মানবসম্পদ উন্নয়ন একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের বড় খাত। মানবসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি দরকার এ সম্পদ কাজে লাগানোর ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। দেশে ও বিদেশে চাকরির মাধ্যমে আমরা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেকার জনগোষ্ঠীর আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারি। উভয়ের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুতে মুখ্য ভূমিকা থাকে রাষ্ট্রের। বিশেষ করে মূলধারা বা শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হয়। শিক্ষার মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির পথ সুগম করা গেলে কর্মসংস্থানে উদ্যোক্তারা অবদান রাখতে পারেন।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টির জন্য বড় প্রয়োজন ভারসাম্যমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব না দিলে উচ্চতর প্রতিষ্ঠান যতই থাকুক না কেন সেখানে মানসম্মত শিক্ষার্থী পাওয়া সহজ হয় না। এক কথায় প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নত না হলে উচ্চ শিক্ষার মানও উন্নত হবে না। সরকারের লক্ষ্য প্রতিটি জেলায় একটি করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু জেলা পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের হতাশা এখনও বিরাজমান।

প্রাথমিক শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ একটি। ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক কারণে এ এলাকার মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে জীবনযাপন করতে হয়। শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া এ জনপদের উন্নয়নে বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে সুনামগঞ্জে মেডিকেল ও টেক্সটাইল কলেজ স্থাপন করা হয়েছে। এ বছর মেডিকেলে শিক্ষার্থী ভর্তি সম্পন্ন হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আইন পাস হয়েছে, অচিরেই শিক্ষা কার্যক্রম চালু হবে। এতদিনের বঞ্চনার অবসান হতে যাচ্ছে সুনামগঞ্জে। ভারসাম্যমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যে এ অঞ্চলের মানুষ উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবেন এমনটি আশা করা যায়। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান আরও উন্নত করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। সুনামগঞ্জের অনেক শিক্ষার্থী শাবিপ্রবিতে লেখাপড়া করে দেশ ও দেশের বাইরে সুনাম কুড়াচ্ছেন। তাদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়া উচিত।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায় সুনামগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষার মান তেমন ভালো নয়। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলক কম। অনেক প্রতিষ্ঠানে পাঠদান করেন ধার করা বা ভাড়াটে শিক্ষকরা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ অন্তর্ভুক্তি হলেও স্কুলে অনুপস্থিতির হার উদ্বেগজনক। প্রাথমিকের পর মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার বেশি। অনেক সময় বিদ্যালয় দূরে হওয়ায় লেখাপড়া আর সামনের দিকে এগোয় না। ঝরে পড়ার হার উচ্চমাধ্যমিকেও কম নয়। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো উচিত।

আমরা জানি প্রাথমিকের শিক্ষক স্থানীয় নাগরিকদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে স্থানীয় মানুষ শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত না হলে তাদের মধ্য থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যায় না এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান উন্নত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। উন্নত ও মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষক থেকে শুরু করে এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের নিবেদিতপ্রাণ হওয়া দরকার, যারা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ছেলেমেয়েদের খোঁজ খবর নিতে পারেন। আমাদের জনপ্রতিনিধিরা ভোটের সময় বাড়িতে বাড়িতে যান। তারা যদি অন্য সময়ে বেশি করে ভোটারদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার বিষয়ে খবর নেন, তাহলে দেশ অনেক এগিয়ে যাবে সন্দেহ নেই।

আমাদের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন- ভবন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ইত্যাদির সঙ্গে সমান তালে মানবসম্পদ উন্নয়নের কাজ না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। সুনামগঞ্জে অনেক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে; কিন্তু সেখানে ভর্তি হওয়ার জন্য ভিত হিসেবে প্রাথমিক ও এর ওপরের শ্রেণির মান উন্নয়নের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। নিজ জেলায় থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার সুফল আমরা পেতে চাই। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জের জনগণের আগামী দিনের উচ্চ শিক্ষার অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে সেটিই প্রত্যাশা।

অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
neazahmed_2002@yahoo.com

বিষয় : চারদিক ড. নিয়াজ আহম্মেদ

মন্তব্য করুন