একটি মোবাইল ফোন অপারেটর তাদের তথ্যভান্ডার ও কল প্রবণতা বিশ্নেষণ করে জানিয়েছে, এবারের ঈদে ১৩ মে সন্ধ্যার মধ্যে ৬৫ লাখ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ঢাকা ছেড়েছে। এক ব্যক্তির একাধিক মোবাইল সিম থাকলেও তাকে 'ইউনিক ইউজার' হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বিশ্নেষণ করার ক্ষেত্রে। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী নন- এমন শিশুসহ ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা খানিকটা অনুমান করা যায়। নিশ্চয় ঈদের দিনেও ঢাকা ছেড়ে গেছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। তারা সবাই স্বাভাবিকভাবেই ঢাকায় ফিরবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার তার ফেসবুক পেজে বলেছেন, 'আমরা জানি না কতটা নিরাপত্তাসহ তারা ফিরবে; কতজন করোনা বহন করে আনবে অথবা কতজন করোনা ঢাকা থেকে বহন করে নিয়ে গেছে।' অন্যদিকে, 'লকডাউন' ঘোষণা করে সবকিছু খুলে রেখে কঠোরভাবে গণপরিবহন বন্ধ রাখা সত্ত্বেও বুধবার (১২ মে) ভোর ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার (১৩ মে) ভোর ৬টা- এই ২৪ ঘণ্টায় ৫২ হাজার ৬৭৭টি যানবাহন বঙ্গবন্ধু সেতু পারাপার করেছে। সেতু উদ্বোধনের পর এটাই সর্বোচ্চ রেকর্ড! ঈদের পর এত মানুষের ঢাকায় ফেরার বিপদ সম্পর্কে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও!

যখন ঘোষণা করা হলো :জেলার মধ্যে গণপরিবহন চলবে এবং রেলসহ আন্তঃজেলা চলাচল বন্ধ থাকবে, তখনই প্রশ্ন উঠেছে- সরকার পরিণতি জেনেও কেন এ রকম একটা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে? স্পষ্টভাবেই স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনে সরকারের নেওয়া এ সিদ্ধান্ত 'জনগণ' প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ঘটনাকে করোনা মোকাবিলায় সরকারের সমন্বয়হীন বিশৃঙ্খল পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জনগণের সামাজিক প্রতিরোধ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই জনগণ সংগঠিত নয় যদিও, তবে চিরায়ত সংস্কৃতিচালিত লাখ লাখ মানুষ ও পরিবারের সমষ্টি। করোনা মহামারি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় আপাতভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলেও সময়ের প্রয়োজনে সাধারণ অনুভব ও আচরণের সমন্বয়ে এই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানান দিল বলেই ধরে নেওয়া যায়। তারা একযোগে স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে জেনেও সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনমতের নূ্যনতম প্রতিফলন না থাকা এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। এর দায় সরকারের ওপর নিশ্চয় বর্তায়।

