প্রাণী মাত্রই বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য রসদ প্রয়োজন। এই রসদ জোগানোর মূল উৎস কৃষি। তাই আদিকাল থেকে মানুষ কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে, একাধিক বিপ্লব সাধন করেছে। এসব বিপ্লবের মধ্যে রয়েছে- নিওলিথিক যুগের কৃষিবিপ্লব, আদি ভারতীয় কৃষিবিপ্লব, আরব কৃষিবিপ্লব, ব্রিটিশ কৃষিবিপ্লব, স্কটিশ কৃষিবিপ্লব এবং সর্বশেষ বিশ্বব্যাপী সবুজবিপ্লব। কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের প্রধান মৌলিক চাহিদা 'খাদ্য' জোগানের ব্যবস্থা হয়ে গেলে তারা অন্যান্য মৌলিক চাহিদা, যথা- বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ দৈনন্দিন অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, কাজকর্ম পরিচালনা ও চলাচলের জন্য সংশ্নিষ্ট ব্যবস্থাগুলোর উন্নয়নের প্রতি মনোনিবেশ করে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে বেশ কিছু সফল কৃষিবিপ্লবের অভিজ্ঞাসমৃদ্ধ মানবজাতি প্রযুক্তি ও জ্ঞানবিজ্ঞান শিক্ষা ও চর্চার মাধ্যমে শিল্প ও কলকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বহু বছর ধরে তাদের ছোট ছোট চেষ্টা ও উদ্যোগ গ্রহণের পর এক পর্যায়ে সাধিত হয় প্রথম শিল্পবিপ্লব।

১৭৬০ থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যে 'প্রথম শিল্পবিপ্লব' সাধিত হয়। আর এ ক্ষেত্রে সূতিকাগার হিসেবে গ্রেট ব্রিটেন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তারা দ্রুততার সঙ্গে প্রথমে ১৭৮০ সাল থেকে যান্ত্রিক সুতা কাটার যন্ত্র এবং এরপর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বাষ্পীয় শক্তির ব্যবহার শুরু করে। ১৮০০ সাল থেকে তারা উচ্চহারে লোহা ও লৌহজাত দ্রব্য উৎপাদন শুরু করে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই যান্ত্রিক টেক্সটাইল উৎপাদন গ্রেট ব্রিটেন থেকে ইউরোপের অন্যান্য দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে।

উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের উন্মেষ ঘটে। এই শিল্পবিপ্লবের সময়কালে মূলত যুক্তরাজ্য, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি এবং জাপানে দ্রুত শিল্প বিকাশ লাভ করে। প্রথম শিল্পবিপ্লবে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের সীমিত ব্যবহার, বিনিময়যোগ্য যন্ত্রাংশ ও প্রথমবারের মতো ব্যাপক উৎপাদন শুরু হয়েছিল। তবে সেসব মূলত জলশক্তির ব্যবহারনির্ভর ছিল। অন্যদিকে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের সময় রেলপথ নির্মাণ, উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপকহারে যন্ত্রের ব্যবহার, বৃহৎ পরিসরে লোহা ও ইস্পাত উৎপাদন এবং ব্যাপকহারে বাষ্পীয় শক্তি, টেলিগ্রাফ ও পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার এবং বিদ্যুতায়নের সূচনা ঘটে।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব মানুষকে নতুন অনেক কিছু দিয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব অগ্রগতির কারণে মানবজাতি আধুনিক যুগ পেরিয়ে অত্যাধুনিক যুগে প্রবেশ করে। তারা লোকমোটিভ ও মোটরযান, টেলিফোন, বিদ্যুৎ, উড়োজাহাজ, রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার, মহাকাশযান ইত্যাদি যুগান্তকারী অনেক কিছু আবিস্কার, উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু করে। তখন বিশেষ করে কম্পিউটার ও সংশ্নিষ্ট যন্ত্রপাতি কেবল তথ্য ও উপাত্ত ধারণ ও প্রক্রিয়াকরণের যন্ত্র হিসেবেই নয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিল্প হিসেবে বিকশিত হতে শুরু করে, যা নতুন একটি শিল্পবিপ্লব সংঘটনে অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। শুরু হয় তৃতীয় শিল্পবিপ্লব। এ ক্ষেত্রে ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক 'অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি নেটওয়ার্ক', সংক্ষেপে 'অরপানেট' তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের দ্বারোদ্ঘাটনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট, তথা ওয়ার্ল্ডওয়াইড ওয়েব প্রসার ঘটানোর গোড়াপত্তনের কারণেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বিপ্লব সাধিত হয়। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী দুটি শিল্পবিপ্লবের চেয়ে তৃতীয় শিল্পবিপ্লব অধিকতর অগ্রগামী প্রযুক্তি, যথা- প্রোগ্রামঅ্যাবল লজিক কন্ট্রোলার (পিএলসি), তথ্যপ্রযুক্তি ও রোবটিকস, উন্নত ও দ্রুত বিতরণ ব্যবস্থা এবং উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা অধিকহারে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের পথ বেয়ে মাত্র চার দশকের মধ্যে ক্ষিপ্র বেগে ধেয়ে আসে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, যা ইংরেজিতে সংক্ষেপে 'ইন্ডাস্ট্রি ৪.০' বা 'আইআর ৪.০' নামে সমধিক জনপ্রিয়। এই তো সেদিন, একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে যাত্রা শুরু করা আইআর ৪.০ আমাদের জীবনযাত্রা, কাজ করা এবং একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বা সংযুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিশালভাবে মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। মানবজাতির উন্নয়নে এটি একটি অভাবিত নতুন অধ্যায়, যা প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অসাধারণ সব প্রযুক্তি দ্বারা সমৃদ্ধ ও প্রাগ্রসরমান।

