান-মূর্খ সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য এই উৎসব। সব ধরনের ভেদাভেদ ভুলে একই ধর্মীয় আকাশের ছত্রছায়ায় সমবেত হয়ে বাঁধভাঙা খুশির হাওয়ায় এই উৎসব উদযাপিত হয়। পরস্পরের গলাগলি, সালাম-মোছাফাহ, পানাহার নতুন কাপড়, আতর-সুরমা ইত্যাদি সমবায়ে ঈদ নামক একটি দিন মানুষের সামনে এসে হাজির হয়।

'ঈদ' শব্দটার মধ্যেই ছড়িয়ে আছে খুশির আমেজ। কিন্তু গণতান্ত্রিকভাবে সবার জন্য খুশির সন্দেশ নিয়ে আসে না। সেদিকে একটু লক্ষ্য করে দেখা যাক। প্রথমেই ধরা যাক, পারলৌকিক দিকটা। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর সব ধরনের পাপ থেকে মুক্তি লাভ করার বাসনায় সেই মুক্তি আনন্দে শামিল হতে মানুষ ঈদগাহের ময়দানে হাজির হয়। বিধান মতে, বলা আছে রমজান মাসে করুণাময় আল্লাহ তার পাপী বান্দাকে পাপ থেকে মুক্তি দেন এই দিনের সকালে।

পুণ্যার্থীদের কাছে এর চেয়ে খুশির, আনন্দের সংবাদ আর কী হতে পারে। কিন্তু যারা এদিনও করুণাময়ের কাছ থেকে করুণা আদায় করে নিতে পারে না, তাদের অবস্থা সঙ্গীণ। যারা ধর্মবিশ্বাসী নয়, তাদের কথা ছেড়েই দিলাম, কিন্তু যারা ধর্ম বিশ্বাসী তাদের কথা কি কেউ ভাবে? ধর্মবিশ্বাসী হয়েও সামান্য খামখেয়ালি, অসতর্কতা, সঠিক জ্ঞানের অভাবে এ রকম একটা রহমতের দিনেও তাদের আল্লাহতায়ালার অপার রহমত থেকে বঞ্চিত করে রাখে। যারা নিজেদের পরম ধার্মিক ভাবেন, ধর্ম-কর্ম নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকেন, তাদের ওপর কি এই দায় বর্তায় না এদের কাছে সঠিক পথের সন্ধান তুলে ধরতে?

অন্যদিকে, জাগতিক দিক থেকে অনেকেই আবার এই আনন্দ উৎসবে শামিল হতে পারে না। এ কথা কি একটি বারও কারও মনে পড়ে। যাদের 'নুন আনতে পান্তা ফুরায়' তারা প্রতিবেশী ছেলেমেয়েদের গায়ে নতুন জামা-জুতা, নানা প্রসাধন সামগ্রী ইত্যাদি দেখে আহত হন, তাদের কচিকাঁচাদের যখন তারা কিছুই দিতে পারেন না, অথচ এগুলো পাওয়ার আব্দার যখন গরিব ঘরের শিশুরা তার অভিভাবকের কাছে জানায়, তখন তাদের করুণ মুখ কি কারও দৃষ্টিগোচর হয়?

যে দেশের ষাট থেকে সত্তর শতাংশ মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত, দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে কোটি কোটি মানুষ। রোগ-শোক নিত্যসঙ্গী যাদের, তাদের কাছে ঈদের খুশি কতটাই-বা গুরুত্ব পায়। যদিও ইসলামে বিধান আছে, বিত্তশালীরা বছরান্তে তাদের উদ্ধৃত্ত সম্পত্তির এক-চল্লিশাংশ সম্পত্তির এসব গরিবের কাছে বিলিয়ে দেবে। কেননা এ সম্পত্তি বৈধভাবে যাদের থাকে না, এর ওপর মালিকানা এসে বর্তায় ওইসব গরিবের। যেখানে যথেষ্ট ক্ষমতাশালী আদায়কারী থাকা সত্ত্বেও এ দেশের ধনী ব্যক্তিদের কাছে লক্ষ-কোটি টাকা ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি পড়ে যায়, সেখানে অভিভাবকহীন এই 'জাকাতের' টাকাগুলো যথার্থভাবে বিলিব্যবস্থা হয় বলে বিশ্বাস করা যায় না।

সব মিলিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও এই 'ঈদ' নামের উৎসবকে কেন্দ্র করে খুশির জোয়ার বয়ে যায় মুসলমান সমাজে। পরস্পর হিংসা-ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে উঠতে সাহায্য করে এ উৎসব। এখানেই ঈদ উৎসব উদযাপনের প্রকৃত সার্থকতা।

সাংবাদিক-কলামিস্ট

মন্তব্য করুন