করোনা দ্বিতীয় তরঙ্গের ভয়ংকর প্রভাব পুরোবিশ্ব ব্যবস্থাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। ভারতে উদ্ভূত কভিড-১৯ এর নতুন ধরন বি.১.৬১৭ শুধু ভারতকেই মারাত্মকভাবে পর্যুদস্ত করেনি, ইতোমধ্যে বিশ্বের প্রায় ২১টি দেশে এই নতুন প্রকরণের বিস্তার প্রকাশ পেয়েছে। ভ্যাকসিন ও অক্সিজেন সংকটে ভারতের শোচনীয় পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ অন্য দেশেও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যে কোনো দেশ-সংস্থা থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ এবং প্রয়োগ করা হবে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ ঘোষণায় দেশবাসী প্রবল অনুপ্রাণিত। ইতোমধ্যে রাশিয়া এবং চীনকে দেশের অভ্যন্তরে ভ্যাকসিন উৎপাদনের অনুমোদন অতিমারি প্রতিরোধে অপরিমেয় প্রাণশক্তির সঞ্চার করেছে। দেশীয় দুটি কোম্পানি বিনামূল্যে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের লক্ষ্যে তাদের প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অসাধারণ মানবিক উপমায় প্রশংসিত। প্রধান কৃষিপণ্য ধানের বাম্পার ফলন, ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঊর্ধ্বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, প্রবাসী শ্রমযোদ্ধাদের অভাবনীয় রেমিট্যান্স প্রবাহ, দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের নতুন করে বিদেশ গমনের নানা উদ্যোগ চলমান অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক মাত্রিকতা তৈরি করেছে। কঠোর লকডাউন অব্যাহত রেখে সীমিত পরিসরে ব্যবসা-বাণিজ্যের খাতকে উন্মুক্ত করে পবিত্র রমজান পালন ও ঈদ উৎসব উপলক্ষে নানামুখী কর্মযজ্ঞের প্রায়োগিক বাস্তবায়ন সর্বত্রই সমাদৃত। আসন্ন পবিত্র ঈদকে অনাড়ম্বর পরিবেশে উপভোগ এবং করোনা বিজয়ে নানা ত্যাগ-তিতিক্ষার দৃশ্যপট অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সমীকরণে নতুন মানবিক অধ্যায়ে অভিষিক্ত হবে- এটিই প্রত্যাশিত।

প্রাসঙ্গিকতায় বলা যায়, রমজান ও ঈদ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বিশ্বের সব মুসলমানের ধারণায় এটি সুদৃঢ় যে, পবিত্র কোরআনের প্রথম ও শেষ আয়াত নাজিল হয় যথাক্রমে ৬১০ ও ৬৩২ সালে এবং দীর্ঘ তেইশ বছরের পরিক্রমায় এর পরিপূর্ণতা দৃশ্যমান হয়। অবাধ মুক্ত বিশ্বাস ও যথার্থ জীবন-দর্শন উন্মোচন করে হাজার বছরের সংস্কার এবং ধর্মান্ধতার বৃত্ত ভেঙে পবিত্র কোরআন মানব জগৎকে করেছে অপরিমেয় আলোকবর্তিকায় উদ্ভাসিত। জাগতিক-পরজাগতিক সব চিরায়ত সত্যকে প্রকাশ করে মহান প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ ও তার সন্তুষ্টি অর্জনে মানবিক গুণে ঋদ্ধ হওয়ার অমিয় বারতা-সমৃদ্ধ পবিত্র কোরআন প্রত্যেক ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব মতপার্থক্যের অবসানে সফল ভূমিকা পালন করে আসছে। অজ্ঞতাকে মহাপাপ হিসেবে অভিহিত করে সমগ্র মানব সমাজকে জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির পথে ধাবিত হওয়ার অসাধারণ অনুপ্রেরণা এই মহাগ্রন্থ।

ইমান, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত- এই পাঁচটি পবিত্র ইসলামের মূল ভিত্তি। এর মধ্যেই নামাজ-রোজা-জাকাতকে ঘিরে যে মাসটি সবচেয়ে সমাদৃত, সে মাসকেই যথাযোগ্য মর্যাদাসীন করার উদ্দেশ্যে মাস শেষে সর্বজনীন ঈদ বা সর্বোচ্চ উৎসবের দিন ধার্য করা হয়। পবিত্র রমজান মাসে ধার্মিক মুসলমান আত্মিক উৎকর্ষ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য হিসেবে রোজা আদায় করেন। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী শরিয়তের পঞ্চ বুনিয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে রোজা। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০-৫০০০ বছরকালের আদি পিতা হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত ইসা (আ.) পর্যন্ত সব নবী-রাসুলের শরিয়তেও তাদের উম্মতগণের ওপর রোজা আদায় করা বিধিবদ্ধ ছিল। নিজের ও অন্যের জীবন সমৃদ্ধিতে নিবেদিত সব কর্মেরই যোগফল হচ্ছে ধর্ম- এই অমিয় সত্যকে ধারণ করে যে কোনো ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গ ধর্মের গোঁড়ামি বা ধর্মান্ধতাকে পরিহার করে প্রকৃত ধার্মিকতার নির্যাসকে প্রাধান্য দিয়ে স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য রোজা আদায় করে থাকেন। আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাধ্যমে স্বীয় দেহ-মনকে নিয়ন্ত্রণ এবং এর পরিপূর্ণ উপলব্ধিতে অন্যের কল্যাণকে নিশ্চিত করার মধ্যেই রমজানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপিত।