আমরা অনেকেই জনগণের দোষ খুঁজেছি এই প্রশ্ন তুলে- কী কারণে সরকারি নির্দেশ ও স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে গরমে, রোদে, ভিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে প্রাণ ত্যাগ করতেও রাজি হয় শুধু ঈদের সময় যে কোনো মূল্যে বাড়ি যাওয়ার জন্য? হিসাব-কিতাব দেখে মনে হয়, স্বাভাবিক সময়ের ঈদের চেয়েও এবার সম্ভবত বেশি সংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়েছে বাড়িতে আপনজনের সঙ্গে ঈদ করতে। উদ্ভট লকডাউনে অভ্যন্তরীণ রুটে উড়োজাহাজ চলাচল করেছে। অর্থাৎ উড়োজাহাজের টিকিট কিনতে সক্ষম ব্যক্তিরা করোনা মহামারি ঠেকাতে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যাওয়া-আসা বন্ধ রাখতে বাধ্য না! ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক যারা হয়েছেন তাদেরও চলাচলে বিধিনিষেধ নেই। অর্থাৎ গাড়ির মালিকরা জনগণের বাইরে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত এবং লকডাউন তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। মুনাফাপ্রত্যাশীদের কারখানা খোলা। অর্থাৎ মুষ্টিমেয় মানুষের টাকার প্রবাহ বন্ধ রাখা যাবে না। অন্যদিকে যতই বলা হোক, মসজিদে জামাত করতে হবে- মসজিদ উপচে ঈদের জামাতের রাস্তা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যায়নি। জনগণ যখন টের পায় যে, নাগরিক হিসেবে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা, আর্থিক নিরাপত্তা; তাদের সন্তানদের শিক্ষাসহ মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা, এমনকি বছরাধিককাল বিচ্ছিন্ন থাকা, উপার্জনহীন হয়ে পড়ার পরও রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। আপদকালে রাষ্ট্র যেসব সুবিধা দিচ্ছে, তার সবই যেন নব্য ধনী ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের জন্য। এ রকম বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে সরকারি সিদ্ধান্ত না মানাকেই জনগণ তাদের অস্তিত্ব ঘোষণা করার উপায় হিসেবে অবলম্বন করেছে। এতে হয়তো তারা ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে মরে যায়; করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা বাড়ায়। কিন্তু মরার সময় বা মরার পরে মানুষের স্পর্শ পায়; আপনজনের সান্নিধ্য পায়; বাড়িতে পৌঁছতে পারে; যেহেতু ঢাকা তাদের আপন করে নেয়নি। অথচ ঈদ শেষে বাড়িতেও তারা থাকতে পারবে না। এ রকম প্রেক্ষাপটে এমনিতেই গণহিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে বৃহত্তর সমাজ। তদুপরি সরকার তাদের চলাচল নিষিদ্ধ করে শুধু বড়লোকদের চলতে দিয়েছে। জনগণ তাই মৃত্যু অনিবার্য জেনেও মরে যাওয়ার অধিকতর সন্তোষজনক পথ বেছে নিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। লক্ষণীয়, এক শ্রেণির মানুষ জনগণের এই আচরণ নিয়ে ট্রলে মেতে উঠেছে! কিন্তু তারা একবারও ভাবেনি- 'সকল নাগরিকের সমঅধিকার' থেকে সরে যাওয়া রাষ্ট্রে একসঙ্গে বাঁচতে না পারলে একসঙ্গে মরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনা ঠাট্টার বিষয় নয়। আইন, নির্দেশনা সবার জন্য সমান না হলে; সমাজ ও সংস্কৃতিবান্ধব না হলে তা কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা কোথাও নেই। রাষ্ট্রে যখন ক্ষমতা ও আর্থিক সংগতির ওপর ভিত্তি করে শ্রেণিপার্থক্য স্পষ্ট হয় এবং ক্ষমতাহীন ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির সামনে যখন আর কোনো পথ খোলা থাকে না; তখন আত্মঘাতী আচরণের মাধ্যমেই তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে। তারা বিশ্বাস করে- রাস্তায় নামলে ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছবে এক সময়। তবে রাস্তা যদি সহ্যসীমার চেয়েও বেশি বিপৎসংকুল হয়, তখন এই ক্ষোভ সময় নেবে না বিক্ষোভে পরিণত হতে।

কেউ কেউ নাকি বলেছেন, যদি বাড়ি যাওয়া মানুষের অর্ধেক সংখ্যকও ঢাকায় প্রত্যাবর্তন আটকানো যায়, তাহলে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের মাত্রা কিছুটা কমানো যাবে। অথচ বাস্তবতা হলো, মানুষ ঢাকায় ফিরবে যে কোনো মূল্যে। শুধু গণপরিবহন বন্ধ রেখে মানুষে মানুষে সংস্পর্শ বন্ধ করা অসম্ভব। দীর্ঘ উপার্জনহীন সময় পার করে পরিবহন শ্রমিক-মালিকও বিক্ষুব্ধ হতে শুরু করেছে। সরকারের সিদ্ধান্ত সব নাগরিকের জন্য একই রকম না হলে আজকের স্বাস্থ্যগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে রাজনৈতিক বিপদও।

 গল্পকার ও অনুবাদক

মন্তব্য করুন