২০২১ সালের ২৫ মে বাংলাদেশ সফররত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি মি. ভোলকান বোজকিরের বক্তব্য শুনছিলাম। ভাসানচরে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে শরণার্থীদের প্রতি উদার মনোভাব প্রদর্শনের পাশাপাশি বিশ্বের সর্বাধিক ক্ষয়িষ্ণু জনগোষ্ঠীর জন্য উদারপন্থি মানসিকতার জন্য তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি মিয়ানমার ইস্যুতে একটি বিশেষ সাধারণ সভা আহ্বান করার আশ্বাস দিয়েছেন যেখানে সাধারণ পরিষদের সদস্যরা আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের জন্য সর্বোত্তম উপায় বের করার চেষ্টা করবেন।

রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত জরুরি অবস্থা এখন শুধু আর মিয়ানমারের স্বজাতীয় বা অভ্যন্তুরীণ বিষয় নয়; বরং এটি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জরুরি অবস্থার একটি। রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষিত ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের নিরলস এই উদ্যোগ এবং বিপরীতে মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে দেওয়ার কূটনৈতিক কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার প্রচেষ্টা ইউএন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্বারা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পাশে চীন ও ভারতের অবস্থান থাকা সত্ত্বেও এই উদীয়মান সংকটের সুদৃঢ় সমাধানের উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিকে একত্রীকরণে বাংলাদেশ পেশাদার রীতিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা লক্ষ্য করেছি, মিয়ানমারের ব্যাপারে চীন ও ভারতের বিশাল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক আগ্রহ আছে। এমনকি রাশিয়াও এই ইস্যুতে আগ্রহ বোধ করছে। মিয়ানমারকে শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে চাপ প্রদান করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার কয়েক মাস ধরে টানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ফলে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। বাস্তবতা বলে, বাংলাদেশ সরকার চূড়ান্ত কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেও একসঙ্গে সব শরণার্থীকে ফেরত পাঠাতে সফল হতে পারবে না। অতএব, আমাদের এই অতিরিক্ত জনসংখ্যা মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কিছু সমাধানের কথা ভাবতে হবে। যদিও মিয়ানমার রাশিয়ার কূটনীতিতে কোনো গুরুত্ব রাখে না, তাই সেখানে কোনো ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়ও নেই, তবে জাতিসংঘ ইস্যুতে মস্কোর মনোভাব সম্ভবত তার মুসলিম মিত্রদের উদ্বিগ্ন করতে পারে, উদাহরণস্বরূপ ইরানের কথা বলা যায়।

স্পষ্টতই, সুরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ রয়েছে, সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের বিশাল আগমন একটি বহুমাত্রিক জরুরি অবস্থা তৈরি করেছে। রাষ্ট্রহীন স্থানচ্যুত হওয়ার কারণে তারা মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের মতো অঞ্চল জুড়ে বিভিন্ন ধরনের মনো-সামাজিক এবং মানবিক সুরক্ষা চ্যালেঞ্জের বিপদের উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যরা প্রস্তাব দেন, যেহেতু বহিরাগত জরুরি পরিস্থিতি অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি করে, বিশেষ করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিনিময় ও ব্যবসা হ্রাস পেতে পারে, তাই সুরক্ষা প্রচেষ্টা খুব প্রয়োজন।

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশঙ্কা তৈরি করেছে, নতুন সরকার বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি মানবে না। বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে গণতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ করে এবং প্রচার করে। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থা বহাল থাকবে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ বর্তমানে অনুভব করে যে, রোহিঙ্গা জরুরি অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আসল উত্তরটি নির্মল এবং শৃঙ্খলভাবে শরণার্থীদের ঘরে ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারা। বিশ্বাস করি, এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করবে। আবার, জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে হবে এবং মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সামরিক সরকারকে চাপ দেওয়ার পাশাপাশি মিয়ানমারে প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গা পুনরায় প্রত্যাবাসন বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার কয়েক মাস ধরে শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বাস্তবে স্বল্পতম সময়ে মিয়ানমারে শরণার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সার্থকতার সম্ভাবনা খুব কমই রয়েছে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশ ২০১৭ সালের শেষ দিকে দুই বছরের মধ্যে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন করতে সম্মত হয়েছিল, আন্তর্জাতিক সন্দেহ সত্ত্বেও তাদের আটকে রাখা শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে আরও একটি নিষ্ঠুরতার পরিণতি হতে পারে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এপ্রিল ২০১৮ এ রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীন, রাশিয়া, ভারত এবং জাপানের স্বীকৃত ভূমিকা চেয়েছিলেন। ২০১৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তার বক্তব্য ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন ও ওআইসির সচিবালয়ের আয়োজিত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি নিয়ে একটি উচ্চস্তরের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। এমনকি জাতিসংঘের সর্বশেষ ভার্চুয়াল সাধারণ অধিবেশনেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমারের নিজস্ব মানুষদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন।

নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ তৈরি করে মিয়ানমার সরকারকে তাদের জনগণকে ফিরিয়ে নিতে চাপ প্রয়োগ করে স্থায়ীভাবে এই সমস্যা সমাধানের জন্য দাতা এবং সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় ও যোগাযোগ করতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারত যেহেতু তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার পাশাপাশি কয়েক দশক ধরে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য একটি বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে, তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য ভারতকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। আশা করি বাংলাদেশের পাশে থেকে চীনও এই সংকট সমাধানের পথ বের করবে।

জাতিসংঘকে মিয়ানমারে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে আনান কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করতে হবে। এর সুরক্ষা কাউন্সিলের উচিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুসারে দ্বন্দ্ব-সংঘাতগ্রস্ত এলাকায় নিরাপদ অঞ্চল স্থাপনের জন্য মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করার উপায় হিসেবে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে সফর শুরু করা। মানবতা ও এই অঞ্চলে বৃহত্তর স্বার্থ ও শান্তি আনয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের শান্তি ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য অবিলম্বে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সহযোগী অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

বিষয় : সমকালীন প্রসঙ্গ মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম

মন্তব্য করুন