বাবা, সন্তানের জন্য নির্ভরতার আকাশ আর নিঃসীম নিরাপত্তার চাদর। বাবা শাশ্বত, চির আপন, চিরন্তন ও তুলনাহীন। বাবা মানে মাথার ওপর শীতল কোমল ছায়া। ঝুম বৃষ্টি বা তীব্র জ্বালাময় রোদে বাবা সন্তানের কাছে শান্তিদায়ক ছাতা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে পথ দেখানো আলো। সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা ও ত্যাগ এতটাই স্বার্থহীন যে, সন্তানের জন্য নিজের প্রাণ দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। কবির ভাষায় 'মরিয়া বাবর অমর হয়েছে, নাহি তার কোন ক্ষয়/পিতৃস্নেহের কাছে হয়েছে মরণের পরাজয়।'

বাবা কেবল দুই অক্ষরের ছোট শব্দ নয়, সন্তানের কাছে বাবা শব্দটি আবেগ এবং অনুভূতির। যার মধ্যে লুকিয়ে আছে অজানা হাজারো ত্যাগ-তিতিক্ষার গল্প। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সবকিছুতে পরিবর্তন এলেও বাবার ভালোবাসায় কোনো পরিবর্তন আসে না। পৃথিবী নামক যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ নিজেকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে। যুদ্ধে সবাই নিজেকে বিজয়ী দেখতে চায়। বাবা সেক্ষেত্রে একেবারেই ব্যতিক্রম। বাবা সন্তানদের বিজয়ী দেখতে চান। সন্তানদের সফলতার চূড়ায় দেখতে সুখ-শান্তি, চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দেন। একদিকে সন্তানের যাবতীয় চাহিদার জোগান দেন, অন্যদিকে তাদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। এক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত বাবার লড়াইটা আরও কঠিন। তাদের বিত্তের অভাব থাকে, কিন্তু আবদারের কোনো অভাব থাকে না। নিজে কম খেয়ে, পুরোনো কাপড়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়ে সঞ্চয় গড়ে তোলেন সন্তানদের জন্য। অসুস্থ শরীরের ক্লান্তিকে পাত্তা না দিয়ে ছুটে চলেন সন্তানের সুখের সন্ধানে। সন্তান অসুস্থ হলে তার মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ে, হয়ে যান পাগলপ্রায়। সন্তানের ছোট-বড় সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি হন বাবা। হয়তো প্রকাশ্যে, নয়তো নীরবে।

রাগ, শাসন আর রাশভারী চেহারার আড়ালে বাবার যে কোমল হৃদয় তা মাতৃহৃদয়ের চেয়ে কম কিসে। বাবাকে নিয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে খুব বেশি আদিখ্যেতা নেই। বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কে মিশে থাকে খানিকটা দূরত্ব, খানিকটা সংকোচ, খানিকটা ভীতি মেশানো শ্রদ্ধা। অনেক সন্তানই বাবার ছায়ার গুরুত্ব বুঝতে কিছুটা সময় নেয়। হয়তো বাবাকে হারিয়ে ফেলে, অথবা নিজে বাবা হয়ে তারা বাবাকে বুঝতে পারে। বাবার চোখে সব সন্তানই সমান। তবে অনেকে বলেন, বাবার কাছে বেশি প্রিয় হয় মেয়েরা, আর বাবারাও নাকি মেয়েদের কাছ থেকেই বেশি যত্ন পান। কথাটায় যুক্তি হয়তো নেই, কিন্তু খুব একটা ভুলও বোধহয় নেই। এমন মেয়ে খুব কমই আছে বাবার জন্য যার মনে বিশেষ দুর্বলতা নেই।

পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে মানুষের আচার-ব্যবহার ও পারিবারিক বন্ধন। জীবনের অসীম ব্যস্ততায় নিমজ্জিত হচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম। বিভিন্ন কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকছে অনেকেই। ফলে যার কল্যাণে পৃথিবীর আলোতে আসা, যার হাত ধরে হাঁটতে শেখা, যার মুখ থেকে বলতে শেখা সেই বাবা কিংবা মায়ের খোঁজ-খবর রাখা কিংবা তাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর ফুরসত কোথায়? যে বয়সে এই মানুষগুলোর বিশ্রামে থাকার কথা, সন্তানদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে তারা বড় একা, অনেক ক্ষেত্রে নিঃস্ব-অসহায়।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমি। বাবাকে নিয়ে খুব বেশি গল্প নেই। তবে যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, দেখেছি ভাইবোনদের জন্য বাবার অপরিসীম ত্যাগ, মায়াবী শাসন আর চোখ ভরা স্বপ্ন। সর্বদা তিনি আমাদের কল্যাণের চিন্তা করেন, সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেন। ভুল করলে শাসন করেন, সংশোধন করে দেন। সব সংকটে পাশে থাকেন, সবসময় অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যান। 'বাবা তোমায় ভালোবাসি' বলতে গিয়েও কখনও বলা হয়নি। বাবার মহত্ত্বের কাছে এ বাক্যটিকে সবসময়ই অনর্থক আর গৌণ মনে হয়।

সন্তানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে দায়িত্ববান ও ভরসার স্থল বাবা। বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্যও অনেক। প্রত্যেক ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে এর প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সন্তানরা যেন সে দায়িত্ব ভুলে না যায়। বাবা দিবসে সন্তানদের সেই আহ্বান জানিয়ে পৃথিবীর সব বাবাকে জানাই হাজারো সালাম ও শ্রদ্ধা।

সাংবাদিক
saifulksg@gmail.com

বিষয় : দিবস সুদীপ্ত সাইফুল

মন্তব্য করুন