সৎ চরিত্র বা মানবিক মূল্যবোধ গঠনের সময় হচ্ছে শৈশব, কৈশোর এবং যৌবন অর্থাৎ যে সময়টা মানুষ স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণ করে। প্রতিটি মানুষের শিক্ষা শুরু হয় তার মা-বাবা, ভাইবোনদের কাছে পরিবারে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মানুষ সাধারণত ১২ ঘণ্টা ব্যয় করে ঘুমসহ ব্যক্তিগত কাজে। আর ৬-৯ ঘণ্টা যুক্ত থাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে, এরপর হাতে থাকে ২-৪ ঘণ্টা সময় যা সে ব্যয় করে বিনোদন বা মনোরঞ্জনের পেছনে। উন্নত বিশ্বে মূলত এই ২-৪ ঘণ্টা সময়কে মনোনীত করা হয় খেলাধুলা, চারুকলা বা শিল্পকলায় অনুশীলনের জন্য। খেলাধুলা করলে ভালো ঘুম হয়, মস্তিস্কের কর্মক্ষমতা বর্ধিত হয়, অতিরিক্ত ওজন হ্রাস পায়। শুধু তাই নয়, মানসিকভাবেও খেলাধুলায় মেজাজ ভালো থাকে, একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়, বিষণ্ণতা কমে এবং নেতৃত্বের অভ্যাস তৈরি হয়। তাই বলা হয়, 'সুস্থ মন সুস্থ দেহেই অবস্থান করে।'

খেলাধুলার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চরিত্রকে কোনোভাবে কলুষিত করা যাবে না। উন্নততর ব্যবহার আশা করা হবে। সৎ চরিত্র দিয়ে উদাহরণ তৈরি করতে হবে। খেলায় হারলে কিংবা জিতলে অখেলোয়াড়োচিত আচরণ অমার্জনীয়। খেলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সবাইকে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। 'আত্মনিয়ন্ত্রণ' অনুশীলন করতে হবে। সমাজে আদর্শ নিয়ে থাকতে হবে। নিজের সাফল্য বা ব্যর্থতা উভয়কেই খেলোয়াড়োচিত মনোভাব নিয়ে সর্বদা গ্রহণ করতে হবে।

খেলোয়াড়দের ছয়টি স্তম্ভকে অটুট রাখতে হবে যথা- বিশ্বাসযোগ্যতা, অন্যকে সম্মান করা, দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা, অভিভাবকত্ব ও সুনাগরিক হওয়া। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তারা খেলোয়াড়দের কিছু গুণ শেখাবেন। যেমন- শ্রদ্ধাবোধ, সততা, ধৈর্য, ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ, দয়া, সহানুভূতি, স্বার্থপরহীনতা, দলবদ্ধভাবে কাজ করা এবং খেলার নিয়মকানুন। খেলাধুলার জন্য নিয়মিত অনুশীলন জরুরি। একই সঙ্গে খেলোয়াড়কে মনে রাখতে হবে কোনোভাবেই সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তাকে দর্শকদেরও শ্রদ্ধা করা শিখতে হবে। অপেশাদার বা পেশাদার স্পোর্টসে উভয় ক্ষেত্রে অভদ্র ব্যবহার, কুচরিত্র, অসৎ পন্থা, মাদকের ব্যবহার, সহিংসতা ইত্যাদি কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সুতরাং বর্তমান পৃথিবীতে খেলাধুলা বা ক্রীড়া শুধু বিনোদন নয়, এখানে কেতাবি শিক্ষার চেয়ে সুস্থ দেহ ও সুস্থ মনমানসিকতা তৈরির একটি সুবিন্যস্ত পাঠ্যক্রম রয়েছে। যা দিয়ে একজন মানুষ আলোকিত ও সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করলে নষ্ট হয়ে যাবে বা জীবনে কিছুই করতে পারবে না- এমন ধারণা করা আর বোকার স্বর্গে বসবাস করা একই কথা। খেলোয়াড়দের কৃতিত্বের অসংখ্য প্রমাণ আজ আমাদের দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে বর্তমান। আমাদের দেশে মাশরাফি, সালাম মুর্শেদীসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখবেন দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করেছেন পেলে, মেসি, রোনালডো, শারাপোভা, ইমরান খান প্রমুখ।

কিন্তু আমরা গাড়ির চাকা উল্টো দিকে ঘোরাচ্ছি, সেজন্যই গত ৪০ বছরে অনেক ভুল করেছি। যথা- অসংখ্য মাঠ ধ্বংস করে বানিয়েছি ইট, বালু আর সিমেন্টের বস্তি, তাই ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার জায়গার অভাবে তারা আজ রাস্তায় খেলে, আড্ডা দেয়, যৌন হয়রানি ও ধূমপান করে। বয়স্ক ব্যক্তিরা ভোরে উন্মুক্ত স্থানে নির্মল বায়ুতে শ্বাস নিতে পারেন না। হাজারো স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছি। কবুতরের খোপের শ্রেণিকক্ষে ছেলেমেয়েরা বেড়ে উঠছে সংকীর্ণতার সঙ্গে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে তৈরি হয়েছে অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

বাচ্চাদের জন্য আমাদের মুক্ত কোনো উদ্যানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা মোবাইল আর ল্যাপটপে মত্ত না থেকে খেলাধুলা করতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিকেএসপি ছাড়া আমাদের নেই কোনো আবাসিক স্পোর্টস একাডেমি। স্কুলগুলোতে ফিজিক্যাল ট্রেনিংয়ের শিক্ষক নেই, থাকলেও সেটা নামকাওয়াস্তে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সব স্পোর্টসের আয়োজন হয় না। মফস্বলের স্কুল বা কলেজে মাঠ থাকলেও সেখানে যারা সরকারি কর্তাব্যক্তি, তাদের ৮০%-এর ফ্যামিলি থাকে বড় শহরে, সুতরাং এগুলোর মান উন্নয়ন হয় না।

স্পোর্টস প্রটোকলের মাধ্যমে যে একজন ছাত্রছাত্রীকে আলোকিত মানুষ করা যায়, সে সম্বন্ধে অনেক প্রতিষ্ঠানেরই তেমন কোনো ধারণা নেই বা ধারণা দেওয়া হয় না। দেশে সার্টিফিকেটধারী অসংখ্য তরুণ; তাদের নেই চাকরির নিশ্চয়তা, চারদিকে আলোর মিছিলের মাঝে বুকভরা হতাশা, আক্ষেপের তুষের আগুন পরিণত হয় অবক্ষয়ের ছাইয়ে। পাকস্থলীতে নেশার বস্তু, হাতে তুলে নেয় অস্ত্র, ছিনিয়ে নিতে চায় অন্যের সম্পদ, তৈরি হয় অরাজকতা, আর পত্রিকার পাতায় খবর আসে 'পরাজিত তারুণ্যে'র বিরাট হেডলাইন।

হাজারো ব্যর্থতার মাঝে এখন আমাদের একমাত্র আশার আলো ক্রিকেট, সেটাকে সব খেলাধুলায় মডেল হিসেবে নিয়ে সব স্কুল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা ফেডারেশনকে উজ্জীবিত হতে হবে। স্পোর্টসের মাধ্যমে 'পরাজিত তারুণ্য'কে বিদায় দিয়ে মানবিক অবক্ষয়কে ঠেকিয়ে আলোকিত মানুষ তৈরির দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।

চিকিৎসক, গবেষক ও শিক্ষক

বিষয় : সমাজ গোলাম শওকত হোসেন

মন্তব্য করুন