সমাজ জীবনে দেহ-মনের সমন্বয়ে যে মানব সত্তার বিকাশ ও বিস্তার, তার মূলে রয়েছে নাফ্‌স ও রুহের পরস্পরবিরোধী কর্মযজ্ঞ। নাফ্‌স হচ্ছে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক কিছু বিরূপ সত্তা যেমন কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ এবং অপাঙ্‌ক্তেয় পানাহার ইত্যাদি। পাপের প্রতি আকৃষ্ট, পাপ করে অনুতপ্ত হওয়া এবং পাপের প্রতি অনুরাগী না হয়ে পবিত্র কাজের প্রতি আকর্ষণ- এই তিন ধারায় বিভক্ত নাফ্‌সের উত্তম পর্যায় হচ্ছে নির্মোহ ও নির্লোভ থেকে পাপাচারমুক্ত বা নাজাত প্রাপ্তি। অন্যদিকে বলা যায় পানাহার ইত্যাদি দ্বারা নাফ্‌স যখন শক্তিশালী হয়, রুহ তখন দুর্বল হয়ে পড়ে। আর রোজা পালনের মধ্যে অর্থাৎ পানাহার ইত্যাদি থেকে নিজেকে বিরত রেখে নাফ্‌সকে শক্তিহীন করে আত্মার পরিশুদ্ধতায় রুহকে শক্তিশালী করার মধ্যেই রোজা পালন হয় মহিমান্বিত। মূলত এই রুহের আত্মশুদ্ধি-আত্মসংযমের নিরন্তর সাধনা যা সুফি দর্শনের আধ্যাত্মিক অগ্রগতি ও মানবকল্যাণে স্বীয় সত্তাকে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে স্রষ্টার প্রতি অপরিসীম আনুগত্য প্রকাশ এবং মাহে রমজানের অর্থবহ কার্যকারিতার বিধান সমুন্নত।

করোনার এই ক্রান্তিকালে ঈদ উদযাপনে আমরা ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমরের একটি ঘটনাকে স্মরণ করতে পারি। ঈদের আগের দিন খলিফা উমরের (রা.) স্ত্রী স্বামীকে বললেন, 'আমাদের জন্য ঈদের নতুন কাপড় না হলেও চলবে, কিন্তু ছোট বাচ্চাটি ঈদের কাপড়ের জন্য কাঁদছে।' আরব জাহানের শাসক খলিফা উমর বললেন, 'আমার তো নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই।' পরে খলিফা উমর (রা.) তার অর্থমন্ত্রী আবু উবাইদাকে (রা.) এক মাসের অগ্রিম বেতন দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠালেন। উম্মতে আমিন আবু উবাইদার (রা.) বাহককে টাকা না দিয়ে চিঠির উত্তরে লিখলেন, 'আমিরুল মুমিনিন! অগ্রিম বেতন বরাদ্দের জন্য দুটি বিষয়ে আপনাকে ফয়সালা দিতে হবে। প্রথমত, আগামী মাস পর্যন্ত আপনি বেঁচে থাকবেন কিনা? দ্বিতীয়ত, বেঁচে থাকলেও দেশের জনসাধারণ আপনাকে সেই মেয়াদ পর্যন্ত খিলাফতের দায়িত্বে বহাল রাখবে কিনা? চিঠি পাঠ করে খলিফা উমর (রা.) কোনো প্রত্যুত্তর তো করলেনই না, বরং এত কেঁদেছেন যে, তার চোখের পানিতে দাড়ি পর্যন্ত ভিজে গেল। আর হাত তুলে আবু উবাইদার (রা.) জন্য দোয়া করলেন- একজন যোগ্য অর্থমন্ত্রী নির্বাচিত করতে পেরেছেন। আধুনিক কথিত সভ্যতায় ইসলামের এ অনুশাসনগুলো নূ্যনতম প্রতিপালন হচ্ছে কিনা তা নিয়ে গভীর বিশ্নেষণ প্রয়োজন। ভোগেই সার্থকতা নয়, মানুষকে সেবাদানের মধ্যে পবিত্র ঈদের মহিমায় আমরা যেন মনুষ্যত্ব-মানবিকতাকেই ধারণ করতে পারি। এই ক্রান্তিকালে মহানুভবতার আবাহনে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির নবতর অভিষেক প্রাণিত হোক- আজকের দিনে এটুকুই প্রার্থনা।
  সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন