আজ আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। আইসিওএমের সংজ্ঞা অনুযায়ী, জাদুঘর সমাজের সেবা এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি অলাভজনক গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে, যা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে; জনসাধারণের শিক্ষা-গবেষণা এবং বিনোদনের উদ্দেশ্যে বস্তুগত নিদর্শনাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রকাশনা, প্রদর্শন এবং গবেষণা করবে।

বাংলায় জাদুঘরের ধারণাটি এসেছিল ১৭৯৬ সালে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এ ক্ষেত্রে ওয়ারেন হেস্টিংসের জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। যে কারণে ১৮০৮ সালে কলকাতায় জাদুঘরের জন্য একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে ১৮১৪ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম জাদুঘর হিসেবে 'এশিয়াটিক সোসাইটি মিউজিয়াম' প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১০ সালে প্রথম জাদুঘর হিসেবে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

দেশে এত বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও স্নাতক পর্যায়ে 'জাদুঘর অধ্যয়ন' নামক পৃথক কোনো বিষয়ে পাঠদান কার্যক্রম আমরা শুরু করতে পারিনি। যদিও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান, ফোকলোর ইত্যাদি বিষয়ে অধ্যয়নের ক্ষেত্রে জাদুঘরের অংশটি পড়ানোর জন্য হাতেগোনা দু-একটি কোর্স রাখ হয়। কিন্তু এত বৃহৎ পরিসরের একটি বিষয়কে শুধু কোর্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা কতখানি যৌক্তিক?

জাদুঘরকে বলা হয়ে থাকে 'বিশ্ববিদ্যালয়'। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অধ্যয়ন করার প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুভব করব কবে থেকে? স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জাদুঘর অধ্যয়ন বিষয়ে তেমন মনোযোগ দিতে সক্ষম হইনি।

চাকরির বাজারভিত্তিক অধ্যয়ন ছাড়াও দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক এবং নৃতাত্ত্বিক পরিপ্রেক্ষিত অনুধাবনে স্নাতক পর্যায়ে 'জাদুঘর অধ্যয়ন' নামক পৃথক একটি বিষয়ের পঠন প্রয়োজন। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে জাদুঘর অধ্যয়ন নামক পৃথক বিষয়ে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জাদুঘরগুলোর সংযোগ স্থাপন করা জরুরি। এর ফলে জাদুঘর নিয়ে অধ্যয়ন করা শিক্ষার্থীরা সরাসরি হাতে-কলমে জাদুঘর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে সক্ষম হবেন।

আমার জানামতে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগ এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে কোর্সভিত্তিক জাদুঘর অধ্যয়ন পড়ানো হয়ে থাকে। প্রশ্ন হলো, এই তাত্ত্বিক পাঠের সঙ্গে কি প্রায়োগিক চর্চার সেতুবন্ধন আমরা তৈরি করতে পেরেছি? বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার ক্ষেত্রে পাঠ্যবই অধ্যয়নের পাশাপাশি প্রায়োগিক চর্চা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে শিক্ষার্থী জাদুঘর অধ্যয়ন নামক কোর্সটি পড়েন, তিনি যদি নিকটবর্তী জাদুঘরে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পান, তাহলে গবেষণার পরিসর কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাবে।

অন্যদিকে, ভার্চুয়াল মিউজিয়াম ট্যুর নামক যে উদ্যোগ আমাদের জাতীয় জাদুঘর শুরু করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। করোনা সংক্রমণ এড়াতে জাদুঘরগুলোতে ভার্চুয়াল ট্যুরের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ফলে দর্শনার্থী এবং গবেষক ঘরে বসে অনলাইনে জাদুঘরের সংগৃহীত নিদর্শন সম্পর্কে ধারণা লাভ করার সুযোগ পাবেন। এ ক্ষেত্রে জাদুঘরে প্রবেশের ফি অনলাইনে গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়া আমাদের দেশের প্রাচীন প্রত্নস্থল যেমন- মহাস্থানগড়, সোমপুর মহাবিহার, ময়নামতি ইত্যাদি থেকে প্রাপ্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বিভিন্ন দেশের জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টির জন্য তা দেশে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

'আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস ২০২১'-এর প্রতিপাদ্য 'দ্য ফিউচার অব মিউজিয়ামস :রিকভার অ্যান্ড রিইমাজিন'। এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে জাতির বৃহৎ স্বার্থে 'জাদুঘর অধ্যয়ন' নামক পৃথক বিষয় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ফলে একদিকে যেমন আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস উপস্থাপন করা যাবে, অন্যদিকে এসব বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার পরিধি বিস্তৃত হবে।

শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
rifat218@gmail.com

মন্তব্য করুন