একজন রাজনীতিকের পরিচয় দুর্নীতিবাজ বা প্রতারক হতে পারে না, বরং প্রকৃতিগত ও তাত্ত্বিকভাবে রাজনীতিকরা প্রতিভাবান, ভিশনারি এবং পরিবর্তন এজেন্ট। একটি সংগঠনের শীর্ষে যেমন থাকে স্ট্র্যাটেজিক অ্যাপেক্স, তেমনি রাজনীতিকরাই রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক অ্যাপেক্স। তারাই নীতি বা পলিসি প্রণয়নকারী, বাজেট প্রণয়নকারী ও অনুমোদনকারী, কৌশলপত্র রচয়িতা এবং আইনপ্রণেতা। আপনার-আমার সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্ম সুযোগ, নাগরিক ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় আইনের শাসন, নাগরিক সম্মান ও নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অর্থনীতির নীতিমালা ও প্রয়োগ, পাবলিক গুডসের বণ্টন ও সরকারি পরিষেবা এবং কমিউনিটি, সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি-প্রবৃদ্ধি- সবকিছু রাজনীতি দ্বারাই নির্ধারিত হয়।

রাজনীতি ও নেতৃত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষের জীবনমান ও কল্যাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রান্তিক ও সাধারণ জনগণের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অসুস্থতা, নিরক্ষরতা, নিপীড়ন ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাষ্ট্রের মতো একটি সম্প্রদায় বা নির্বাচনী এলাকার ক্ষেত্রেও এটি সত্য।

বিদ্যমান বাস্তবতা হলো ঘুণে ধরা রাজনীতি অসচেতন সমাজে দুর্নীতিবাজরা রাজনীতির একটা বড় জায়গা দখল করে আছে এবং একটা দুষ্টচক্র ও প্রাচীর তৈরি করে টিকে আছে। এই প্রাচীর ভেঙে ফেলতে হবে। এজন্য নতুন প্রজন্মকে সুশিক্ষা ও দায়িত্বশীল নাগরিক মানসিকতায় আলোকিত করতে হবে। সমাজ ও কমিউনিটিকে রাজনীতি অচেতনতা বা রাজনীতিবিমুখিতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতির মানে খুঁজে পাই প্লেটোর রিপাবলিক, অ্যারিস্টটলের রাজনীতি, চাণক্যের অর্থশাস্ত্র ও চাণক্য নীতি এবং কনফুসিয়াসের দর্শন ও নীতিজ্ঞান, ডেভিড ইস্টনের পলিটিক্যাল সিস্টেম, ভদ্মাদিমির লেনিনের কালেক্টেড ওয়ার্কস, বার্নার্ড ক্রিকের ইন ডিফেন্স অব পলিটিক্স, আড্রিয়ান লেফ্‌টউইচের হোয়াট ইজ পলিটিক্স এবং আন্দ্রেয়াস ওসিয়ানদের সোভেরিয়েনটি, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস, অ্যান্ড ওয়েস্টফালিয়ান মিথে। যদিও নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, থমাস হবস, হেনরি কিসিঞ্জার এবং হ্যারল্ড ল্যাজওয়েলের ন্যায় অতি-বাস্তববাদীদের রাজনৈতিক তত্ত্বের গুরুত্ব বা তাৎপর্য আমি স্বীকার করি।

শুধু রাজনীতির সমালোচনা, গবেষণা, মতামত, নিবন্ধ লেখা বা ওপর থেকে আরোপিত সংস্কারের মাধ্যমে রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটানো যাবে না। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন করতে হলে মেধাবী, প্রতিশ্রুতিশীল ও আদর্শিক তরুণদের রাজনীতির মূলধারায় আসতে হবে। মেধাবী ও আদর্শিক তরুণদের রাজনীতি করার, তাতে টিকে থাকার এবং সংসদীয় রাজনীতিতে অনুপ্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। রাজনীতির ভেতর দিয়েই রাজনৈতিক সংস্কার করতে হবে।

যাই হোক ২০২০-২১ মুজিববর্ষ খুব জাঁকজমকভাবে উদযাপন করার কথা ছিল। করোনা পরিস্থিতির কারণে মুজিববর্ষ উৎসব হয় খুব সাদামাটা। ১০ জানুয়ারি ২০২০ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস থেকে মুজিববর্ষ গণনা ও মুজিববর্ষ উদযাপন শুরু হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ সাল পর্যন্ত এটি চলবে। মুজিববর্ষ সফল ও সার্থক হোক। মুজিববর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি হোক- বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থেকে তার যাপিত জীবন এবং রাজনৈতিক ও উন্নয়ন দর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়া ও তার মহান ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টাকারীদের প্রতিহত করা। আরও প্রতিশ্রুতি হোক, সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠন এবং মাদক-দুর্নীতি-সন্ত্রাসমুক্ত ও শোষণহীন সমাজ গঠনে আত্মনিয়োগের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।

মুজিববর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা- যেখানে জনমানুষের সত্যিকারের মুক্তি ঘটবে, সেটি রচনার পথ প্রশস্ত হোক। এজন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেবল মুজিব কোট পরিধানকারী নয়, সত্যিকারের মুজিব আদর্শ লালনকারী সোনার ছেলেদের খোঁজার কাজ অব্যাহত রাখতে হবে; যারা নতুন প্রজন্মের জন্য রাজনীতি করবেন, যারা জননেত্রীর লক্ষ্য বাস্তবায়ন অর্থাৎ ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের আগেই উন্নত দেশে পরিণত করতে নিবেদিত ও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবেন।

সহযোগী অধ্যাপক, লিডারশিপ, স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট ও এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ
rafiqul.talukdar@gmail.com

বিষয় : অন্যদৃষ্টি ড. রফিকুল ইসলাম তালুকদার

মন্তব্য করুন