সম্প্রতি দেশের অনেক জেলা ও উপজেলায় নির্মিতব্য ৫৬০টি মডেল মসজিদের মধ্যে ৫০টির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নির্মিত মসজিদগুলোর শুভ উদ্বোধন করেছেন। উদ্বোধনী পর্বে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সেই অর্থে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেছেন, মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে জনসচেতনতা বাড়াতেও এগুলো সহায়ক হবে। ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও মূল্যবোধের প্রচার এবং যাবতীয় উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী প্রচারের জন্যই মূলত সরকারের এ প্রকল্প; ধর্মের নামে জঙ্গিবাদ, মানুষ খুন করে বেহেশতের আশা করা, ইসলামের বদনাম করা- এসব বিষয় প্রতিরোধের জন্য আলেম সমাজ ও অভিভাবকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য বাংলাদেশের সমাজ-বাস্তবতার আলোকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং শান্তিময়, নিরাপদ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

আমরা জানি, মসজিদ আল্লাহর ঘর। 'বায়তুল্লাহ' তথা আল্লাহর পবিত্র ঘর হিসেবে যাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তা পৃথিবীতে মানবেতিহাসের প্রথম গৃহ হিসেবে পরিচিত। মহান আল্লাহ বলেছেন, 'ইন্না আউয়ালা বাইতিন উযিয়া লিন্নাসি লাল্লাযি বিবাক্কাতা মোবারাকান ওয়া হুদাল্লিল আলামিন' অর্থাৎ নিঃসন্দেহে বিশ্বমানবতার জন্য নির্মিত প্রথম গৃহ যেটি পবিত্র মক্কা নগরীতে অবস্থিত এবং এই গৃহ হচ্ছে সমগ্র পৃথিবীর জন্য বরকতমণ্ডিত ও সঠিক পথনির্দেশনার অনন্য নিদর্শন; সেই পবিত্র গৃহটির নামই হচ্ছে 'কাবা শরিফ'। পবিত্র কাবার অবস্থান ও মর্যাদা সম্বন্ধে নাজিলকৃত এ আয়াতে কারিমায় মহিমান্বিত এ গৃহের তাৎপর্য ও কার্যকারিতা স্পষ্টভাবেই বিবৃত হয়েছে; যাতে কাবা শরিফ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ও কর্মপরিধি বিষয়ে আমরা সম্যক অবহিত হতে পারি।

পৃথিবীর সব মসজিদই পবিত্র কাবার অনুসরণে ও একই কার্যপ্রণালির আওতায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। অর্থাৎ মহামহিম প্রভুর ইবাদতের জন্যই মসজিদের সৃষ্টি; পরম স্রষ্টার সুনির্ধারিত অন্যতম হুকুম 'নামাজ' আদায়সহ নানাবিধ ইবাদতের মাধ্যমে আবাদ করাটাই বান্দার কাছে মসজিদের চাওয়া। বাংলাদেশ তো বটেই, বরং গোটা বিশ্বের জন্যই এক অভূতপূর্ব ঘটনা; কেননা একসঙ্গে এতগুলো মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা ও উদ্বোধন সমগ্র পৃথিবীতেই এক বিরল দৃষ্টান্ত।

'মসজিদ' মানে সেজদার জায়গা; যেখানে মহান রবের উদ্দেশে তারই সন্তুষ্টি বিধানের জন্য তাকে ভক্তিভরে সেজদা করা হয় সেটিই মসজিদ। সে অর্থে উম্মতে মোহাম্মদির জন্য গোটা জমিনটাকেই মহান আল্লাহ মসজিদরূপে ছাড়পত্র দিয়েছেন; আর এটি নিঃসন্দেহে তারই প্রেরিত রাসুল (সা.)-এর বরকত! কবির ভাষায়, 'শোদ উজুদাশ রাহমাতুল্লিল আলামিন, মসজিদে উ শোধ হামে রুয়ে জামিন' অর্থাৎ বিশ্বমানবতার করুণার মূর্তপ্রতীক মহানবী (সা.)-এর শুভাগমনের ফলে মহান আল্লাহ সমগ্র ভূমণ্ডলকেই মসজিদে পরিণত করেছেন। দুনিয়ার মুসলমানরা যখনই নামাজের সময় হবে পবিত্র জমিন দেখে সেখানেই নামাজ আদায় করে নিতে পারবে। তার পরেও সুনির্দিষ্ট স্থাপত্য-কাঠামোর আঙ্গিকে আমরা মসজিদ নির্মাণ করে থাকি আর সেই নির্মিত স্থাপনা শুধু নামাজ আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মসজিদ থেকেই সমাজ সংস্কারের নানা কর্মসূচি প্রণীত ও বাস্তবায়িত হবে। বর্তমান সরকারের ৫০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্বোধন মূলত সেই লক্ষ্যেই সম্পন্ন করেছেন।

