জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর ৩ জুন পেশকৃত ২০২২ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বেশকিছু সাংসদ বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার এবং সেই টাকা ফিরিয়ে আনতে সরকারের ব্যর্থতার বেশ সমালোচনা করেছেন। তবে টাকা পাচার নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা এবারই প্রথম নয়, গত প্রায় ২০ বছর ধরেই আমরা সংসদ ও সংসদের বাইরে এই আলোচনা শুনে আসছি।

সাংবাদিক বা অর্থনীতিবিদদের বাইরেও দেশের অনেক মানুষ বিদেশে অর্থ রাখার কারণ হিসেবে অবৈধভাবে টাকার লেনদেন, পুঁজি পাচার, রাজনৈতিক দুর্নীতি বৃদ্ধি, মানি লন্ডারিং, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা, দুর্বল শাসন এমনকি আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যে আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেন।

টেলিভিশন ও পত্রিকার আলোচনায় অর্থনীতিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকারসহ সংশ্নিষ্ট সবাই যথার্থই মনে করেন, এটি অনেক বড় ইস্যু এবং শিগগিরই এ ইস্যুর একটি বিহিত করা জরুরি। অনেকে মনে করেন, এ ক্ষেত্রে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও সজাগ হওয়া দরকার। কেউ মনে করেন, দেশে আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এমন প্রবণতা কমবে। আবার কেউ মনে করেন, যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকার কিছুটা হলেও দুর্নীতিবিরোধী স্ক্যানারের অধীনে নিজস্ব রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতাদের আনতে পেরেছে, সেহেতু তারা এটি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগও নিতে পারবে।

এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার অনেক দেশে কাজের সুবাদে আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত, বিদেশে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের সংবাদপত্রে উল্লিখিত পাচার করা অঙ্কের কয়েক গুণ বেশি বা নূ্যনতম সমপরিমাণ টাকা আমানত রয়েছে। অনেক বাংলাদেশিরই প্রচুর অর্থ সিঙ্গাপুর, দুবাই, হংকং, লন্ডন, টরন্টো, জার্সি কিংবা ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জগুলোর ব্যাংকে রাখার সামর্থ্য আছে। অন্য অনেক উন্নয়নশীল অর্থনীতির মতো দেশে কালো বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বৃহৎ আকার, দুর্বল সুশাসন, জবাবদিহিতার অভাব, রাজনৈতিক আনুকূল্যে দুর্নীতি, অস্পষ্ট নীতিমালা অথবা বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে কড়াকড়ি বিধির কারণে সাদা বা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির প্রায় ৩০-৮০ শতাংশ হলো কালো বা ছায়া অর্থনীতি। অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় পাকিস্তানের ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়, ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোয় ভারতীয় আমানত, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকগুলোয় বৃহৎ ইন্দোনেশীয় আমানত, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোয় আফ্রিকার স্বৈরশাসকদের আমানত এ ক্ষেত্রে বহু সাক্ষ্য বহন করে। প্রকৃতপক্ষে এর ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী ব্যাংকগুলোয় পুরো 'প্রাইভেট ব্যাংকিং' অথবা ব্যক্তিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবসা বিকাশ লাভ করেছে। পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিংবা তার ওপর আমানত রাখা ব্যক্তি বা পরিবারগুলোকে এসব ব্যাংক 'এক্সট্রা অর্ডিনারি' এবং 'আউট অব দ্য ওয়ে' সেবা প্রদান করে আসছে। এদের জন্য এসব সম্পদ ব্যবস্থাপকের পক্ষ থেকে ট্রাস্টি সেবা, দেশে-বিদেশে উচ্চমানের সম্পদ কেনা, বিরল চিত্রকর্ম ক্রয়, নীল নদের দেশ কিংবা ক্যারিবীয় অঞ্চল ভ্রমণের সুযোগ, বিশ্বকাপ ক্রিকেট কিংবা ফুটবল খেলা দেখা, সর্বোপরি উচ্চমার্গীয় থিয়েটারে নাটক বা মুভি দেখানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়। সব সময় এসব সুবিধা কেবল কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক, রাজনৈতিভাবে দুর্বৃত্তায়িত সামরিক-বেসামরিক আমলারা যে পান তা নয়; আমি নিশ্চিত, আমাদের দেশের বেশকিছু ব্যবসায়ীও এসব সেবা গ্রহণের স্ট্যাটাস অর্জন করেছেন।

আপনি করোনাপূর্ব সময়ে ঢাকা শহরের কোনো অভিজাত এলাকায় বিয়ে কিংবা অন্য কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলে জানতেন, অন্তত ১০-১৫ শতাংশ মানুষ সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা অথবা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত পাসপোর্ট বা আবাসিক বা রেসিডেন্ট স্ট্যাটাস উপভোগ করছেন। এর সমান্তরালে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোয় প্রতিনিয়ত বাংলাদেশি নাগরিকদের নির্বাহী হিসেবে চাকরি করার সংখ্যাও বাড়ছে। তাদের কোনোভাবেই বিশ্বের যে কোনো ব্যাংকে অর্থ সঞ্চয় অথবা বাইরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার কথা নয়। এ যাবৎ কোনো সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়নি, বাংলাদেশ থেকে কীভাবে এসব বাংলাদেশি বৃহৎ আমানতকারীরা বাইরে টাকা নিয়ে যান।

বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাইরে শিক্ষা অর্জন, বেড়ানো অথবা কাজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। সন্তানদের কল্যাণে বাংলাদেশি মা-বাবারা বাইরে যাওয়ার জন্য অভিবাসী বা অ-অভিবাসী ভিসার জন্য উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় দূতাবাসগুলোয় লাইন ধরছেন। প্রতি বছর এ লাইন দীর্ঘতর হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৩৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তঃদেশীয় অর্থনীতির আকার তার প্রায় ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক লেনদেনের বাধ্যবাধকতা পূরণে টাকার 'সহজ প্রবাহ' এবং অধিকতর গুরুত্ব সহকারে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে মুনাফা অর্জন প্রয়োজন। আমাদের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংগত কারণেই বাইরে ত্বরিত টাকা লেনদেনের সুযোগ করে দেয় না। বৈশ্বিক জোগান ব্যবস্থায় গভীর সম্পৃক্ততা অথবা আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা থেকে অধিকতর মুনাফা অর্জনের জন্য বৃহৎ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে অধিক সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন। বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যও বাড়ছে। বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বাইরে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছেন। আমরা জানি, দেশের কিছু বৃহৎ পণ্য ব্যবসায়ী বৈশ্বিক পণ্য নিলাম বাজারে অংশগ্রহণের জন্য কার্যকর বাণিজ্য লাইন কিংবা ব্যাংকিং লাইন পেতে বিদেশি ব্যাংকগুলোয় রক্ষিত আমানতকে আংশিক জামানত হিসেবেও ব্যবহার করছেন। পণ্য স্পট মার্কেটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভালো দর পেতে তাদের এটা প্রয়োজন। বাংলাদেশি ব্যাংকে এলসি খুলে তারা এসব সুবিধা নিতে পারবেন না।

২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়ে আর্থিক অপরাধ তদন্তকে সহজতর করার জন্য দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তাদের শক্তিশালী করতে প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করা হয়। সেই প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার সুযোগে জানা গেছে কিছু বাংলাদেশি উদ্যোক্তা তাদের বাইরের ব্যাংক হিসাব থেকে বাংলাদেশে অবস্থিত একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিদেশি চা কোম্পানির কিছু বাগান কেনার ব্যয় মেটাতে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছিলেন। সে সময় আমাকে একজন কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'স্যার, এটা কীভাবে ঘটল?' প্রত্যুত্তরে আমি বলেছিলাম, ইউরোপীয় মালিকের কিছু ভালো মানের চা বাগান বিক্রির প্রক্রিয়া চলছিল। কিছু বাংলাদেশি মালিক এ চা বাগান কেনার আর্থিক সক্ষমতা এমনকি ব্যবস্থাপনা দক্ষতাও অর্জন করেছিলেন। ইউরোপীয় বিক্রেতা স্থানীয়দের কাছে এ সম্পত্তি বিক্রি করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত বৈদেশিক বিনিময় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এটিকে অনুমোদন দিতে পারে না। আমি আরও বলেছিলাম, আপনি যদি এসব ইউরোপীয় মালিকের স্থানীয় সম্পত্তি বাংলাদেশি মালিকদের কেনাতে চান, সেক্ষেত্রে কী করবেন? তিনি কিছুক্ষণ নীরব ছিলেন এবং তারপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রচলিত আইন এবং বিধি এখনও বাংলাদেশে চর্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছিলেন।

আমরা যদি দেশকে এগিয়ে নিতে এবং দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি চাই, তাহলে অবশ্যই নীতিমালার ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোয় কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে; আমাদের সংশ্নিষ্ট নীতিমালাকে পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলানো প্রয়োজন। দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে সহজতর পথে মুনাফা অর্জন করার সুযোগ দিয়ে জাতীয় সম্পদ সৃজনে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের অধিক হারে বৈশ্বিক জোগান ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার পাশাপাশি তারা যেন আন্তর্জাতিক বাজারের সাময়িক ওঠানামা থেকে অধিকতর লাভ নিশ্চিত করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়া কিংবা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের পদে বসে অবৈধ অর্থ অর্জনের পথ রুদ্ধ করতে হবে। আমাদের অবশ্যই বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় তদারকি সংস্থাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। সেইসঙ্গে দেশের আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য, করপোরেট করহার এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা বা নীতিমালাকে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের প্রচলিত নীতিমালার আলোকে যুগোপযোগী এবং সহজতর করতে হবে।

দুর্নীতি তথা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে না গিয়ে, ব্যাপক সংস্কারে হাত না দিয়ে কিংবা কালো টাকার উৎসকে সংকুচিত না করে শুধু অর্থমন্ত্রীর নিকট থেকে টাকা পাচারকারীদের তালিকা নিয়ে তেমন লাভ হবে না। আইনি লড়াইয়ে না জিতে বিদেশ থেকে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনাও সম্ভব নয়। গ্রাহক গোপনীয়তা রক্ষার কঠিন ব্রত নিয়েই আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং জগৎ গড়ে উঠেছে।

অর্থনীতি বিশ্নেষক

বিষয় : অর্থনীতি মামুন রশীদ

মন্তব্য করুন