আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস। প্রায় ১১ বছর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছর জুন মাসের ২০ তারিখ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো 'বিশ্ব শরণার্থী দিবস' পালন করে। ১৯৫১ সালে 'আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশন' স্বাক্ষরিত হয় এবং তার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ২০০১ সাল থেকে 'বিশ্ব শরণার্থী দিবস' পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুসারে আজ ২১তম বিশ্ব শরণার্থী দিবস। বাংলাদেশও অন্যান্য দেশের মতো জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে প্রতি বছর জুন মাসের ২০ তারিখ বিশ্ব শরণার্থী দিবস বা 'দ্য ওয়ার্ল্ড রিফিউজি ডে' পালন করে। বিশ্ব শরণার্থী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- 'চলো একত্রে বিনাশ করি, শিখি এবং বিকশিত হই'। মূলত কভিড-১৯ পরিস্থিতি সামনে রেখে এ প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই দিবসটি কীভাবে পালিত হওয়া জরুরি, এটাই কেন্দ্রীয় মনোযোগ। বিশেষ করে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী যে দেশে বাস করে, সে দেশে বিশ্ব শরণার্থী দিবস কীভাবে পালিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যা বললেই আমরা কেবল রোহিঙ্গা শরণার্থীকেই বুঝি কিংবা 'রোহিঙ্গা সংকট'কেই একমাত্র শরণার্থী সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু রোহিঙ্গা ছাড়াও আরও দুই ধরনের শরণার্থী বাংলাদেশে আছে। ১৯৭১ সালে আটকেপড়া পাকিস্তানি নামে পরিচিত বিহারি শরণার্থী এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্যচুক্তির শর্তানুযায়ী ত্রিপুরা থেকে ফিরে আসা পাহাড়ি শরণার্থী। যদিও কোনোটাই অফিসিয়ালি 'শরণার্থী' হিসেবে রাষ্ট্রীয় দলিল দস্তাবেজে নেই। কেননা শরণার্থী বা রিফিউজি স্ট্যাটাস দিয়ে কাউকে বা কোনো জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ স্বীকার করে না এবং সে অনুযায়ী দেখভাল করে না। এর মূল কারণ, ১৯৫১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া 'আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশন' এবং ১৯৬৭ সালে 'শরণার্থী প্রটোকলে' বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেনি। এমনকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের পরও বাংলাদেশ শরণার্থী বিষয়ক এ কনভেনশন এবং প্রটোকলে অনুস্বাক্ষর করেনি। ফলে, বাংলাদেশে কেউ শরণার্থী স্ট্যাটাস পায় না এবং এ কারণেই রোহিঙ্গাদের অফিসিয়ালি বাংলাদেশে বলা হয়- জোর করে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক বা ''ফোর্সিভলি ডিসপ্লেজড মিয়ানমার'র ন্যাশনাল"। তবে, এর পেছনে রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণের নানান রাষ্ট্রীয় নীতি, তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর সুদূরপ্রসারী চিন্তা এবং আন্তর্জাতিক বিধিবিধান সম্পর্কিত নানা পলিসি আছে, যা একেবারেই ভিন্ন আলোচনা এবং নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়। কিন্তু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অফিসিয়ালি যে নামেই আমরা ডাকি না কেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের যে একটি বিরাট শরণার্থী সমস্যা এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ সমস্যা মোকাবিলায় বিশ্ব শরণার্থী দিবসটি কীভাবে পালন করে সমস্যা সমাধানে কাজে লাগানো যায়, তা-ই এখন সবচেয়ে জরুরি।

শরণার্থী-সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবীর দেশে দেশে শরণার্থীর সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপরই যখন বিশ্বব্যাপী বি-ঔপনিবেশিকীকরণ প্রক্রিয়া চলছিল, তখন সদস্য উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোতে এসব শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া, ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেওয়া এবং মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার সংরক্ষণ প্রভৃতি বিষয় একটা বড় সমস্যা হিসেবে সামনে আসে। দ্বিতীয় যুদ্ধোত্তর সময়ে এরকম আরও অনেক সমস্যা, বিশেষ করে জাতিতে জাতিতে নতুন কোনো যুদ্ধ যাতে না বাধে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী এবং বিজিতের মধ্যকার যুদ্ধোত্তর সময়ের সম্পর্ক যেন শত্রু ভাবাপন্ন না হয় এবং পৃথিবীর দেশে দেশে যাতে মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়, এ জন্য ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র পাস করে। কিন্তু সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রেও শরণার্থীদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার্থে পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা না-থাকায় বিশ্বের ক্রমবর্ধমান শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় একটি স্বতন্ত্র শরণার্থী কনভেনশনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আমি লিখেছিলাম, 'তখন পর্যন্ত শরণার্থী বলতে কী বোঝায়, শরণার্থী কারা, তাদের অধিকার কী কী এবং তাদের প্রতি আশ্রয় প্রদানকারী রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী কী এবং নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্য দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব-কর্তব্য কী হবে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত আন্তর্জাতিক কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা বা সবর্জন গ্রহণযোগ্য কোনো সনদ ছিল না।'... এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে ১৯৫০ সালের ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে জাতিসংঘের একটি স্বতন্ত্র অঙ্গ হিসেবে ইউএনএইচসিআর প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা বিশ্বব্যাপী দ্য ইউএন রিফিউজি এজেন্সি হিসেবে পরিচিত।

ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রমকে একটি আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের আওতায় আনার জন্য ১৯৫১ সালে একটি আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে স্বাক্ষরিত হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে 'জাতিসংঘের শরণার্থী সনদ' হিসেবে পরিচিত। এ দিবসটির গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ পৃথিবীতে শরণার্থী সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। ভিন্ন জাতি, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন বিশ্বাস এবং ভিন্ন সত্তার মানুষের প্রতি রাষ্ট্রগুলোর ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা, নিপীড়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে দমনমূলক পলিসির কারণে লাখ লাখ মানুষ ক্রমান্বয়ে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করে, আশ্রয় গ্রহণ করে। শরণার্থী হিসেবে দিন পার করে এবং শিবিরবাসী হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে (জুন ১৯, ২০২১ পর্যন্ত) বিশ্বে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ। শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪১ লাখ। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ। পৃথিবীতে বর্তমানে রাষ্ট্রবিহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৯ লাখ, যার মধ্যে বাংলাদেশ একাই আশ্রয় দিয়েছে প্রায় ১২ লাখ রাষ্ট্রবিহীন রোহিঙ্গাকে।

এরকম একটি পরিস্থিতিতে আজ যখন বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে এ উদযাপন সীমিত আছে কয়েকটি সংবাদপত্রের কলামে, টিভি টকশো কিংবা সংবাদমাধ্যমের সংবাদ হিসেবে। অথচ, বাংলাদেশ এ দিবসটিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আজ বাংলাদেশ সব ডিপ্লোম্যাটিক ডেলিগেটকে নিয়ে একটা কম্প্রিহেনসিভ ব্রিফিং সভা করতে পারে। বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত বা প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেন। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশ কী কী ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তাজনিত এবং অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তার একটা ব্রিফিং পেপার তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ সবার সামনে উপস্থাপন করতে পারে, রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের সৃষ্টি, কিন্তু বাংলাদেশ এ সমস্যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। বাংলাদেশ ১৯৭৮, ১৯৯১-৯২, ২০১২ এবং ২০১৬ সালে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল; কিন্তু তার বেশিরভাগ রোহিঙ্গাই বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে যায়নি। এরকম একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে আর কোনো রোহিঙ্গাকে জায়গা দেওয়ার কথা নয়। নেহাত মানবিক কারণে বাংলাদেশ ২০১৭ সালে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছে। এটা কি বাংলাদেশের অপরাধ? বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করতে পারে- এ মানবিক আশ্রয় একটি সাময়িক ব্যবস্থা; এটা কোনো 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' নয়। সুতরাং বাংলাদেশ সব ধরনের আন্তরিকতার সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করছে কিন্তু মিয়ানমার, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো ধরনের সক্রিয় সহযোগিতা করছে না। আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবসে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য তাই সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। এ জাতীয় একটা শ্বেতপত্র তৈরি করে, রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশ কী ধরনের অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে তা বিশ্ববাসীকে জানানোর জন্য বিশ্ব শরণার্থী দিবস যথাযথভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

অনেকে হয়তো বলবেন বাংলাদেশ তো এসব কথা অনেকবার বলেছে, নতুন করে বলার কী আছে? আমি বলব, আমাদেরই বারবার বলতে হবে। বলা কথাই নতুন করে বলতে হবে। কেননা, এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতি আমাদের সংকটে ফেলেছে। তাই, 'যার সমস্যা তার হুঁশ নাই, আর পাড়াপড়শির ঘুম নাই'- এমনটি এক্ষেত্রে কার্যকর নয়। নিজেদের হুঁশ না থাকলে, পাড়াপড়শি বেঘোরেই ঘুমাবে।

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : বিশ্ব শরণার্থী দিবস ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

মন্তব্য করুন