সব মিলিয়ে আইআর ৪.০ প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি নতুন স্তর এবং শিল্পের ভ্যালুচেইন সৃষ্টি করেছে। এই ভ্যালুচেইনের মধ্যে রয়েছে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ক্লাউড কম্পিউটিং, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, বিগ ডাটা অ্যানালাইসিস, ব্লকচেইন, সাইবার সিকিউরিটি, মেশিন লার্নিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ও রোবটিকস, সিম্যুলেশন, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, ভার্চুয়ালাইজেশন, ইউনিফায়েড কমিউনিকেশন এবং অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং। এসব সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমগুলো আইআর ৪.০-এর ভিত্তি তৈরি করেছে। বেশিরভাগ উন্নত দেশ এবং বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশ ইতোমধ্যে আইআর ৪.০-কে দ্রুত ও পরিবর্তনশীল অর্থনীতি, বৈচিত্র্যময় ব্যবসা ও শিল্প এবং স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, পরিচালনা ও শাসন ব্যবস্থায় রূপান্তরকরণের ভিত্তিতে সফলতা অর্জন করেছে।

তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে- বিশ্বের বহু দেশেই এখন অবধি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পুরোপুরি উন্মেষ ঘটতে না ঘটতেই পঞ্চম শিল্পবিপ্লবও শুরু হয়ে গেছে, যাকে সংক্ষেপে 'ইন্ডাস্ট্রি ৫.০' বা 'আইআর ৫.০' নামে অভিহিত করা হয়েছে। কী এই আইআর ৫.০! আইআর ৫.০-এ রোবটগুলো উন্নত প্রযুক্তি, যেমন ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি)-এর পাশাপাশি বিগ ডাটা ব্যবহার করে মানুষকে উত্তম এবং দ্রুততম কাজ করতে সহায়তা করে। আইআর ৪.০-এর সময় রোবট যেখানে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছে, সেখানে আইআর ৫.০-এ শিল্প রোবটগুলো মানুষের পাশাপাশি নিরাপদে এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজ করবে। এ সময় মানব ও মেশিন কর্মীদের সহযোগিতা উৎপাদন শিল্পে অবারিত সুযোগের দ্বার উন্মোচন করবে। এই সহযোগী মেশিন কর্মীদের বলা হয় 'কোলাবরেটিভ রোবট', সংক্ষেপে 'কোবট', যা কর্মক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে শারীরিকভাবে মিথস্ট্ক্রিয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা ও প্রযুক্তিবিদ

bn.adhikary@gmail.com

বিষয় : বিশ্বব্যবস্থা বীরেন্দ্র নাথ অধিকারী

মন্তব্য করুন