আমরা যদি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তবে দেখতে পাব ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক বড় কাজগুলো আওয়ামী লীগ শাসনামলেই সম্পন্ন হয়েছে। কেবল মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রই নয়, এ দেশের ইসলামপ্রিয় আপামর জনসাধারণের ধর্মীয় ভাবাবেগ ও অনুভূতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিংহভাগ কাজই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি আওয়ামী লীগ সরকারের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে। সারাদেশে ইসলামের প্রচার-প্রসারকল্পে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, কাকরাইল মসজিদের জন্য অতিরিক্ত জায়গা প্রদান, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার জন্য স্থান নির্ধারণ, বেতার ও টিভিতে কোরআন তেলাওয়াত প্রচার, পবিত্র হজযাত্রীদের জন্য ভ্রমণ কর রহিতকরণ, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালন, মাদক ও নেশামুক্ত সমাজ গঠনের জন্য মদ, জুয়া নিষিদ্ধকরণ, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও অতিসম্প্রতি মডেল মসজিদ প্রকল্পসহ ইসলামের মহৎ কাজগুলো এ দেশে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে আওয়ামী লীগ সরকারই করেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবেগধর্মী ও মননশীল ঐতিহ্যকে ধারণ করে তার সুযোগ্য কন্যা হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্মীয় আচার ও অনুভূতির প্রতি নিরন্তর শ্রদ্ধাশীল। আর এ কারণেই পিতার ইসলামী খেদমতের ধারাবাহিকতায় তিনি নিজেও পবিত্র ইসলামের প্রচার-প্রসারে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছেন; যার প্রকৃষ্ট ও অনন্য দৃষ্টান্ত হলো এই মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'মান বানা লিল্লাহি মাসজিদান বানাল্লাহু লাহু বাইতান ফিল জান্নাহ' অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহপাকের সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ বানাবে, মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ বাড়ি বানাবেন। সুতরাং আমরা দেখতে পাই, মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ইহজাগতিক ফায়দা ও উপযোগিতা যেমন রয়েছে, ঠিক পুরস্কার হিসেবে এর পারলৌকিক প্রতিদানও রয়েছে। সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ মহৎ কর্ম সম্পাদনের জন্য মহান আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন- এ আমাদের প্রার্থনা।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের ভাষ্যমতে, মসজিদ হলো পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট জায়গা। সুতরাং মসজিদই হতে পারে আমাদের ব্যক্তিগত পাপাচার, সামাজিক অনাচার, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, জঙ্গিবাদ, খুন-খারাবি, পারস্পরিক হানাহানি-বিদ্বেষ, ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত বিভেদ-অনৈক্য এবং নারী-শিশুর প্রতি অবমাননা ও সহিংসতাসহ দেশে বিদ্যমান সব সমাজবিরোধী ও মানবতাবিধ্বংসী কার্যকলাপের মূলোৎপাটন ঘটিয়ে পবিত্র ইসলামের কালজয়ী বিধান, শাশ্বত বাণী ও শান্তিময় জীবন-পদ্ধতির আলোকে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার এক অনবদ্য কেন্দ্রস্থল। আর এমনটি নিশ্চিত করা গেলেই বহু অর্থ ব্যয়ে ও সুচিন্তিত পরিকল্পনার আলোকে বাস্তবায়িত মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য সাধিত হবে।

চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন